পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মাননা প্রদান, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মসমালোচনা এবং জনসেবার মান উন্নয়নে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সাফল্যের সঙ্গে পালিত হলো পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬। “আমার পুলিশ আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে পালিত হয়েছে এবারের পুলিশ সপ্তাহ। এবারের পুলিশ সপ্তাহ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পুলিশ অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার সংস্কারমূলক পথচলায় রয়েছে। তাই এবারের পুলিশ সপ্তাহের বিভিন্ন আয়োজনে অতিথিদের বক্তব্যেও পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা, পেশাগত দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটেই এবারের পুলিশ সপ্তাহের আনুষ্ঠানিকতা, বক্তব্য ও আলোচনায় পুলিশের বর্তমান অবস্থান, ভবিষ্যৎ করণীয় এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ গুরুত্ব পায়। পুলিশ সপ্তাহের প্রথম দিনের বিভিন্ন আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকিরসহ পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের সদস্যবৃন্দ। আয়োজনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত মনোমুগ্ধকর বার্ষিক কুচকাওয়াজ উপভোগ ও সালাম গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে পুলিশের ভূমিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত, অধিকারহারা মানুষ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময় শান্তি ও নিরাপত্তা চায়, আর দেশের জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের ভূমিকার ওপরই নির্ভরশীল।” জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও সামর্থ্য নিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধ্য এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন।”
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের মানবিক ও পেশাদার ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশেষভাবে তিনি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারী পুলিশ সদস্যদের সাহসী অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ পুলিশ যে মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের পরিচয় দিচ্ছে, দেশের মানুষের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন আচরণেও সেই মূল্যবোধ আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত পুলিশ কল্যাণ প্যারেড অনুষ্ঠানে পুলিশ সদস্য ও দেশের সাধারণ জনগণের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। এই বক্তব্যে ছিল সমসাময়িক বাস্তবতা, অতীত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ পুলিশিংয়ের একটি সম্মিলিত উপস্থাপন। তিনি একদিকে পুলিশ বাহিনীর পেশাদার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে জনগণের আস্থা অর্জন, মানবিক আচরণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ১৯৭১ সালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে শহিদ পুলিশ সদস্যদের বীরত্বের কথা স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পুলিশের জন্য জনগণের বিশ্বাস অর্জনকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন, সুদক্ষ, আধুনিক ও মানবিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, একটি দক্ষ, মানবিক পুলিশ বাহিনী ছাড়া জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত,নিপীড়িত, অধিকারহারা মানুষ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময় শান্তি ও নিরাপত্তা চায়, আর দেশের জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের ভূমিকার ওপরই নির্ভরশীল।”
– প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দক্ষ, মানবিক ও নিরপেক্ষ পুলিশিংয়ের উদাহরণ হিসেবে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং এই কাজে পুলিশ বাহিনীর সাফল্যের জন্য তাদের অভিনন্দন জানান।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, “অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, পুলিশ চাইলে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।”
এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি পুলিশকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর এই সাফল্য যেন মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অতীতে দলীয় স্বার্থে পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এখন নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
পুলিশের কাজ ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’। থানায় গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। কারণ, মানুষ বিপদে পড়েই থানায় যায়। সেখানে গিয়ে তাঁর বিপদ কমবে-এমন বিশ্বাস মানুষের মধ্যে তৈরি করতে হবে। তিনি পুলিশকে মাঠপর্যায়ে সরকারের “অ্যাম্বাসেডর” হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ, একজন পুলিশ সদস্য শুধু নিজের পরিচয়ে কাজ করেন না; তার আচরণের মাধ্যমে মানুষ সরকার, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের চরিত্রও বিচার করে। তাই পুলিশের কর্মকাণ্ড হতে হবে মানবিক ও আইনসংগত। থানাগুলোতে সেবা গ্রহণ আরও সহজ করার কথাও তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বিশেষ জোর দেন, আইনগত পদক্ষেপও যেন হয় মানবিকতাসম্পন্ন ও আইনসম্মত। বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, “গুম, অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” একই সঙ্গে দেশের সর্বত্র কিশোর অপরাধ, মাদক ও অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধের উদ্বেগজনক বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি এসব অপরাধ দমনে জনগণের অংশগ্রহণকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেন।
কমিউনিটি পুলিশিং ও ওপেন হাউস ডে’র মতো কার্যক্রমগুলোকে উৎসাহ দিয়ে তিনি এগুলো আরও সম্প্রসারিত করার কথা বলেন। জনগণের এই সম্পৃক্ততা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে আরও আধুনিক ও সাইবার সক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন তিনি। সাইবার অপরাধ ও প্রথাগত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এআইয়ের ব্যবহারের বিস্তৃতি, সাইবার পুলিশ প্রতিষ্ঠা, অপরাধ বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগসহ বিভিন্ন আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানান তিনি। পুলিশ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, বদলি পদোন্নতি ও নিয়োগে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা প্রাধান্য পাবে। এ ছাড়া পুলিশ সদস্যদের পেশাগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে আধুনিক প্রশিক্ষণ, যুগোপযোগী আবাসন সুবিধা, ঝুঁকি ভাতা ও পর্যাপ্ত রেশন সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
সবশেষে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং অতীতের অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে বলেন, “অতীতে দেশের মানুষ পুলিশের ভিন্ন চিত্র দেখেছে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদী শাসনে ফিরে না যায়, সেটিই হোক পুলিশ সপ্তাহের অঙ্গীকার।” পরদিন ১১ মে ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি পুলিশের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, পুলিশ যদি সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে দেশ আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।
থানায় গিয়ে যেন সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও রাষ্টেধর মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব।”
– মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সরকারের সাফল্যের সঙ্গে পুলিশের ভূমিকার সম্পর্ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো দেশেই সাহসী, সৎ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী ছাড়া সরকারের সাফল্য সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মব বা সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আরও কৌশলী, সংযত ও পেশাদার হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জনগণ পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের মিরর বা আয়না হিসেবে বিবেচনা করে। তাই মাঠপর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্যের আচরণ শুধুই একজন ব্যক্তির আচরণ নয়; বরং সেটি রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত। এ কারণে পুলিশের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনসংগত, মানবিক ও জনআস্থাবান্ধব। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠী যেন দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেন তিনি। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ বাহিনীর উত্থাপিত যৌক্তিক দাবিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের শেষে তিনি সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত অবস্থান-উভয় জায়গা থেকেই সবাইকে দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান।

