হোমপ্রবন্ধদিবস পরিক্রমাবিস্মৃত বীরদের গল্প: বাংলাদেশ পুলিশের পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা

বিস্মৃত বীরদের গল্প: বাংলাদেশ পুলিশের পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত। এই কালরাতে দেশের নিরীহ এবং বেসামরিক লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর কাপুরুষোচিত আক্রমণে প্রাণ হারান প্রায় ৭,০০০ মানুষ। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লেখেন, এ রাতে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় আরও ৩,০০০ মানুষকে।

শহীদ হওয়া এ মানুষদের মধ্যে ছিলেন ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী, কৃষক, কামার-কুমারসহ সকল শ্রেণির মানুষ। এমনকি নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যায় এক পাও পিছপা হয়নি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা এবং ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে এলে কাপুরুষের মতো গুলি করে প্রায় ৩০০ ছাত্রীকে হত্যা করে—এমন তথ্য পাওয়া যায় আর্চার কে. ব্লাডের বই ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ থেকে। এই ভয়াল রাতে সারা ঢাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে লাশের গন্ধে; কিন্তু ঢাকার ঠিক আরেক প্রান্তে হার না মানার দীপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে ওঠে একদল মানুষ। রাতের আঁধারে নিজেদের স্বল্প সক্ষমতা নিয়ে রুখে দেয় পাকিস্তানি হানাদারদের। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অবস্থিত তৎকালীন পুলিশ সদস্যরা। তাদের হাতে থাকা হালকা থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়েই তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর। অকুতোভয় এই মানুষগুলোর সাহসী প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের এই গণযুদ্ধে পরবর্তী নয় মাস সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অকুতোভয় সদস্যরা।

বাংলাদেশ পুলিশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সরকারি সূত্রের বিবরণে পাওয়া যায়, ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বহু পুলিশ সদস্য সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেন। বিভিন্ন নথিতে কোথাও বলা হয়েছে, প্রায় ১৩ হাজার পুলিশ সদস্য পাকিস্তানের আনুগত্য অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন; কোথাও সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি বলা হয়েছে; আবার পরে শহীদ সদস্যদের নাম নথিভুক্ত করতে গিয়ে ১,২৬২ জনের একটি তালিকাও পাওয়া যায়। তবে কঠিন সত্য এই যে, বাংলাদেশ পুলিশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সদস্যরা যুগে যুগে থেকে গেছেন অবহেলিত। এসব পুলিশ সদস্যের সার্ভিস বইয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার তথ্য লেখা থাকলেও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের স্বীকৃতি পাননি তাঁরা। ফলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত।

শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়, পদকপ্রাপ্ত ছয়জন পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা হয় না। পুলিশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস শুধুই বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিরোধের ইতিহাস নয়; বরং এটি ছিল দায়িত্ববোধ ও সাহসের এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। মার্চের পরপরই দেশের বিভিন্ন থানাকে প্রতিরোধকেন্দ্রে পরিণত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রচর্চায় সহায়তা করা, গোপনে রাইফেল তুলে দেওয়া, যুদ্ধকালীন প্রশাসনিক যোগাযোগ টিকিয়ে রাখাসহ বহু ভূমিকায় পুলিশ সদস্যরা কাজ করেছেন। ঝিনাইদহের তৎকালীন এসডিপিও যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রেজারির অর্থ ও স্বর্ণ নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যুদ্ধের তহবিলে যুক্ত করার কাজেও ভূমিকা রাখেন। সরকারি সূত্রমতে, ২৯ মার্চ তিনি ভারতের কাছ থেকে আসা প্রথম অস্ত্রচালান গ্রহণ ও বণ্টনের কাজেও যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, পুলিশ তখন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল না, বরং যুদ্ধরত এক নবজাত রাষ্ট্রের অবকাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছিল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ অন্তত ৫ জন পুলিশ সদস্য বীরত্বসূচক খেতাব লাভ করেন। অনলাইন সরকারি নথিতে যাঁদের নাম পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে আছেন মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম; কনস্টেবল মোহাম্মদ সোলাইমান, বীর প্রতীক; শহীদ কনস্টেবল আবদুল মান্নান, বীর বিক্রম; কাজী জয়নুল আবেদীন, বীর প্রতীক; এবং শহীদ কনস্টেবল তৌহিদ আলী, বীর বিক্রম। এই তালিকাটি একদিকে গৌরবের, একই সঙ্গে বেদনার। কারণ তাঁদের নাম আছে, খেতাব আছে, কিন্তু সবার পূর্ণাঙ্গ জীবনগল্প আজও সমানভাবে সংরক্ষিত নয়। ইতিহাস অনেক সময় বিজয়ের পতাকা তুলে ধরে, কিন্তু পতাকাবাহী মানুষের মুখগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। বাংলাদেশ পুলিশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও যেন সেটাই সত্য হয়ে উঠেছে।

এ ক্ষেত্রে, মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রমের ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর ভেতর দিয়ে আমরা পুলিশের মুক্তিযুদ্ধ-অবদানকে বৃহৎ স্তরে দেখতে পাই। ঝিনাইদহের পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ২৭ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামের ভারতগমনের গোপন ব্যবস্থাপনাতেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল যুদ্ধকালীন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার পরিচালনার দায়িত্বও তাঁর কাঁধে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি ছিল এক প্রতীকী ও বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্ত। একটি রাষ্ট্র তখনও যুদ্ধের মাত্র শুরুর দিকে, কিন্তু তার পক্ষে আনুষ্ঠানিক সালাম দিচ্ছে পুলিশ। এই দৃশ্য শক্তির ভাষার বাইরে গিয়ে নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার বার্তাও বহন করে।

শহীদ আবদুল মান্নান পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার রাঙামাটি পুলিশ লাইনে কর্মরত থাকাকালে ২৬ মার্চ যুদ্ধে যোগ দেন। পরে ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে কালুরঘাট যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধরত অবস্থায় রাউজান থানার মদিনাঘাট এলাকায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন আবদুল মান্নান। অন্যদিকে, শহীদ তৌহিদ আলী রাজশাহী জেলা পুলিশ লাইনে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ২৩ এপ্রিল পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অভয়নগর ব্রিজ এলাকায় যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। দুজনকেই বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরে স্বাধীনতা পদকও পেয়েছে, ১৯৭১-এর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। তবে পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অজানা থেকে গিয়েছে। একদিকে একটি দলের রাজনৈতিক আনুকূল্যের কারণে বীর বিক্রম এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদের আত্মত্যাগের ঘটনাগুলো আমরা খুঁজে পাই; আবার একই সঙ্গে শহীদ কনস্টেবল আবদুল মান্নান, বীর বিক্রম; শহীদ কনস্টেবল তৌহিদ আলী, বীর বিক্রম; মোহাম্মদ সোলায়মান, বীর প্রতীক; এবং কাজী জয়নুল আবেদীন, বীর প্রতীক-এর মতো মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করা পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের বিস্তারিত ঘটনাগুলো আমাদের আজও অজানা। রাজারবাগের সেই রাত থেকে গার্ড অব অনার, জেলা-থানায় গড়ে ওঠা প্রতিরোধ, যুদ্ধের অর্থসংগ্রহ, বেতার বার্তা, অস্ত্র সরবরাহ এবং অবশেষে শহীদদের দীর্ঘ তালিকা—সবই বোঝায়, এই অবদানের মূল্য কতটা রক্ত দিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ এই ইতিহাস পুরোপুরি কখনোই আলোচনায় আসেনি।

পুলিশকে নিয়ে আজকের আলোচনা বেশিরভাগ সময় আবর্তিত হয় জনআস্থা, সংস্কার, পেশাদারিত্ব বা মানবিকতার প্রশ্নে। সেসব প্রশ্ন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু স্বাধীনতার রক্তাক্ত লড়াইয়ে এই প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্নেই যে বিশাল রক্ত ও আত্মত্যাগের এক অধ্যায় জড়িয়ে আছে, সেটি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

১৯৭১-এর সেই অগ্নিপরীক্ষায় অনেকেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন নিজের জীবন দিয়ে। তাঁদের একটা অংশ ইতিহাসে নাম রেখে গেছেন, বাকিরা আধো-অন্ধকারে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কারও কারও আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরিসরে তাঁদের নিয়ে চর্চা হয় না বললেই চলে।

মুক্তিযুদ্ধের এই মহান বীরদের, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচার করা বিশেষ করে বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। এই স্মরণ ও স্বীকৃতির কার্যক্রম শুধু তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাম্প্রতিক কঠিন বাঁকবদলের সময়ে পুলিশের আত্মত্যাগ, মর্যাদা ও দেশপ্রেমের এই ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ এই ইতিহাসই তুলে ধরতে পারে যে দেশের সংকটকালে জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পুলিশ প্রকৃত অর্থেই একটি দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ