‘ভাত খাও, না হলে পুলিশ আসবে’ কিংবা ‘ঘুমাও, না হলে পুলিশ আসবে’-দুষ্টুমি করা শিশুদের জন্য বাংলাদেশি মায়েদের অমর দুটি ভীতিজাগানিয়া বাক্য। শুনলেই শিশুটি সঙ্গে সঙ্গে ভীত হয়ে চুপ হয়ে যায়। এই দৃশ্য হয়তো খুব নিত্যদিনের, কিছুটা হাস্যরসেরও। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্ব-পুলিশ মানেই ভয়। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের মধ্যে এই ভয় আরও তীব্র। এই ভয় কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আসে, তা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবেও এটি শেখানো হয়।
যখন একজন মা তার শিশুকে বলেন, ‘পুলিশ আসবে’, তখন তিনি আসলে একটি ভীতিনির্ভর ধারণা তৈরি করেন। শিশুটিও সেই ধারণা নিয়েই বড় হয়-পুলিশ মানে শাস্তি, নির্ভরতা নয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেন? রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যাদের নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, তারা কেন ভয়ের প্রতীকে পরিণত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাস, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার দিকে।
বাংলাদেশে পুলিশের ভাবমূর্তি গঠনের পেছনে ঔপনিবেশিক প্রভাব রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে পুলিশ ছিল শাসকের হাতিয়ার, সাধারণের বন্ধু নয়। সেই কাঠামো অনেকাংশে আজও টিকে আছে। এই উপমহাদেশে রাষ্ট্র আর শাসক যেমন কখনোই বাস্তবিক অর্থে নারীবান্ধব অথবা শিশুবান্ধব হতে পারেনি, ঠিক তেমনি ‘শাসকের হাতিয়ার’ হিসেবে বিবেচিত পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নারীদের আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশুরা পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করে। ইউনিসেফ ও ব্র্যাকের কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অনেক নারী যৌন সহিংসতা বা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হলেও পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। কারণ হিসেবে তারা লজ্জা, সামাজিক চাপ, পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস এবং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ হেফাজতে নিজেদের নিরাপদ মনে না করাকে উল্লেখ করেছেন।একটি জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ নারী মনে করেন, থানায় গেলে তারা সম্মানজনক ব্যবহার না-ও পেতে পারেন। যদিও এই সংখ্যা অঞ্চলভেদে হয়তো ভিন্ন, তবু এটি একটি বড় সংকেত দেয়, আস্থার ঘাটতি এখনো প্রকট। অতীতে কিছু ঘটনা এই অনাস্থার ভিতকে আরও শক্ত করেছে। বিভিন্ন সময় পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি, এমনকি নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে।সমাজের অন্যান্য অংশের মতো পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠেন, যেখানে নারীর প্রতি প্রচলিত ধারণা ও ‘ভালো মেয়ে’র সামাজিক বিনির্মাণের পূর্বধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নারী ভুক্তভোগী থানায় গেলে তাঁকে সহানুভূতির বদলে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ‘কেন রাতে বাইরে ছিলেন?’ বা ‘আপনার পোশাক কেমন ছিল?’—এই ধরনের প্রশ্ন প্রায়ই ভুক্তভোগীদের মানসিকভাবে আরও অসহায় করে তোলে।
অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে, ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন। কখনো অভিযোগ নেওয়া তো হয়ইনি, উপরন্তু কখনো এমনভাবে প্রশ্ন করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগীকে আরও বিব্রত করেছে। এসব অভিজ্ঞতা এখন সামাজিক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারী পুলিশ নিয়োগ কিছুটা বেড়েছে, তবুও তা তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক নারী ভুক্তভোগী পুরুষ কর্মকর্তার সামনে নিজেদের অভিজ্ঞতা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে তারা অভিযোগ জানাতেই অনীহা প্রকাশ করেন। এর সঙ্গে রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যেমন অনেক থানায় পৃথক নারী ডেস্ক, নারী পুলিশ কর্মকর্তা বা গোপনীয়ভাবে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকে না। ফলে নারী ভুক্তভোগীরা সেখানে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বস্তি বোধ করেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা খুলে বলতে পারেন না।
পুলিশের নারীবান্ধব অথবা নারীর প্রতি সংবেদনশীলতার বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের অভাবও নারীদের থানায় যাওয়া থেকে বিরত রাখে। নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে লিঙ্গীয় সংবেদনশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ট্রমা-ইনফর্মড অ্যাপ্রোচ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকায় পুলিশ সদস্যরা অনেক সময় পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দিতে ব্যর্থ হন। আবার নারীদের হেনস্তার বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তার তদন্ত ও শাস্তির উদাহরণ খুবই কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা দৃশ্যমান না হওয়ায় সাধারণ মানুষ পুলিশকে তার আস্থার জায়গায় রাখতে পারে না।
তবে আশার কথা, পুরো চিত্রটাই এমন হতাশাজনক নয়। অনেক থানায় ‘উইমেন সাপোর্ট ডেস্ক’ চালু করা হয়েছে, যেখানে নারী পুলিশ সদস্যরা ভুক্তভোগীদের সহায়তা করেন। এছাড়া হেল্পলাইন সেবা ও মোবাইল অ্যাপ চালুর মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো সারা দেশে সমানভাবে কার্যকর হয়নি। এছাড়া ইউএন উইমেন ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় লিঙ্গীয়-সংবেদনশীল পুলিশিং নিয়ে কাজ হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, যদিও তা এখনো যথেষ্ট নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠন। অনেক দেশে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ মডেল সফল হয়েছে, যেখানে পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ একসঙ্গে কাজ করে। বাংলাদেশেও এই মডেল চালু হয়েছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা বাড়াতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন ওঠে, নারীবান্ধব পুলিশ পাওয়া কি সম্ভব? পেলেও কীভাবে? প্রথমত, পুলিশের জন্য বাধ্যতামূলক লিঙ্গীয় সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি থানায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জন্য পৃথক কক্ষ, গোপনীয়তা ও প্রশিক্ষিত নারী কর্মকর্তার উপস্থিতি থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, নারী পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের নেতৃত্বের অবস্থানে উন্নীত করতে হবে।সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সমাজের বাইরে নয়। তারা সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। তাই নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হলে পুলিশের মধ্যেও তা প্রতিফলিত হবে না। সরকার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করে এই পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের নারীবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু নারী ভুক্তভোগীদের জন্য নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।
প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙা যায় অথবা আস্থার সংস্কৃতি গড়া যায়? পরিবার থেকেই এই পরিবর্তন শুরু করতে হবে। শিশুদের পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে হবে। ‘পুলিশ তোমাকে ধরবে’ না বলে ‘পুলিশ তোমাকে সাহায্য করবে’, এই বার্তা দেওয়া জরুরি।
পুলিশের আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানায় একজন নারী গেলে তাকে সম্মান ও সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। যদি কোনো পুলিশ সদস্য অসদাচরণ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নেতিবাচক খবর নয়, ইতিবাচক উদাহরণও তুলে ধরা উচিত। এতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে পারে।
আসলে ভয় আর আস্থার মাঝখানে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার নাগরিকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় না পেয়ে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ সেই পথেই হাঁটছে। পরিবর্তন ধীরগতিতে হলেও হচ্ছে। আজকের শিশুটি যদি পুলিশকে ভয় না পেয়ে বন্ধুর মতো দেখে, তাহলে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ হবে আরও নিরাপদ, আরও মানবিক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে তার সরকার ‘কঠোর, কঠোর ও কঠোর’ হবে। দেশপ্রেমের প্রশ্নে যেমন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, তেমনি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ‘সবার আগে পুলিশ’ হতে হবে।
শেষ করছি একটি সিনেমার গল্প দিয়ে। ব্যর্থ প্রেমিককে পুলিশ বলছে, ‘চল থানায় চল।’ প্রেমিকের আকুতি, ‘আমি কিছুই করিনি, আমাকে ছেড়ে দেন।’ ছেড়ে দেওয়া তো দূরে থাক, তাকে টানতে টানতে পুলিশ ভ্যানে তুলছে আর বলছে, ‘কত দেবদাস দেখলাম, রিমান্ডে নিলেই ঠিক হয়ে যাবি।’ কিন্তু এ ক্ষেত্রে যদি দৃশ্যটা এমন হতো, পুলিশ বলছে, ‘আপনি মানসিক কষ্টে আছেন? বসুন, চা খান, আমরা আছি আপনার পাশে!’তাহলে হয়তো গল্পটাই বদলে যেত। এমন মানবিক আর বন্ধু পুলিশ কি অলীক স্বপ্নই থেকে যাবে?
লেখক
অধ্যাপক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
