২০২৫ সালের ৬ মে, মঙ্গলবার। নরসিংদীর জনবহুল শহর থেকে কিছুটা দূরে এক শান্ত গ্রাম—খিদিরপুর। সেদিন সন্ধ্যাবেলা ২০ বছর বয়সী আবির বাড়ি থেকে বের হয়। তার মা ভেবেছিলেন, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাচ্ছে। কিন্তু রাত গভীর হলেও আবির আর বাড়ি ফেরে না। তার ভাই রাতে একাধিকবার ফোন করেন, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। বাড়ির সবার মনে এক অজানা আশঙ্কার কালো মেঘ জমতে শুরু করে।
পরের দিন ৭ মে সেই কালো মেঘ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। গ্রামের শেষ প্রান্তে, খিদিরপুর টেকপাড়া জানের মুখ ব্রিজের কাছে একটি ডোবার পাশে পাওয়া যায় আবিরের নিথর দেহ। তার শরীর ক্ষতবিক্ষত, গলায় দড়ির গভীর দাগ। খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
তদন্তের সূত্রপাত ও প্রথম ক্লু
নরসিংদী থানা পুলিশ এবং পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। পিবিআই-এর চৌকস টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পিবিআই প্রথমেই বুঝতে পারে, এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়—এর পেছনে কোনো একটি যোগসূত্র আছে। আবিরের পরিচিতজনরা জানায়, আবির নিয়মিত মাদক সেবন করত এবং তার বেশ কিছু বন্ধুও নেশাগ্রস্ত ছিল। এই তথ্য থেকেই পিবিআই সন্দেহ করে, খুনের নেপথ্যে মাদকসংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকতে পারে।
তদন্তের প্রথম ধাপে পিবিআই-এর দল আবিরের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট সংগ্রহ করে। অবাক হয়ে তারা দেখতে পায়, আবিরের ফোনে কোনো সিম কার্ড ছিল না, কিন্তু মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টগুলো সক্রিয় ছিল। এই তথ্য পাওয়ার পর তারা ভাবতে শুরু করে—তাহলে আবিরের ফোনটি ব্যবহার করছে কে? এমন সন্দেহ দানা বাঁধে তাদের মনে।
রহস্যের নতুন মোড়
তদন্তে উঠে আসে ‘রেশমা’ নামে এক তরুণীর নাম, যিনি আবিরের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা একাধিকবার গোপনে দেখা করত। আবিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানায়, আবির একাধিকবার রেশমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। পুলিশ তখন রেশমাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে।
এদিকে ঘটে অন্য এক ঘটনা। আবিরের হত্যাকাণ্ডের পর আবিরের মোবাইলে ব্যবহৃত টেলিগ্রাম অ্যাপস থেকে রেশমাকে কেউ একজন ফোন দেয়। রেশমার মোবাইলে পাঠানো হয় আবিরের সঙ্গে তার সব অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও। একই সঙ্গে দেওয়া হয় হুমকি—“তোমার সম্মান বাঁচাতে চাইলে দশ হাজার টাকা পাঠাও, না হলে সব ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেব।” তখন রেশমা ভয় পেয়ে যায়। সে তার পরিবারের সদস্যদের টেলিগ্রামের এসব বার্তার কথা জানায়।
একপর্যায়ে পিবিআই নরসিংদীর টিম তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রেশমা ও আবিরের টেলিগ্রাম বার্তা উদ্ধার করে এবং কৌশলে রেশমা ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই, নরসিংদী অফিসে নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পিবিআই বুঝতে পারে—আবিরের ফোনে সিম না থাকা, রেশমার কাছে ছবি ও ভিডিও পাঠানো—এই সবকিছুর সঙ্গে আবিরের হত্যাকাণ্ডের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
আবারও পিবিআই-এর সামনে নানা প্রশ্ন ভেসে ওঠে। কেউ কি আবিরকে ফাঁদে ফেলেছিল? তদন্তকে ভিন্ন দিকে ঘোরানোর জন্যই কি ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটানো হয়? রেশমার কি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো যোগ আছে? কে তাকে হুমকি দিচ্ছে?
পিবিআই রেশমাকে আশ্বাস দেয় যে তারা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং হুমকিদাতার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার অভিনয় করতে বলে। এভাবেই রহস্য নতুন দিকে মোড় নেয়।
ধীরে ধীরে সেই ‘সম্পর্ক’ গভীর হয়। পুলিশের নির্দেশে রেশমা মেসেঞ্জারে লিখে পাঠায়—“এত টাকা আমার কাছে নেই। আমি তোমাদের সঙ্গে দেখা করে বাকি টাকা দেব।” ওপাশের লোকেরা ফাঁদে পা দেয়। তারা রেশমাকে একটি বিকাশ নম্বর পাঠায় এবং জানায়, আগে ওই নম্বরে কিছু টাকা পাঠাতে হবে, তারপর দেখা করার স্থান জানানো হবে। এই বিকাশ নম্বরটিই হয়ে ওঠে তদন্তের মূল সূত্র।
গ্রেপ্তার ও ভয়ংকর স্বীকারোক্তি
বিকাশ নম্বরের সূত্র ধরে পিবিআই দ্রুত তদন্ত এগিয়ে নেয়। তারা জানতে পারে, নম্বরটি হাবিবুর রহমান (২৪) নামের এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। হাবিবের অবস্থান শনাক্ত করে পিবিআই একটি অভিযান চালায়। ২০ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে হাবিব এবং তার বন্ধু কবির হোসেনকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। হাবিবের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় আবিরের সেই মোবাইল ফোন।
পরদিন ২১ মে হাবিবের আরেক বন্ধু আহম্মদ নাঈমকে (২৪) চাঁদপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হাবিব, কবির ও নাঈম যা জানায়, তা ছিল অসৎ সঙ্গের এক করুণ পরিণতির গল্প।
৬ মে সন্ধ্যাবেলা আবির মেসেঞ্জারে হাবিবকে ফোন করে জানতে চায় সে কোথায় আছে। হাবিব জানায়, তারা সবাই জানের মুখ ব্রিজের কাছে বসে নেশা করছে। আবির সেখানে পৌঁছানোর পর মাদক সেবন নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে হাবিব আবিরকে ঘুষি মারে। আবির প্রতিরোধের চেষ্টা করলে কবির ও নাঈম তাকে জাপটে ধরে।
এরপরের ঘটনা আরও ভয়াবহ। মাদক সেবনের ঘোরে তারা আবিরের গলায় গরু বাঁধার একটি দড়ি পেঁচিয়ে ধরে। প্রথমে হাবিব ও কবির, পরে নাঈম দুদিক থেকে দড়ি ধরে টানতে থাকে। আবিরের দম বন্ধ হয়ে আসে। মৃত্যু নিশ্চিত হলে তারা তার নিথর দেহ ডোবার পাশে ফেলে পালিয়ে যায়।
আবিরকে হত্যার পর তারা তার মোবাইল ফোন দিয়ে রেশমাকে ব্ল্যাকমেইল করার পরিকল্পনা করে। তারা ভেবেছিল, ধরা পড়বে না। কিন্তু সেই ভুল সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাদের ফাঁসিয়ে দেয়। হাবিব, কবির ও নাঈম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে। তাদের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে—মাদক ও অর্থের লোভে কীভাবে তারা একজন বন্ধুর জীবন কেড়ে নিতেও দ্বিধা করেনি।
লেখক
পুলিশ সুপার
পিবিআই
নরসিংদী জেলা
