বুধবার, এপ্রিল ২২, ২০২৬
32 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রচ্ছদনবযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশ ইতিহাসের ধারায় আগামীর রূপরেখা

নবযাত্রায় বাংলাদেশ পুলিশ ইতিহাসের ধারায় আগামীর রূপরেখা

মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম
,

পুলিশ জনগণের রক্ষক না সেবক—এই মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধারণাগত দ্বন্দ্বটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্ক, কর্তৃত্ব ও দায়বদ্ধতার চেতনা এবং জন-আস্থার কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কারণ ‘রক্ষক’ পরিচয় পুলিশকে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, আর ‘সেবক’ পরিচয় তাকে জনগণের অংশীদার ও সহায়ক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়।তবে ‘রক্ষক’ শব্দটির আবার ভিন্ন অর্থও রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে রক্ষক বলতে জনগণের রক্ষক বোঝালেও, স্বৈরতান্ত্রিক দেশ কিংবা কর্তৃত্ববাদী সরকারের অভিধানে রক্ষক বলতে শাসকগোষ্ঠীর জান ও মালের নিরাপত্তা বিধানকে বোঝায়। অনেক সময় জনগণের সুরক্ষার বদলে উল্টো জনগণের কাছ থেকে শাসকদের সুরক্ষা দেওয়াই পুলিশের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ পুলিশের বিবর্তন ছিল ঔপনিবেশিক পুলিশের শাসকদের সুরক্ষা দেওয়ার দর্শন থেকে। এরপর পাকিস্তানি শাসনামল এবং সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের পদযাত্রা। এই দীর্ঘ সময়কালে পুলিশি দর্শনের পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা এক কথায় বলা যাবে না। আইন-কানুন ও কাঠামোগত দিক থেকে ঘষামাজা করা হলেও মূলত সেই ঔপনিবেশিক ভিত্তি এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। তবে পরিবর্তন কিছুটা হয়েছে মননে, মগজে ও মানসিকতায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, গণআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘জনতার পুলিশ’ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।

তাই পটপরিবর্তনে বিভিন্ন সময়েই সংস্কার ও পরিবর্তনের আলোচনা ঘুরেফিরে আসে। তবে পুলিশের পরিবর্তন শুধুই একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়, কারণ পুলিশ হচ্ছে শাসকের পক্ষ থেকে জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ক্ষমতার প্রতিভূ। সে কারণে পুলিশকে সংস্কার করতে গেলেই শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসে। ক্ষমতার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনঃসংজ্ঞায়নের প্রয়োজন পড়ে। আর সে কারণেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক রদবদলের মধ্য দিয়ে গেলেও বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার সব সময় কিছুটা সামনে এগিয়ে পরে দু’পা পিছিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ে। এজন্যই বারবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যত সামনে এগোয় না।

তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসন কাঠামো থেকে জাতিকে উত্তরণ ঘটিয়ে জনতার জনবান্ধব পুলিশ গঠনের রূপকল্পে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিধিমালা অনুসরণ করে একটি প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে উপস্থাপন করে। যদিও এই সংস্কার কমিশনের আলাপ-আলোচনার পদ্ধতিগত দিক কিংবা অংশীজনদের মতামত নেওয়ার ব্যাপ্তি নিয়ে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় রত বাংলাদেশ পুলিশের ‘জনতার পুলিশ’ হয়ে ওঠার যে অভিপ্রায়, সে বিবেচনায় পুলিশের সংস্কার মূলত অনিবার্য। গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে জনগণের সংযোগের ক্ষেত্রে পুলিশ সব সময়ের মতোই অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তাই পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
উক্ত নিবন্ধে মূলত পুলিশের ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং পুলিশের সংস্কারের পটপরিবর্তনের পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিভিন্ন সংস্কার নিয়ে বিশেষ পর্যালোচনা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নতুন পদযাত্রায় পুলিশের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শও প্রদান করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন: প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পুলিশিং ব্যবস্থা

বাংলাদেশের পুলিশিং ব্যবস্থার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগে পুলিশিং ব্যবস্থা মূলত সামন্ততান্ত্রিক এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের মিশেলে পরিচালিত হতো। প্রাচীন ভারতে মৌর্য ও গুপ্ত রাজবংশের সময় থেকে একটি সুসংগঠিত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়।

কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ অনুযায়ী, সে সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয় ধরনের গুপ্তচর নিয়োগের বিধান ছিল। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন, বৈদেশিক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ এবং জনসাধারণের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করা। অর্থাৎ সর্বাগ্রে শাসন ও শাসককে সুরক্ষিত রাখা—সে তা দেশের অভ্যন্তরীণ শত্রু হোক কিংবা বিদেশি শত্রু, এমনকি দেশের জনগণের কাছ থেকেও।

মধ্যযুগে সুলতানি ও মুঘল আমলে পুলিশিং ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। সুলতানি আমলে ‘মুহতাসিব’ নামক এক বিশেষ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা নৈতিকতা পরিদর্শক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীতে মুঘল আমলে ‘কোতোয়াল’ প্রথাটি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রতিটি নগর এলাকায় কোতোয়ালি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও বাংলাদেশের অনেক স্থানে ‘কোতোয়ালি’ নামেই পরিচিত।

মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ‘ফৌজদারি’ প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে জেলা বা সরকার পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হতো। তবে এ সময় গ্রামীণ এলাকার নিরাপত্তা মূলত স্থানীয় জমিদার বা চৌকিদারদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই চৌকিদারি ব্যবস্থা আর সেরকম পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি এবং বিকশিতও হয়নি। যদিও এখনো গ্রাম চৌকিদার ব্যবস্থা বহাল আছে।

ঔপনিবেশিক বিবর্তন: ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও আধুনিক বাহিনীর জন্ম

বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান যে কাঠামো আমরা দেখি, তার ভিত্তিমূল স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজকে এই উপমহাদেশে তাদের শাসন বজায় রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে, ভারতীয়দের দমনের জন্য একটি সামরিক ধাঁচের আধা-সামরিক পুলিশ বাহিনী প্রয়োজন।

১৮৫৬ সালে স্যার চার্লস নেপিয়ার আইরিশ কলোনিয়াল প্যারামিলিটারি পুলিশের মডেলে ভারতীয় পুলিশকে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৬০ সালে একটি পুলিশ কমিশন গঠিত হয় এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন।
এই আইনের মূল দর্শন ছিল ‘নিয়ন্ত্রণ’, ‘দমন’ এবং ‘আনুগত্য’। পুলিশকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে তারা জনগণের অধিকারের চেয়ে ব্রিটিশ রাজের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। ১৮৬১ সালের আইনে পুলিশের ওপর ‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থা আরোপ করা হয়। জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাধারণ অধীনে রাখা হয়, যা পুলিশকে একটি স্বাধীন পেশাদার বাহিনীর পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার পথ সুগম করে। এই আইন আজও বাংলাদেশে পুলিশের পরিচালনায় বহাল রয়েছে।

পাকিস্তান আমল

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও পুলিশ বাহিনীর মৌলিক চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ব্রিটিশদের তৈরি ১৮৬১ সালের আইন এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশন বহাল থাকে। পাকিস্তান সরকার পুলিশকে মূলত রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ বাহিনীর উত্তর-ঔপনিবেশিক দমনমূলক চরিত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে পুলিশকে সেনাবাহিনীর একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই সময়ে পুলিশিংয়ের দর্শন ছিল বাঙালির জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করা। তবে এই দমন-পীড়নের মধ্যেই বাঙালি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ বপন হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে, তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তাদের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের এই ভূমিকা কেবল একটি লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি সাহসী প্রচেষ্টা।

মনস্তাত্ত্বিক পটপরিবর্তন: ‘ফোর্স’ বনাম ‘সার্ভিস’ দ্বন্দ্ব

পুলিশ সংস্কারের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত দিকটি হলো বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন। স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ পুলিশ একটি ‘জনবান্ধব সার্ভিস’ বা সেবামূলক সংস্থায় পরিণত হবে। কিন্তু গত ৫৩ বছরে বাহিনীর মনস্তত্ত্ব মূলত ঔপনিবেশিক ‘ফোর্স’ বা শাস্তিমূলক শক্তির দর্শনেই আটকে ছিল।

ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের উপাদান

ব্রিটিশরা পুলিশকে শিখিয়েছিল যে জনসাধারণ হলো ‘সাবজেক্ট’ বা প্রজা, আর পুলিশ হলো ‘মাস্টার’ বা শাসক। সারদা পুলিশ একাডেমির মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে এখনো যে স্থাপত্য বা সংস্কৃতি বজায় রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করে। পুলিশের ইউনিফর্ম, পদক এবং আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ সবকিছুর মধ্যেই একটি সামরিক আধিপত্যের আবহ রয়ে গেছে। ‘ব্যারাক’ বা অফিসার্স মেস সংস্কৃতি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি অভিজাত মানসিকতা তৈরি করে, যা তৃণমূল পর্যায়ের নাগরিকদের সাথে তাদের সংযোগে বাধা দেয়।

রাজনৈতিকীকরণ ও পেশাদারিত্বের অভাব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সরকার পুলিশকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। নিয়োগ, পদায়ন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার ফলে বাহিনীর পেশাদারিত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইতঃপূর্বে দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন সরকারের সময়ই, বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ব্যাপক হারে দলীয় বিবেচনায় পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে| এই রাজনৈতিকীকরণের ফলে পুলিশের মনস্তত্ত্বে ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার চেয়ে ‘পলিটিক্যাল লয়ালটি’ বা রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

শাস্তি নয়, সংশোধন
ঐতিহাসিকভাবে পুলিশ ব্যবস্থার শিকড় ছিল শাসন রক্ষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণে। যেমন—যুক্তরাজ্যে ১৮২৯ সালে রবার্ট পিল-এর উদ্যোগে আধুনিক পুলিশ গঠিত হয়| তাঁর “পিলিয়ান প্রিন্সিপলস”-এ বলা হয়েছিল, পুলিশের প্রধান কাজ শাস্তি দেওয়া নয়, বরং অপরাধ প্রতিরোধ করা। এখানে মনস্তত্ত্বটি ছিল মানুষকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং সামাজিক আস্থা তৈরি করে আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করা। অর্থাৎ শাস্তি শেষ উপায়; মূল লক্ষ্য প্রতিরোধ ও সংশোধন।

পরবর্তীতে ২০ শতকে “রিহ্যাবিলিটেটিভ জাস্টিস” বা সংশোধনমূলক বিচার ধারণা বিকশিত হয়, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০–৭০ দশকে। এই সময়ে অপরাধকে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণের ফল হিসেবে বিশ্লেষণ করা শুরু হয়। মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের প্রভাব বাড়ে। “লেবেলিং থিওরি” বলেছে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলে সে সেই পরিচয়কেই নিজের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তাই কেবল শাস্তি দিলে পুনরায় অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

একইভাবে জাতিসংঘ ও তাদের বিভিন্ন নীতিমালায় (বিশেষ করে কারা ও কিশোর বিচার ব্যবস্থায়) পুনর্বাসন, পুনঃএকত্রীকরণ এবং মানবিক আচরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে| শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে “ডাইভারশন প্রোগ্রাম” বা বিকল্প ব্যবস্থা অনেক দেশে চালু করা হয়েছে, যেখানে পুলিশ সরাসরি মামলা না দিয়ে কাউন্সেলিং বা সামাজিক সহায়তার দিকে পাঠায়।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে “শাস্তি”-ভিত্তিক পুলিশিং ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এর ভিত্তি হলো ডিটারেন্স থিওরি—ভয় দেখালে মানুষ অপরাধ করবে না। কিন্তু “সংশোধন”-ভিত্তিক পুলিশিং দাঁড়িয়ে থাকে আচরণ পরিবর্তন, সামাজিক সহায়তা এবং পুনঃএকত্রীকরণের ওপর। এখানে পুলিশ কেবল আইন প্রয়োগকারী নয়; বরং কমিউনিটির অংশীদার। আধুনিক “কমিউনিটি পুলিশিং” মডেল, যা জাপানের কোবান ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত, এই দর্শনকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছে| সেখানে পুলিশ স্থানীয় জনগণের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে; ছোটখাটো অপরাধ বা বিচ্যুতি হলে আগে পরামর্শ ও সতর্কবার্তার মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করে।

পুলিশ সংস্কারের ইতিহাস
স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমান পুলিশ ব্যবস্থা মূলত ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ধারাবাহিক রূপ, যা পাকিস্তান আমল অতিক্রম করে স্বাধীনতার পরও বহাল রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন বাস্তবতা ও চাহিদার প্রেক্ষিতে পুলিশের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বারবার অনুভূত হয়েছে। ছোট-বড় নানা পরিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল, পরবর্তী পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ—প্রতিটি সময়েই পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কিছু সংস্কার প্রচেষ্টা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

১৭৯২: কালেক্টরশিপ পুলিশ প্রবিধান (বেঙ্গল, বিহার, ওড়িশা)
লর্ড কর্নওয়ালিসের সময়ে ‘রেগুলেশন ফর দ্য পুলিশ অব দ্য কালেক্টরশিপ ইন বেঙ্গল, বিহার অ্যান্ড ওড়িশা’ চালু হয়। লক্ষ্য ছিল জমিদারনির্ভর অনিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বদলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পুলিশিং আনা। এতে জমিদারদের পুলিশ রাখার দায়িত্ব শিথিল করে এলাকা গুলোকে পুলিশের এখতিয়ারে আনা হয়, অঞ্চলভিত্তিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ব্যবস্থা হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার পদবি হিসেবে ‘দারোগা’ ব্যবস্থাকে কার্যকর কাঠামো হিসেবে দাঁড় করানো হয়। চৌকিদার ও গ্রাম ওয়াচম্যানরা দারোগার অধীন থাকে এবং গভর্নর ইন কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া দারোগাকে বরখাস্ত করা যেত না।

১৮১৮: বার্ডস কমিটি
মি. বার্ডের নেতৃত্বে এই কমিটি পুলিশকে দক্ষ প্রতিষ্ঠান বানানোর পরিকল্পনা তৈরি করে| তারা পুলিশের দুর্নীতি ও অদক্ষতার দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করে: এক, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব; দুই, অপ্রতুল বেতন-ভাতা। সুপারিশ অনুযায়ী বেতন-ভাতা বাড়ানো হয় এবং বড় ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়, যেমন সুপারিনটেনডেন্ট জেনারেল অব পুলিশ, ২০ জন লোকাল সুপারিনটেনডেন্ট, ৩২ জন সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট, ৮৮৮ জন দারোগা, ৪৪৪০ জন জমাদার এবং ৬৬৬০০ জন বরকন্দাজের পদ সৃষ্টি| তখন থানার সংখ্যা ৮৮৮ হওয়ায় প্রতিটি জেলার জন্য পুলিশ সুপারের পদ সৃষ্টির দিকেও এক ধাপ এগোয়| তবে বিশাল ভূগোল ও জনসংখ্যার তুলনায় জনবল সীমিত থাকায় বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কঠিন ছিল। কমিটি পুরনো চৌকিদারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং দারোগাদের বেতন ও ভাতা বাড়ানোর কথাও বলে।

১৮৬০: এইচ. এম. কোর্ট পুলিশ কমিশন
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা পুলিশকে নতুনভাবে সাজানোকে অনিবার্য মনে করে।১৮৬০ সালের আগস্টে এইচ. এম. কোর্টের নেতৃত্বে প্রথম বড় পুলিশ কমিশন গঠিত হয়| কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন প্রণীত হয়, যা বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় একসাথে কার্যকর হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশেও দীর্ঘকাল কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকে।এই কমিশন জনমনে পুলিশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন, অপরাধ দমন ও প্রতিরোধ, তদন্তের মান এবং সামগ্রিক পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়| পাশাপাশি তারা পুলিশকে দ্বৈত কর্তৃত্বে রাখে—সুপারিনটেনডেন্টকে যেমন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে দায়বদ্ধ করা হয়, তেমনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও দায়বদ্ধ রাখা হয়, যা বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করে। এই কমিশনের আরেকটি বড় অবদান হলো সামরিক কাঠামো থেকে আলাদা ইউনিফর্মধারী সিভিল পুলিশের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারদের আইজিপির অধীন সাজানো।

১৯০২: ফ্রেজার পুলিশ কমিশন
এই কমিশনের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ছিল প্রশিক্ষণ। পুলিশ ট্রেনিং কলেজে পুলিশ অফিসারদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রস্তুত করার প্রশ্নে কমিশন গঠিত হয়। এই সময় পুলিশে উচ্চস্তরে ব্রিটিশ অফিসার এবং স্থানীয় পুলিশের মধ্যে কাঠামোগত বৈষম্য ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত ব্রিটিশ উচ্চপদস্থদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং নিম্নস্তরের কর্মীদের কঠোর পরিদর্শন ও তদারকির অধীনে রাখা হতো। কমিশন এই প্রশিক্ষণ ও কাঠামোগত বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়।

১৯৬০–৬১: বিচারপতি জি. বি. কনস্ট্যান্টাইন কমিশন
এই কমিশন পরিসর ও সুপারিশের দিক থেকে বড়| তারা পুলিশের সাংবিধানিক অবস্থান, পরিবহন ও লজিস্টিক, নিয়োগ, বেতন-ভাতা এবং বিশেষায়িত পুলিশ কাঠামো যেমন পৌরসভা পুলিশ, গ্রাম পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ, রিজার্ভ পুলিশ, গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে| মোট ৭৯টি সুপারিশ দেয়| সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জনসাধারণ ও পুলিশের সম্পর্ক উন্নয়নে আলাদা সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা, অর্থাৎ পুলিশিংকে শুধু প্রশাসনিক নয়, জনআস্থা ও সেবার দৃষ্টিতেও দেখা।

১৯৬৫: ব্যাচ-বার্নওয়েল কমিটি
এ কমিটি মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে জনবল সংকট ও নগর চাপের বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করে| পাশাপাশি সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে কিছু পদক্ষেপের পরামর্শ দেয়।

১৯৭১: এ. ও. মিঠা কমিশন
মেজর জেনারেল এ. ও. মিঠার নেতৃত্বে কমিশন পুলিশ প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়| প্রধান সুপারিশ ছিল পুলিশের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক উইং প্রতিষ্ঠা এবং ‘তদন্ত’ ও ‘প্রসিকিউশন’ কার্যক্রমকে আলাদা করা। প্রশিক্ষণে অতিরিক্ত ‘রেজিমেন্টেশন’ কমানোর কথাও বলা হয়| নিয়োগনীতি ও বিদ্যমান র‌্যাংক স্ট্রাকচারে পরিবর্তনের সুপারিশও ছিল। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়ন।

১৯৮২: ফৌজদারি আইন সংস্কার কমিটি
এ কমিটি আদালতকেন্দ্রিক প্রসিকিউশন ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে। তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ কোর্ট ইন্সপেক্টর ও কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টরের গুণমান ও কর্মক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই, আর খণ্ডকালীন পিপি ও এপিপির মাধ্যমে মামলা পরিচালনায় ব্যবস্থা স্থবির হচ্ছে। তাই তারা পুলিশ কোর্ট ইন্সপেক্টর ও কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টরের পদ বিলুপ্ত করে আলাদা প্রসিকিউশন ক্যাডার গঠনের সুপারিশ করে: পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর, ডেপুটি পাবলিক প্রসিকিউটর, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর। বেতন-ভাতা ও কাঠামো বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দেয়।

১৯৮৩: ব্রিগেডিয়ার এনাম কমিটি
এই কমিটির আলোচিত সুপারিশ ছিল সার্কেল ইন্সপেক্টর ও অফিসার-ইন-চার্জ পদের পুনর্গঠন। সার্কেল ইন্সপেক্টরকে এএসপি পদমর্যাদায় এবং ওসিকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়। তবে কমিটির বড় মনোযোগ ছিল জনবল কমানোর দিকে, অর্থাৎ কাঠামোগত আপগ্রেডের পাশাপাশি সংখ্যাগত সংকোচনের ধারণা কাজ করেছে।

১৯৮৮–৮৯: বিচারপতি আমিনুর রহমান পুলিশ কমিশন
এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে বিস্তৃত পুলিশ কমিশনগুলোর একটি| প্রতিবেদনে বিশটি অধ্যায়, দুটি খণ্ড, প্রায় ৩২৮ পৃষ্ঠা এবং প্রায় ২০০টির মতো সুপারিশ ছিল| কমিশনের বড় অবস্থান ছিল: পুলিশ বিভাগের ত্রুটির দায় শুধু পুলিশের নয়, সরকার ও নাগরিকদেরও ভূমিকা আছে| তারা পুলিশ অকার্যকর হওয়ার ৯টি কারণ নির্ধারণ করে: জনবল ঘাটতি, যানবাহন ও অস্ত্রের অভাব, আত্মবিশ্বাস ও জনগণের সহযোগিতা পাওয়ার দুর্বলতা, বিচার বিভাগের সাথে পেশাগত সম্পর্কের ঘাটতি, নিয়োগ-প্রশিক্ষণ-পদোন্নতিতে ত্রুটি, অপরাধ রেকর্ডিং ও পরিসংখ্যানে গাফিলতি, দুর্বল তদন্তের পর প্রসিকিউশন, অযাচিত হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি, এবং শৃঙ্খলা কার্যকরে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের অভাব।

কাঠামোগতভাবে তারা পুলিশ সদর দপ্তরকে চার বিভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়: প্রশাসন ও অপারেশন, নিয়োগ-জনশক্তি-প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, অর্থ-উন্নয়ন-ক্রয় ও সরবরাহ, এবং অপরাধ ব্যবস্থাপনা| তারা থানাভিত্তিক জনবল মান নির্ধারণ, অতিরিক্ত থানা স্থাপন, মহকুমায় স্থায়ী গোয়েন্দা কইউনিট, ট্রাফিক নথি ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটারাইজেশন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত লোক বাছাই এবং পুলিশ স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার দিকেও জোর দেয়।

১৯৮৯: মাহমুদুল হাসান রিপোর্ট
এ রিপোর্টের কেন্দ্রে ছিল জনবল ও রসদ শক্তিশালী করা| রেঞ্জ পর্যায়ে আরআরএফ কাঠামো, জেলা সদর দপ্তরে বিশেষ সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠন, থানা ও ফাঁড়ির জনবল পরিস্থিতি মূল্যায়ন, থানায় এসআই সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে একজন এএসপিকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ আছে| পুলিশ সদর দপ্তর, মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিআইডি ও বিশেষ শাখা পুনর্গঠন এবং পুলিশ গোয়েন্দা, নৌ-পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ চালুর আহ্বানও ছিল| রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদন হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

১৯৭৬ সালের মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স
ঢাকায় ১৯৭৬ সালে মেট্রোপলিটন পুলিশিং প্রবর্তন করা হয়| এর মাধ্যমে মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আরোপিত দ্বৈত শাসনের প্রভাব কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়| পুলিশ কমিশনারের হাতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়, যাতে পুলিশিং কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকর হয়| পরবর্তীতে চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীতেও এই মডেল অনুসরণ করা হয়। তবে এটি ছিল মূলত প্রশাসনিক বিস্তার, কোনো মৌলিক সংস্কার নয়।

ইউএনডিপির পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ইউএনডিপির অর্থায়নে ‘পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রাম’ শুরু হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রকল্প। পুলিশের সেবাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সংবেদনশীল সেবা প্রদান নিশ্চিত করা ছিল মূল লক্ষ্য। এই প্রকল্পের আওতায় দুই ধাপে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা হয়:

  • কমিউনিটি পুলিশিং প্রবর্তন এবং সমগ্র দেশে ২০,০০০-এর বেশি কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম গঠন
  • নারী পুলিশ নেটওয়ার্ক তৈরি এবং থানায় নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ ডেস্ক স্থাপন
  • ৩,০০০-এর বেশি কর্মকর্তাকে আধুনিক তদন্ত কৌশল ও মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ
  • নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সেবা নিয়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার স্থাপন

এই সংস্কারগুলো কারিগরি দিক থেকে সফল হলেও এর ব্যাপকতা বা সামগ্রিক অর্থে বিস্তৃত কাঠামোগত পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়। তবে কিছু সংবেদনশীল সেবা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা ডেস্ক, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং কমিউনিটি পুলিশিং জনগণের কাছে পুলিশের প্রতি আস্থা কিছুটা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়।

২০০৭ সালের খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ
বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থায় এ পর্যন্ত যে সব সংস্কার কার্যক্রম হয়েছে, তা মূলত বিশেষ কোনো সেবা, আইন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা নতুন পরিষেবা সংযোজন সম্পর্কিত ছিল। তবে সামগ্রিক অর্থে পুলিশের কাঠামোগত, আইনগত এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের জন্য ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কার পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।  সে সময় বেশ কিছু আইনগত সংস্কার এবং কাঠামো পরিবর্তনের সুপারিশসহ খসড়া পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশে পুলিশকে শাসকের অনুষঙ্গ বাহিনীর পরিবর্তে জনগণের পাশে, জনবান্ধব ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী হিসেবে দেখা হয়েছে। নিচে অধ্যাদেশটির উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ধারা তুলে ধরা হলো:

১. স্বাধীন জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন
এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল একটি জাতীয় পুলিশ কমিশন গঠন। এই কমিশনে সরকারি দল, বিরোধী দল, পুলিশ আইজিপি, নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ মোট ১১ জন সদস্য থাকার কথা বলা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থের প্রয়োগ থেকে মুক্ত রাখা। কমিশন পুলিশ নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, যাতে কোনো সরকার পুলিশকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

২. তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা শাখার পৃথকীকরণ
বর্তমানে পুলিশ সদস্যদের একই সাথে নিরাপত্তা বিধান, মিছিল-মিটিং নিয়ন্ত্রণ (আইনশৃঙ্খলা) এবং মামলার তদন্তসহ সব ধরনের কাজ করতে হয়। ২০০৭ সালের খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা ও তদন্ত এই দুটি শাখাকে সম্পূর্ণ আলাদা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ‘তদন্ত শাখা’ শুধুমাত্র অপরাধের ক্লু উদ্ঘাটন ও সত্যতা যাচাইয়ে নিয়োজিত থাকত, ফলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হতো এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম হতো।

৩. পুলিশের বিরুদ্ধে নাগরিক অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন
পুলিশের বিরুদ্ধে আসা ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তদন্ত করার জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল| সাধারণত পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত পুলিশই করে থাকে, যা অনেক সময় নিরপেক্ষ হয় না| এই স্বাধীন বিভাগ থাকলে পুলিশের জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত|

৪. পদ ও মেয়াদের সুরক্ষা
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের (যেমন আইজিপি বা এসপি) কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া হুটহাট বদলি বা পদাবনতি বন্ধের প্রস্তাব দেওয়া হয়| আইজিপির জন্য একটি নির্দিষ্ট কার্যকাল (যেমন ২ বছর) নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল, যাতে তিনি কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন|

৫. আধুনিক জনবান্ধব ও কমিউনিটি পুলিশিং
এই সংস্কারের প্রেক্ষাপটে পুলিশকে ‘শাসক’ নয়, বরং ‘সেবক’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। জনগণের সাথে পুলিশের দূরত্ব কমিয়ে আনতে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা আইনি কাঠামো দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এতে করে সাধারণ মানুষ ও পুলিশ মিলে একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পেত।

৬. পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও জীবনমান উন্নয়ন
সংস্কারের প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ, উন্নত প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি ভাতা এবং আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। একজন পুলিশ সদস্যের জীবনমান ভালো হলে তার মধ্যে দুর্নীতি করার প্রবণতা কমবে, এটিই ছিল এই প্রস্তাবের মূল দর্শন।

সর্বোপরি, এই খসড়া অধিবেশনগুলোর প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য ছিল, পুলিশ যাতে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে ওঠে, যেকোনো ব্যক্তি বা দল, গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা অপব্যবহার হতে নিজেকে স্বাধীন ও জনবান্ধব পুলিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার সুরক্ষা। কিন্তু ২০০৯ সালে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর খসড়াটি আর আইন হিসেবে পাস করা হয়নি, কারণ এটি পুলিশের ওপর সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দিত।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পুলিশ সংস্কার কমিশন ও পর্যালোচনা চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যা একসময় রূপ নেয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। পতন হয় দীর্ঘদিনের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা ফ্যাসিবাদী শাসনের। সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায় গণতন্ত্রের পথে দেশ গড়ার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় সংস্থায় হাত দেয়। শুরুর দিকে যে ছয়টি সেক্টরকে প্রাধান্য দিয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পুলিশ সংস্কার কমিশন। দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন গবেষক, পুলিশ প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আইনজ্ঞ এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিশনকে।

এই কমিশন পুলিশ সংস্কারের কার্যকর প্রস্তাবনা প্রণয়নে গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এক্ষেত্রে তারা ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা, সাধারণ জনগণ, ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছে। এছাড়াও পুলিশের বিদ্যমান নীতিমালা, আইন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে। এর পাশাপাশি তারা ব্যাপক হারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের জন্য একটি গণজরিপ পরিচালনা করে, যেখানে পুলিশের বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও তারা বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে, যার মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের দেশীয় বিভিন্ন সংস্থা যেমন ইউএনডিপি, ইউএনএইচআরসি, ইউনেস্কোসহ আরও অনেকে। পাশাপাশি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তারা দফায় দফায় আলোচনা করেছে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন মাসের মধ্যে তারা পুলিশ সংস্কার প্রতিবেদন তৈরি করে। এই সংস্কারের উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো নিচে দেওয়া হলো:

বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার
কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো পাঁচ ধাপে বলপ্রয়োগের সুসংগঠিত কাঠামো প্রণয়ন এবং তা আইনগত বাধ্যবাধকতা দেওয়া। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি ও ১৯৪৩ সালের পিআরবি যুগোপযোগী করে আধুনিক জনতা নিয়ন্ত্রণ নীতির সাথে সামঞ্জস্য আনার সুপারিশ করা হয়েছে। গ্রেফতার, তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়েছে। থানায় স্বচ্ছ কাচঘেরা পৃথক জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ, নারী আসামির ক্ষেত্রে নারী পুলিশের উপস্থিতি, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য।

জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা
তল্লাশি ও অভিযানে পরিচয় গোপন বা ওয়ারেন্টবিহীন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জরুরি কল সার্ভিস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযানে জিপিএস ট্র্যাকিং ও বডিওর্ন ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ রয়েছে। রাতের গৃহতল্লাশিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা স্থানীয় প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মামলা রুজু, এফআইআর গ্রহণ ও তদন্তে নিয়মিত তদারকি, গায়েবি মামলা প্রতিরোধ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির অপব্যবহার রোধে কঠোর ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
নীতিগতভাবে একটি নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব এসেছে, যা আইনগত বা সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় গঠিত হতে পারে। থানায় জিডি ও এফআইআর গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা, বিশেষায়িত তদন্ত দল গঠন, তদন্তকে ক্যারিয়ার পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা—এই সুপারিশগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার দিকে নির্দেশ করে। পুলিশ ভেরিফিকেশনকে যুক্তিসঙ্গত করতে ‘আইনি’ ঠিকানা অনুসন্ধান শিথিলকরণ, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাই বাতিল, এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ভেরিফিকেশন সম্পন্নের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে ওয়াচডগ কমিটি ও দীর্ঘমেয়াদি টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ রয়েছে।

আইন, প্রযুক্তি ও বিশেষায়ন
১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি ও ১৯৪৩ সালের পিআরবি সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের জন্য ডিজিটাল ফরেনসিক, ডিএনএ, বায়োমেট্রিক, এআই ও সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। সেন্টার ফর পুলিশ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গঠনের নীতিগত সমর্থন
দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ফরেনসিক ল্যাব, মাইক্রোসিন ইউনিট ও অটোমেটেড ডিএনএ ল্যাব স্থাপনের প্রস্তাব তদন্ত সক্ষমতা জোরদারের দিকে ইঙ্গিত করে।

জনকেন্দ্রিকতা ও অন্তর্ভুক্তি
নিয়মিত টাউন হল সভা, থানাভিত্তিক নাগরিক নিরাপত্তা কমিটি, মামলা অগ্রগতির তথ্য উন্মুক্ত রাখা এবং কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু সুরক্ষায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন ও পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সম্প্রসারণের সুপারিশ রয়েছে। পুলিশ সদস্যদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।

কল্যাণ ও মানবসম্পদ
পুলিশ সদস্যদের জন্য পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সার্ভিস, মানসিক সহায়তা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত ডিউটির প্রণোদনা, স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন এবং নারী সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক পদায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করার কথাও উল্লেখ আছে।

আন্তঃসংগঠনিক সমন্বয়
কারাগার ও পুলিশ ব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার, মাদকদমন সংস্থার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ডেটাবেজ, এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে।
সার্বিকভাবে কমিশনের সুপারিশসমূহ একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক পুলিশ ব্যবস্থার রূপরেখা প্রদান করে। এখন মূল প্রশ্ন বা বাস্তবায়ন, আইনগত সংশোধন, প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া এ প্রস্তাবগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

জুলাই সনদ ২০২৫

জুলাই সনদ একটি রাষ্ট্রীয় দলিল, যেখানে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসমূহ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে একপর্যায়ে ঐকমত্যে উপনীত হন, যার মধ্যে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন ছিল অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। এর প্রেক্ষিতে সরকার ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করে। অধিবেশন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে পুলিশের বিভিন্ন অংশীজন এবং মানবাধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে একটি পুলিশ কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়। এই অধিবেশনে পুলিশ কমিশনের দায়িত্ব, এখতিয়ার এবং অতিরিক্ত ও ঐচ্ছিক নির্দেশনার খাতাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার কেনো অপরিহার্য
বাংলাদেশ পুলিশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তন ও সংস্কার-আলোচনার প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে কেবল আইনি সংশোধন যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কর্মপরিবেশ এবং আচরণগত মানসিকতায় সমান্তরাল পরিবর্তন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়। বিষয়টি কয়েকটি মৌলিক বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়:
প্রথমত, জন-আস্থা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন:আধুনিক রাষ্ট্রীয় পুলিশিং কেবল ক্ষমতার প্রয়োগ নয়; এটি সামাজিক সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইউক্রেনের রবার্ট পিলের নীতিমালায় বলা হয়েছিল, পুলিশের কার্যকারিতা নির্ভর করে জনগণের সহযোগিতার ওপর। জন-আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপরাধ রিপোর্টিং কমে, সাক্ষীরা এগিয়ে আসে না, এবং তদন্ত দুর্বল হয়। তাই জনকেন্দ্রিক ও স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া কার্যকর পুলিশিং সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার মানদণ্ড: জাতিসংঘের কোড অব কন্ডাক্ট ফর ল এনফোর্সমেন্ট অফিসিয়ালস” এবং বেসিক”প্রিন্সিপলস অন দ্য ইউজ অব ফোর্স অ্যান্ড ফায়ারআর্মস
স্পষ্টভাবে প্রয়োজনীয়তা, সমানুপাতিকতা ও জবাবদিহিতার নীতি নির্ধারণ করেছে। বলপ্রয়োগের সুসংগঠিত ধাপ, প্রশিক্ষণ, এবং স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা না থাকলে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঝুঁকি বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বিচ্যুতি ঘটে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, গ্রেফতার, হেফাজত ও জিজ্ঞাসাবাদে স্বচ্ছতা:জাতিসংঘের “কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার” রাষ্ট্রকে নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের মানদণ্ড, ভিডিও রেকর্ডিং, আইনজীবীর প্রাপ্যতা, এবং হেফাজতের শর্ত উন্নত না হলে অভিযোগ, মামলা ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ে। এটি শুধু মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়; দুর্বল তদন্তের কারণে আদালতে মামলা টিকেও না।

চতুর্থত, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতকরণ:উন্নত দেশে ফরেনসিক ল্যাব, আলামত সংগ্রহ, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট এবং প্রসিকিউশনের সাথে সম্পর্কিত কাঠামো তদন্তকে পদ্ধতিগত ও জবাবদিহিমূলক করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হলে তদন্ত ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচার ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পঞ্চমত, স্বাধীন অভিযোগ ও জবাবদিহিতা কাঠামো:ইউক্রেনের মতো দেশে স্বাধীন অভিযোগ সংস্থা গঠনের ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছতা বেড়েছে। অভিযোগ ব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা না থাকলে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। তাই আচরণগত সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার মাধ্যমে শক্তিশালী করা জরুরি।

ষষ্ঠত, কর্মপরিবেশ ও কল্যাণের সাথে পেশাদারিত্বের সম্পর্ক:অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত আবাসন বা মানসিক সহায়তার অভাব দীর্ঘমেয়াদে কর্মদক্ষতা ও নৈতিক মানকে প্রভাবিত করে। নরওয়ে ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে প্রশিক্ষণে নৈতিকতা, ডি-এস্কেলেশন ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আচরণগত সংস্কৃতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। সুশৃঙ্খল কর্মপরিবেশ দুর্নীতি ও অসদাচরণ কমাতে সহায়ক।

সপ্তমত, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন ও তথ্য সুরক্ষা। বডিওর্ন ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকিং বা ডিজিটাল রেকর্ডিং ব্যবস্থার সফল প্রয়োগের জন্য কেবল সরঞ্জাম নয়; নীতিমালা, ডেটা সুরক্ষা এবং নিয়মিত অডিট প্রয়োজন। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রযুক্তি জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে, তবে তা কার্যকর হয় কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হলে।

অষ্টমত, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়। মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদ, বন্দি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে “নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস”, এবং শিশু ও কিশোর সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রাষ্ট্রকে একটি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত পুলিশিং কাঠামো গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সংস্কার মানে কেবল নতুন আইন প্রণয়ন নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক শাসন, কর্মপরিবেশের মানোন্নয়ন, আচরণগত পরিবর্তন এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সমন্বিত প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এই চারটি স্তরে একযোগে পরিবর্তন না এলে সংস্কার টেকসই হয় না। বাংলাদেশেও একটি পেশাদার, মানবিক ও জন-আস্থাভিত্তিক পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি অনিবার্য।

উপসংহার:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পুলিশ সংস্কার আর কেবল নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়; এটি নতুন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জন-আস্থার প্রতি দায়বদ্ধতার একটি বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশ পুলিশ সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে, তা হেলায় হারালে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে। অতীতে অনেক সংস্কার উদ্যোগ রাজনৈতিক অনীহা, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে থেমে গেছে। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, এবং তারা পুলিশের পুরোনো চেহারায় ফিরে যাওয়া আর মেনে নেবে না। পুলিশ সংস্কার কেবল একটি আইনি দলিল বা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়; এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার প্রশ্ন। একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক পুলিশ বাহিনীই পারে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন অবশ্যই সহজ কাজ নয়, কিন্তু তা অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন নতুন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ধারাবাহিক নীতি-সমর্থন এবং প্রশাসনের আন্তরিক প্রয়াস। এখন দেখার বিষয়, জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে সরকার এই পরিবর্তনের পথে কতটা দৃঢ়ভাবে এগোতে পারে।

লেখক
প্রভাষক,
বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ