বৃহস্পতিবার, মে ১৪, ২০২৬
33.5 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপুলিশ সপ্তাহ ২০২৬কঠোর শাস্তির বিধান, নাকি শাস্তির নিশ্চয়তা? অপরাধপ্রবণতা কমাতে কার্যকর কোনটি

কঠোর শাস্তির বিধান, নাকি শাস্তির নিশ্চয়তা? অপরাধপ্রবণতা কমাতে কার্যকর কোনটি

মোঃ কামরুল আহসান
,

সমাজে কোনো অপরাধের হার বেড়ে গেলেই একশ্রেণির মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়, অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। খুন, ধর্ষণ কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় প্রায়ই বিভিন্ন অধিকারকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে দোষীদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার দাবি জানাতে দেখা যায়। জনমতের চাপে অনেক সময় আইন সংশোধনের মাধ্যমে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু অপরাধবিজ্ঞান ও শাস্তি-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবিগুলোর একটি বড় অংশ আবেগনির্ভর, বাস্তবসম্মত নয়। প্রশ্ন হলো, মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তি কি সত্যিই অপরাধ কমায়? কোনো অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত হলে অপরাধীরা কি সেই অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাস ও তত্ত্ব, দুটির দিকেই তাকাতে হবে। ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডে দুই শতাধিক অপরাধের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। এর মধ্যে এমন অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আজকের দৃষ্টিতে সামান্য ছিঁচকে চুরি হিসেবে বিবেচিত। এমনকি বাবার আদেশ অমান্য করার মতো তুচ্ছ কারণেও মানুষকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু এরপরও সে

সময়ের সমাজ কি অপরাধমুক্ত ছিল? উত্তর: না। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই বোঝা যায়, শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখা যায় না। অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শাস্তির পাশাপাশি আরও কিছু সহায়ক উপাদান কার্যকরভাবে উপস্থিত থাকা জরুরি। 

শাস্তির ভয় ও ডিটারেন্স তত্ত্ব

অপরাধবিজ্ঞানে ‘ডিটারেন্স’ একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির ভয় মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, শাস্তির ভয় একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। তবে আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান ডিটারেন্সকে একটি একক উপাদান হিসেবে দেখে না। ডিটারেন্স কার্যকর হওয়ার জন্য সাধারণত তিনটি শর্তের কথা বলা হয়:

১. শাস্তির নিশ্চয়তা
২. শাস্তির দ্রুততা
৩. শাস্তির আনুপাতিক মাত্রা

শাস্তির নিশ্চয়তা বলতে বোঝায়, অপরাধ করলে অপরাধী ধরা পড়বে এবং শাস্তির মুখোমুখি হবে, এমন বাস্তব বিশ্বাস। শাস্তির দ্রুততা হলো অপরাধ সংঘটনের পর যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা। আর শাস্তির মাত্রা বলতে বোঝায়, অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করা, যেন তা অতিরিক্ত কঠোরও না হয়, আবার অযৌক্তিকভাবে লঘুও না হয়।

এই তিন উপাদান একসঙ্গে কার্যকর থাকলেই ডিটারেন্স কাজ করে। এখানে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এই তিনটি শর্তের কতগুলো বাস্তবে বিদ্যমান?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিটারেন্সের বাস্তবতা

সম্প্রতি পিবিআই পরিচালিত একটি গবেষণায় প্রায় ৮৪টি ধর্ষণ মামলার এজাহারনামীয় আসামিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৪২ শতাংশ আসামি জানতেনই না যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আবার প্রায় ২৮ শতাংশ আসামির ধারণা ছিল, এই অপরাধে আদৌ কোনো শাস্তি হবে না।

এই তথ্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, অনেক অপরাধীর মনেই দেশের বিচার বিভাগের ব্যাপারে শাস্তিহীনতার একটি বিশ্বাস গেঁথে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, ন্যায়বিচারের অনিশ্চয়তা এবং শাস্তি কার্যকর না হওয়ার অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ আদালতে মামলার জট ও বিচারকের স্বল্পতা। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে প্রায় ৪৭ লাখ মামলা বিচারাধীন, অথচ বিচারকের সংখ্যা মাত্র ২,৩০৭ জন। গড়ে একজন বিচারকের ওপর প্রায় দুই হাজার মামলার ভার পড়ে, যা বাস্তবে কার্যকর বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব।

এই বাস্তবতায় ডিটারেন্সের একটি মৌলিক শর্ত ‘শাস্তির দ্রুততা’ ব্যবস্থাগতভাবেই অনুপস্থিত। একই সঙ্গে শাস্তির নিশ্চয়তার ক্ষেত্রেও ঘাটতি স্পষ্ট। পিবিআইয়ের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের প্রায় ৫৭ শতাংশ খালাস পান। আবার সাজাপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশও তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার শাস্তি পান। এতে শাস্তির আনুপাতিকতার প্রশ্নও উঠে আসে।

এই বাস্তবতা শুধু হত্যা মামলার ক্ষেত্রেই সত্য, তেমন নয়; বাংলাদেশের অধিকাংশ অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রায় একই রকম। ফলে কঠোর আইন প্রণয়ন করলেও, ডিটারেন্সের তিনটি শর্ত পূরণ না হলে অপরাধ কমার সম্ভাবনা খুবই সীমিত থাকে।

এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২

তবে বাংলাদেশে কঠোর আইন ও তার সঠিক প্রয়োগের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ রয়েছে এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। ১৯৯৯ ও ২০০০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০০টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যার প্রায় ৭৩ শতাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন নারী। এই পরিস্থিতিতে ২০০২ সালে প্রণয়ন করা হয় এসিড অপরাধ দমন আইন এবং এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন। এসিড নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই অপরাধ কমার পেছনে শুধু কঠোর শাস্তি নয়, বরং ডিটারেন্সের তিনটি শর্তই তুলনামূলকভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।

প্রথমত, আইন অনুযায়ী এসিড নিক্ষেপের মামলায় পুলিশকে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। ফলে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

দ্বিতীয়ত, এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনের সহায়তায় ভুক্তভোগীরা আইনি ও সামাজিক সহায়তা পান, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে।

তৃতীয়ত, গান, নাটক, বিজ্ঞাপন ও সামগ্রিক গণসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে এসিড অপরাধের ভয়াবহতা ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

চতুর্থত, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে এসিডের আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ও বিক্রয়ে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে অপরাধের মূল উপাদানই তুলনামূলকভাবে দুর্লভ হয়ে পড়ে। এর ফলে ২০১১ সালে এসে এসিড-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৮০টিতে, যা এক দশক আগেও ছিল চার শতাধিক। এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামানও এই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগকে অপরাধ হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

শুধু কঠোর শাস্তি কি অপরাধ কমায়

আন্তর্জাতিক অপরাধবিজ্ঞান গবেষণায় একটি বিষয় এখন প্রায় সর্বসম্মত, শাস্তির মাত্রা বাড়ানো একা অপরাধ কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের একাধিক বিস্তৃত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কিংবা অত্যন্ত কঠোর শাস্তি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বিদ্যমান ও অনুপস্থিত এমন অঞ্চলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধের হারে ধারাবাহিক ও স্থায়ী পার্থক্য দেখা যায় না।

কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও অপরাধবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ন্যাগিন দেখিয়েছেন, অপরাধীরা সাধারণত শাস্তির সর্বোচ্চ মাত্রা নয়, বরং ধরা পড়ার সম্ভাবনা ও শাস্তি হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি বেশি বিবেচনা করে। অর্থাৎ আইনে মৃত্যুদণ্ড থাকলেও যদি অপরাধীর কাছে মনে হয় যে সে ধরা পড়বে না বা মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকবে, তাহলে সেই শাস্তি কার্যত কোনো প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলতে পারে না।

ইউরোপের দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ড বহু আগেই বিলুপ্ত হলেও সেখানে সহিংস অপরাধের হার অনেক ক্ষেত্রেই কম বা স্থিতিশীল। বিপরীতে যেসব দেশে শাস্তির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল তদন্ত রয়েছে, সেখানে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। এতে বোঝা যায়, শাস্তির মাত্রার চেয়ে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাই অপরাধ প্রতিরোধে মুখ্য ভূমিকা রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণালব্ধ প্রমাণ আসে বিচারিক বিলম্ব নিয়ে করা গবেষণা থেকে। বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি পেতে যদি বহু বছর লেগে যায়, তাহলে সেই শাস্তির প্রতিরোধমূলক প্রভাব প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। অপরাধী মানসিকভাবে অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। ফলে কয়েক বছর পর দেওয়া কঠোর শাস্তি সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলেও অপরাধ প্রতিরোধে খুব সীমিত ভূমিকা রাখে।

তাহলে কি কঠোর শাস্তি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়

এই আলোচনার পর একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি কঠোর শাস্তির কোনো প্রয়োজনই নেই? উত্তরটি সংক্ষিপ্তভাবে বললে, না, কঠোর শাস্তি অপ্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু একে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বা প্রধান উপায় ভাবাটাই সমস্যার জায়গা। কঠোর শাস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও প্রতীকী ভূমিকা রয়েছে। সমাজ কিছু অপরাধকে, যেমন ধর্ষণ, পরিকল্পিত হত্যা বা চরম সহিংসতাকে এতটাই গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করে যে সেখানে রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ নিন্দা প্রকাশ করতে চায়। কঠোর শাস্তি সেই নিন্দার প্রতীক। এটি ভুক্তভোগী ও সমাজকে বলে যে, রাষ্ট্র এই অপরাধগুলোকে হালকাভাবে নেয় না।

তবে সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কঠোর শাস্তিকে প্রতিরোধের একমাত্র জাদুকরি সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ অপরাধী অপরাধের মুহূর্তে শাস্তির সর্বোচ্চ মাত্রা নিয়ে যুক্তিবাদী হিসাব-নিকাশ করে না। বরং তারা দেখে, ধরা পড়ার সম্ভাবনা কতটা, বিচার আদৌ হবে কি না এবং তা হলে কবে হবে। এই বাস্তবতায় কার্যকর বিচারব্যবস্থা ছাড়া কঠোর শাস্তি অনেক সময় কাগুজে হুমকিতে পরিণত হয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো, দুর্বল তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে কঠোর শাস্তি ভুল রায়ের ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়। বিচারিক ভুল হলে লঘু শাস্তির ক্ষতি সংশোধনযোগ্য হলেও, চরম শাস্তির ক্ষেত্রে সেই সুযোগ আর থাকে না। ফলে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

অতএব, কঠোর শাস্তির প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা তখনই অর্থবহ, যখন সেটি শাস্তির নিশ্চয়তা, দ্রুত বিচার এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই কঠোর শাস্তিকে কার্যকর বিচারব্যবস্থার অংশ হিসেবেই তার ভূমিকা নির্ধারিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পথ হওয়া উচিত শাস্তির মাত্রা বাড়ানোর পথ থেকে সরে এসে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া।

প্রথমত, শাস্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ শুধু নতুন আইন নয়; বরং তদন্তের মান উন্নয়ন, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং মামলা প্রাথমিক পর্যায়েই দুর্বল হলে তা বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

দ্বিতীয়ত, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো অপরিহার্য। এর জন্য বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল, সময়সীমা নির্ধারিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং মামলার ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার জরুরি। শাস্তি যত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, প্রতিরোধমূলক প্রভাব তত বেশি হবে।

তৃতীয়ত, শাস্তির আনুপাতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত না হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতা ও তথ্যভিত্তিক প্রচার অপরাধ প্রতিরোধের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনের ভয় তখনই কাজ করে, যখন মানুষ সেই আইন সম্পর্কে জানে এবং বিশ্বাস করে যে তা বাস্তবে প্রয়োগ হবে।

সবশেষে, অপরাধের উৎস ও সুযোগ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। যেমন, এসিড অপরাধের ক্ষেত্রে এসিডের প্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। ধর্ষণ, সহিংসতা বা অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রেও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা, উভয় থেকেই বোঝা যায়, কঠোর শাস্তি একা অপরাধ কমানোর পূর্বশর্ত নয়। শাস্তির মাত্রা যতই বাড়ানো হোক, যদি ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে, তবে শাস্তির ভয় কার্যকর হয় না। এতে অনেক সময় শাস্তিহীনতার ধারণা আরও শক্ত হয়।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে হলে শাস্তির নিশ্চয়তা, দ্রুত বিচার এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী আনুপাতিক শাস্তি একসঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুলিশ-প্রসিকিউশন-আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করতে হবে।

আবেগনির্ভর কঠোর আইনের বদলে কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমানোর বাস্তব পথ।

লেখক
ডিআইজি, কনফিডেনশিয়াল
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ