বৃহস্পতিবার, মে ১৪, ২০২৬
33.5 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধএকুশের চেতনা ও ভাষা-অস্তিত্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

একুশের চেতনা ও ভাষা-অস্তিত্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

মোঃ আশরাফুল হোসেন
,

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষার সঙ্গে আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, চিন্তা ও অনুভূতির গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। বাঙালির কাছে বাংলা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ধারক। কবি রামনিধি গুপ্ত গভীর আক্ষেপের সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘নানান দেশের নানান ভাষা, বিনা স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা!’ আবার কবি অতুলপ্রসাদ সেনের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’ মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম মাতৃভাষাকে অবহেলা করার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছিলেন কঠোর সতর্কবার্তা। এসব কাব্যিক উচ্চারণে বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা, গর্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। ভাষা কেবল শব্দের বিন্যাস নয়। ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধ বহন করে। মানুষের চিন্তা গঠনের কাঠামোও ভাষার মাধ্যমেই নির্মিত হয়। তাই ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে জাতিসত্তার ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলা একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা। দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ ভাষা বর্তমান রূপ লাভ করেছে। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ। প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার বছর আগে রচিত চর্যাপদের ৫১টি পদ বাংলা ভাষার আদিরূপের সাক্ষ্য বহন করে। সে সময়কার শব্দরীতি ও অক্ষরবিন্যাস আজকের বাংলা থেকে ভিন্ন হলেও ভাষার মূল স্রোত সেখানে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য ও সুফি সাহিত্য বাংলা ভাষার ভাব ও প্রকাশভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তী সময়ে আধুনিক যুগে উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও কবিতার বিকাশের মাধ্যমে বাংলা একটি পরিপূর্ণ সাহিত্যভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ত্রিশ কোটির বেশি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। সাহিত্য, সংগীত, নাট্যচর্চা, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের বিকাশ বাংলা ভাষাকে বিশ্বপরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে পরিচিত করেছে। তবু এই মর্যাদা অর্জনের পথ সহজ ছিল না। বরং ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালিকে দিতে হয়েছে রক্তের মূল্য।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নয়, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। ভাষাগত বাস্তবতা ও গণ-ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ছিল মূলত রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল। এর বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বাঙালি সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর এই যৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, ধর্মঘট ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হতে থাকে।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা দেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। একই বক্তব্য তিনি ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পুনরায় উচ্চারণ করলে ছাত্রসমাজ সরাসরি ‘না’ ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানায়। এ সময় ভাষার প্রশ্নটি কেবল সাংস্কৃতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করলে পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আন্দোলন দমাতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিলে বের হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, অহিউল্লাহ ও জব্বারসহ আরো অনেকে। ভাষার জন্য প্রাণদানের এই ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে একুশের তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়| ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতারই চূড়ান্ত পরিণতি।

একুশ তাই কেবল ভাষার অধিকার নয়, এটি গণতন্ত্র, আত্মমর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। একুশ আমাদের শিখিয়েছে, আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আপস নেই।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর UNESCO একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হচ্ছে। এই স্বীকৃতির পেছনে প্রবাসী বাঙালিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কানাডাভিত্তিক সংগঠন ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভারস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর উদ্যোগে রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম জাতিসংঘে আবেদন করেন। বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমর্থনের ফলে ইউনেসকোর ৩১তম সাধারণ সম্মেলনে ১৮৮টি দেশের সর্বসম্মত সমর্থনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এই ঘোষণা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের সব মাতৃভাষাভাষীর জন্য একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল উদ্দেশ্য ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং বহুভাষিকতার গুরুত্ব তুলে ধরা। ইউনেসকোর মতে, পৃথিবীতে বহু ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়া মানে একটি জাতির ইতিহাস, জ্ঞান ও জীবনবোধের একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের গর্ব বাড়ালেও দায়িত্বও বাড়িয়েছে। বাংলা ভাষার চর্চা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আজ সময়ের দাবি। প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার বাড়াতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনুবাদ, পরিভাষা নির্মাণ, মানসম্পন্ন অভিধান প্রণয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা সফটওয়্যার উন্নয়ন ছাড়া ভাষার টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়।

একুশ আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগও দেয়। আমরা কি দৈনন্দিন জীবনে শুদ্ধ ও সচেতনভাবে বাংলা ব্যবহার করছি? নতুন প্রজন্মকে ভাষার ইতিহাস ও গুরুত্ব কতটা জানাতে পারছি? ভাষা বিকাশের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্পন্ন পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা ও সৃজনশীল চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাই একুশের শিক্ষা।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি আজ পৃথিবীব্যাপী অনুরণিত হচ্ছে। ভাষার জন্য আত্মদানের এই স্মৃতি আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাঙালি জাতির ইতিহাস বিশ্বমানবতার ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জন্য কেবল স্মরণের দিন নয়| এটি অঙ্গীকারের দিন| বাংলা ভাষাকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বযোগাযোগের উপযোগী করে তোলাই হোক আমাদের প্রত্যয়। একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষার উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে চলাই হোক আমাদের দায়বদ্ধত।

 লেখক
প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)
পরশুরাম সরকারি কলেজ, ফেনী।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ