২০১৪ সালে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলাকালীন দেশজুড়ে একটি ভয়ংকর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, “পদ্মা সেতুর পিলার তৈরিতে মানুষের কাটা মাথা প্রয়োজন।” এই গুজবের সঙ্গে আরও একটি ভিত্তিহীন খবর রটে যায় যে, এই কাজের জন্য ‘ছেলেধরা’ চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং তারা নিষ্পাপ শিশুদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জ ও শহুরে নিম্নবিত্ত এলাকায় এই আতঙ্ক এমনভাবে জেঁকে বসেছিল যে, শিশুদের স্কুলে পাঠানো বা খেলাধুলা করতে বাইরে যেতে দিতেও অভিভাবকরা ভয় পাচ্ছিলেন। সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলস্বরূপ শুরু হয় একের পর এক গণপিটুনির মর্মান্তিক ঘটনা।
এই গুজবের শিকার হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রেণু নামের একজন নারী। নিজের সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে নির্মমভাবে গণপিটুনির শিকার হন তিনি। সন্তানের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই বিভীষিকাময় ঘটনা শুধু তার জীবনই কেড়ে নেয়নি, বরং সমাজের গভীরে থাকা অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং ভুল তথ্যের ভয়াবহ প্রভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
কুসংস্কার থেকে গুজবের মনস্তত্ত্ব তৈরি
পদ্মা সেতুর ‘কাটা মাথা বলি দেওয়া’ ধরনের গুজবের ঘটনাগুলো রাতারাতি সৃষ্টি হয় না। এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘকাল ধরে মানুষের মনে প্রোথিত কিছু বিশ্বাস, লোকগাথা এবং আংশিক সত্যের বিকৃত রূপ। আমাদের সমাজে বলিদানসংক্রান্ত কিছু পুরনো কাহিনি, যেমন সেতু বা বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণে মানব বলির প্রয়োজন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। সেই পুরনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাস থেকেই এই গুজবের উৎপত্তি। ঈশপের গল্পের মতো এখানে কেবল একজন সম্পূর্ণ নির্দোষ ভেড়া আর একজন নিষ্ঠুর নেকড়ে নয়। প্রায়শই দেখা যায়, ভুক্তভোগী ও অপরাধী-উভয় পক্ষের অজ্ঞতা, লোভ বা ভুল ধারণা তাদের এক সুতোয় বেঁধে ফেলে এবং ভয়াবহ সব নিষ্ঠুর ঘটনার জন্ম দেয়।
যখন কোনো একদল মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয়, তখনই সৃষ্টি হয় তথাকথিত ‘মব সহিংসতা’। এর ফলস্বরূপ কোনো মায়ের মৃত্যু ঘটে উন্মত্ত জনতার হাতে বা নিরীহ সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ‘মোরাল প্যানিক থিওরি’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এটি ব্যাখ্যা করে, কীভাবে একটি ক্ষুদ্র বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সমাজে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি বললেও। উদাহরণস্বরূপ, যখন গণমাধ্যমে ধর্ষণ বা ডাকাতির ঘটনা ব্যাপক হারে প্রচারিত হয়, তখন মানুষ আতঙ্কিত হয়ে একা বাইরে যেতে ভয় পায়। এমন পরিস্থিতিতে মেয়ে শিশুদের স্কুলে যাওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই আতঙ্ক মানুষের মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা বৃদ্ধি করে এবং নিজের হাতে আইন কার্যকর করার প্রবণতা বাড়ায়। কার্যত, মানুষ মনে করতে থাকে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুবিচার সম্ভব নয়, তাই তারা নিজেই ব্যবস্থা নেয়। এটিকেই মব জাস্টিস বলা হয়। বস্তুত, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে আইন নিজের হাতে নেওয়া কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা করা হোক বা সাধারণ জনগণের মাধ্যমে-এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে গুজব কেবল সহিংসতার জন্মই দেয় না, বরং এর এক ধরনের ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। দেশের যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদল বা অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে কিছু কুচক্রী মহল সাধারণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন দোকানপাট, শপিং মল বা ব্যাংক-লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে। একই সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাজারে পর্যাপ্ত মাল থাকা সত্ত্বেও পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে। এভাবে তারা একদিনের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
আইনি কাঠামো ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশে তথ্যবিভ্রাট, গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দমনের লক্ষ্যে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৫০৫ অনুযায়ী, যদি কোনো গুজব বা প্রতিবেদন সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ উসকে দেয়, জনসাধারণকে অপরাধে প্ররোচিত করে বা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে, তবে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, যদি সাইবার স্পেসে বিদ্বেষপূর্ণ, মিথ্যা বা মানহানিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, তবে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
তবে এই আইনগুলো ঘিরে সমালোচনা কম হয়নি। বিশেষ করে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০১৮ এবং পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে প্রণীত সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০২৩-এর সঙ্গে সর্বশেষ সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এই আইনগুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এর ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিন্নমত দমন বা সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারকে সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে, দুষ্কৃতকারী বা কুচক্রী ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ালেও আইনগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বাঁধাধারার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কখনো নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে, আবার কখনো অপরাধী অবাধে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের ভূমিকা
দেশের অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সরকারি যে সংস্থার নাম প্রথমে আসে, তা হলো পুলিশ। গুজব এবং অপতথ্যের ব্যবহার বন্ধ করতেও সাধারণ মানুষের পুলিশের প্রতি প্রত্যাশা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্ব বহুমুখী। একদিকে তারা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, যাতে অপতথ্য বা গুজব আর ছড়াতে না পারে এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে; অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে গুজবের প্রতি বিভ্রান্তি কমাতে হবে।
গুজবসহ যেকোনো অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রোল থিওরি’ গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি মানুষই অপরাধপ্রবণ, কিন্তু সামাজিক, পারিবারিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বাধ্যবাধক নিয়ম-কানুন তাদের নিজের ইচ্ছামতো কাজ বা অপরাধ থেকে বিরত রাখে। তাই গুজবের মোকাবিলায় পুলিশ শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করবে না, বরং সামাজিক ও পারিবারিক দিকেও সচেতনতা বৃদ্ধি করে একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে কার্যকর হয় প্রো-অ্যাকটিভ এবং রিঅ্যাকটিভ পুলিশিং।
তথ্য অপরাধ দমনে একাডেমিক অঙ্গনে কিছু পদ্ধতি জনপ্রিয়। এর মধ্যে ‘ইন্টেলিজেন্স-লেড পুলিশিং’ অন্যতম। এই পদ্ধতিতে পুলিশ বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, যেমন অপরাধ রিপোর্ট, সামাজিক মাধ্যম এবং গোপন সূত্র। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হুমকি চিহ্নিত করা হয় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব প্রশিক্ষিত সাইবার বিশেষজ্ঞ থাকা অত্যন্ত জরুরি, যাতে জটিল সাইবার অপরাধ সহজে উদঘাটন এবং যথাসময়ে পদক্ষেপ নেওয়া যায়। অপর একটি পদ্ধতি হলো ‘নোডাল পুলিশিং’, যা মূলত ‘নোডাল গভর্ন্যান্স’ ধারণা থেকে উদ্ভূত। এটি আধুনিক বিশ্ব, বিশেষত সাইবার অপরাধী চক্রের বিস্তৃতির সঙ্গে অধিকতর উপযোগী। এর সঙ্গে মিলে যায় ম্যানুয়েল ক্যাসেলসের ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি থিওরি’—যা নির্দেশ করে, আধুনিক সমাজ জটিল নেটওয়ার্ক দ্বারা গঠিত, যেখানে ক্ষমতা ও প্রভাব বিভিন্ন নোডের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। নোডাল পুলিশিং অনুযায়ী পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি প্রতিনিধি, শিক্ষক এবং সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন অংশীজন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একটি ‘নোড’ হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি নোডের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুলিশের এক কার্যকর কৌশল হলো ‘প্রি-বাংকিং’। এটি একটি প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি, যেখানে মানুষকে মিথ্যা তথ্য বা গুজব দেখার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। ঠিক যেমন টিকাদানের মাধ্যমে শরীরকে দুর্বল ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করা হয়, প্রি-বাংকিং মানুষকে শিক্ষা দেয় কীভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি হয়, ছড়ায় এবং কীভাবে তা ঠেকানো যায়। এর ফলে জনগণ সম্ভাব্য ভুল তথ্যের মুখোমুখি হলে সঠিকভাবে যাচাই করে তা এড়াতে সক্ষম হয়।
ম্যানুয়েল ক্যাসেলসের ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি থিওরি’ অনুযায়ী আধুনিক সমাজ জটিল নেটওয়ার্ক দ্বারা গঠিত। এই উত্তর-আধুনিক যুগে মিথ্যা তথ্যের অবাধ বিচরণ এবং তার ফলে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিতিশীলতা রোধ করতে এই জটিল নেটওয়ার্ককে অনুধাবন করা অপরিহার্য। সামাজিক মাধ্যমগুলো প্রাথমিকভাবে ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তথ্য দ্রুত ছড়ায়, কারণ প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম সমমনা মানুষের মধ্যে ‘ইকো বাবল’ তৈরি করে, যেখানে পূর্বধারিত মতাদর্শের সঙ্গে মিলিত তথ্য যাচাই ছাড়াই শেয়ার করা হয়।
এই ধরনের তথ্যের দ্রুত ছড়ানো রোধ করতে তথ্যের উৎস অনুসন্ধান জরুরি। যেহেতু তথ্য মূলত শেয়ার করার মাধ্যমে ছড়ায় এবং উৎসের সংখ্যা কম থাকে, তাই প্রি-বাংকিংয়ের পরবর্তী ধাপে ভুল তথ্য সমাজে ছড়ালে দ্রুত উৎস শনাক্ত, যাচাই এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
সুপারিশমালা: বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা
গুজব ও অপতথ্য বিস্তার মোকাবিলায় পুলিশ নিচে প্রদত্ত কিছু সুপারিশ বিবেচনায় নিতে পারে:
সাইবার ও এআই অপরাধবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ: প্রচলিত যেকোনো অপরাধের তুলনায় সাইবার এবং এআই-সংক্রান্ত অপরাধ, বিশেষ করে গুজবের মতো ঘটনা, অনেক বেশি জটিল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার দাবি রাখে। সেক্ষেত্রে পুলিশের জন্য প্রয়োজন সাইবার ইউনিটকে আরও সুসংহত করা এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যম থেকে গুজব ও ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আস্থাহীনতা দূরীকরণে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ: গুজবপ্রবণ সহিংসতায় সাধারণ মানুষ জড়িয়ে পড়ার একটি প্রধান কারণ হলো—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা, যা মানুষকে নিজের হাতে আইন কার্যকর করতে প্ররোচিত করে। এই সমস্যার মোকাবিলায় স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করা জরুরি। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং যাচাই-বাছাইয়ের একটি কার্যকর প্রক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব, যা গুজব এবং সম্পর্কিত সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
গণসচেতনতা কর্মসূচি: স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মন্দির এবং কমিউনিটি সেন্টারে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মশালা ও প্রচার অভিযান পরিচালনা করা। এর মাধ্যমে জনগণকে গুজব চিহ্নিতকরণ এবং গুজবের পর আইন নিজের হাতে নেওয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবহিত করা। এ কাজে স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে।
অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়: পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ টাস্কফোর্স বা ‘নোড’ গঠন করা। এই নোডগুলো দ্রুত গুজব শনাক্ত করে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে কাজ করবে।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল: বিশেষ করে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করা, যারা গুজব বা গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে পারবে।
তথ্য যাচাইয়ের প্ল্যাটফর্ম: পুলিশের পক্ষ থেকে একটি নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে নাগরিকরা কোনো তথ্য বা গুজবের সত্যতা যাচাই করতে পারবে।
মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ: পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য সাইবার মনস্তত্ত্ব, ক্রাউড সাইকোলজি এবং সংকট ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা।
এই সম্মিলিত শক্তিই পারে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে। পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
মোরাল প্যানিক: যখন ভয় সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে
সমাজে অনেক সময় এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঘটনাকে হঠাৎ করেই খুব বড় ধরনের সামাজিক হুমকি হিসেবে দেখা শুরু হয়। বাস্তবে ঘটনাটি যতটা বড়, মানুষের ভয় তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। সমাজবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় মোরাল প্যানিক। এই ধারণাটি সবচেয়ে পরিচিতভাবে ব্যাখ্যা করেন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন। তাঁর ১৯৭২ সালের বই ফোক ডেভিলস অ্যান্ড মোরাল প্যানিক-এ তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে কিছু ঘটনা গণমাধ্যমের উপস্থাপন, জনআলোচনা এবং প্রভাবশালী মহলের প্রতিক্রিয়ার কারণে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে মানুষ বিষয়টিকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর বলে ধরে নিতে শুরু করে।
সহজ করে বললে, মোরাল প্যানিক তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজে ভয়, সন্দেহ আর উত্তেজনা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে মানুষ ঠান্ডা মাথায় বিচার করার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সীমিত সমস্যা তখন এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেন তা পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ বিপদ। এর ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। তারা ধরে নেয়, কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এই জায়গা থেকেই জনমত বদলাতে শুরু করে।
এই তত্ত্ব বোঝার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো ব্রিটেনের মডস অ্যান্ড রকারসের ঘটনা। ১৯৬০-এর দশকে ইংল্যান্ডে এই দুই তরুণ গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলো ছিল সীমিত পরিসরের, কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ, এবং সেগুলোকে পুরো সমাজের জন্য বড় সংকট বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু গণমাধ্যম সেগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরে, যেন দেশের তরুণ সমাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বসেছে। সংবাদপত্রের ভাষা, শিরোনাম, ছবি এবং একই ধরনের খবরের পুনরাবৃত্তি মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করে যে, এই তরুণ গোষ্ঠীগুলো শুধু বেপরোয়া নয়, সমাজের জন্য বিপজ্জনকও।
এখানেই মোরাল প্যানিকের আসল দিকটি ধরা পড়ে। একটি ঘটনা যত নাটকীয়ভাবে সামনে আনা হয়, মানুষ সেটিকে তত বেশি সত্য, বড় এবং ভয়ংকর বলে ধরে নিতে থাকে। ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তাদের আলাদা কিছু ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং সমস্যা বা হুমকির প্রতীক হিসেবে দেখা শুরু হয়। অর্থাৎ, মিডিয়া অনেক সময় শুধু খবর দেয় না, মানুষের ভয় পাওয়ার ধরনও তৈরি করে দেয়।
এই প্রক্রিয়ায় জনমত বদলে যায় কয়েকটি ধাপে। প্রথমে মানুষ কোনো খবর দেখে উদ্বিগ্ন হয়। তারপর সেই উদ্বেগ সন্দেহে রূপ নেয়। এরপর বারবার একই রকম উপস্থাপনার ফলে একটি গোষ্ঠী বা বিষয়কে ঘিরে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। পরে সমাজে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে, বিষয়টি সত্যিই ভয়াবহ, তাই এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। সমাজবিজ্ঞানী এরিখ গুড ও নাখমান বেন-ইহুদা তাঁদের ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত বই মোরাল প্যানিকস: দ্য সোশ্যাল কনস্ট্রাকশন অব ডেভিয়েন্স-এ দেখিয়েছেন, মোরাল প্যানিকের মধ্যে সাধারণত কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকে: কনসার্ন বা উদ্বেগ, হস্টিলিটি বা নির্দিষ্ট কারও বা কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাব, কনসেনসাস বা অনেক মানুষের মধ্যে একই ধরনের বিশ্বাস তৈরি হওয়া, ডিসপ্রপরশনালিটি বা বাস্তবতার তুলনায় আতঙ্কের মাত্রা বেশি হয়ে যাওয়া এবং ভোল্যাটালিটি বা এই আতঙ্কের দ্রুত পরিবর্তনশীলতা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই ধারণাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুজব, অপতথ্য বা উসকানিমূলক প্রচার অনেক সময়ই এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষ যাচাই না করেই ভয় পেয়ে যায়, সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং পরে আইন নিজের হাতে তুলে নিতেও পিছপা হয় না। অর্থাৎ, সমস্যা শুধু ভুল তথ্য নয়, সেই ভুল তথ্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক আতঙ্কও। তাই গুজব মোকাবিলার ক্ষেত্রে কেবল তথ্য ঠিক করে দিলেই হবে না, মানুষের মনে ভয় কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিও বুঝতে হবে।
লেখক
শিক্ষার্থী ও গবেষক
ক্রিমিনোলজি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

