মাহফুজুর রহমান
যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো তার পরিবহন ব্যবস্থা। সড়কপথের শৃঙ্খলা কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহজ করে না, বরং নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং জীবনকে গতিময় ও কর্মচঞ্চল করতে সাহায্য করে। জাপান বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ, যেখানে সড়ক দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ও পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণ। এর পেছনে কার্যকর ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাপানের প্রতিটি প্রিফেকচারে পৃথক ট্রাফিক ডিভিশন (কোতসু-কা) রয়েছে, যারা বিশেষভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি তাদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা বহুবার প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি।
জাপানের ট্রাফিক পুলিশকে যেমন দেখেছি—তারা শুধুই আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সহযোগী। তারা পথচারী ও যানবাহনের চলাচল সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। আবার তারা গ্রীষ্মকালীন উৎসব ‘নাতসু মাতসুরি’ উপলক্ষে তৈরি হওয়া ভিড়ের মধ্যে হাতের সংকেত, বাঁশি ও মাইক্রোফোন ব্যবহার করে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এতে শিশু ও বৃদ্ধসহ সবাই নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে।
একবার ভ্রমণের সময় আমাদের গাড়ি একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। বাংলাদেশে প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে ঝগড়া বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। কিন্তু জাপানে পুলিশ ঘটনাস্থলে দ্রুত এসে আহতদের হাসপাতালে পাঠায়, গাড়ির তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে অফিসিয়াল রিপোর্ট প্রস্তুত করে। এই পুরো সময়ে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এই ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পতিত যেকোনো একটি পক্ষকে পুলিশকে ফোন করে অবহিত করতে হয়। অথচ বাংলাদেশে অনেক সময় আমরা দেখি সবাই দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করছে। এমন দৃশ্য জাপানের ক্ষেত্রে অকল্পনীয়।
জাপানের ট্রাফিক আইন অত্যন্ত কঠোর। তবে পুলিশ ভদ্র ও শিক্ষণীয় আচরণ করে। একবার আমি অসাবধানতাবশত সিটবেল্ট না পরা অবস্থায় ছিলাম। পুলিশ ভদ্রভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল যে, এটি শুধু আইন ভঙ্গ নয়, বরং নিজের জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর বসন্ত ও শরৎকালে ‘ট্রাফিক সেফটি উইক’ পালন করা হয়। স্কুল, কমিউনিটি ও নাগরিক সংগঠন একসাথে সচেতনতা প্রচারণা চালায়, শিশুদের ট্রাফিক নিয়ম শেখায় এবং টেলিভিশন, রেডিও, পোস্টার ও ব্যানারের মাধ্যমে জনগণকে আইন মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করে। পুলিশ নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেও সচেতনতা বৃদ্ধি করে (যেমন বাসায় গিয়ে জানান যে, কোনো দুর্ঘটনা বা সমস্যায় দ্বিধা না করে পুলিশকে জানাতে হবে)।
জাপানের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও নিয়মতান্ত্রিক। এখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী লাল-হলুদ-সবুজ সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়। পথচারী সিগন্যালে সবুজ হাঁটার চিহ্ন ও লাল দাঁড়ানো চিহ্ন ব্যবহার করা হয় এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক জায়গায় পাখির ডাক বা সুরেলা শব্দের মাধ্যমে সংকেত দেওয়া হয়। কিছু সিগন্যালে কাউন্টডাউন টাইমার থাকে, যা দেখায় কত সেকেন্ড পরে আলো পরিবর্তিত হবে।
জাপানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সিগন্যালের কার্যকারিতা আরও বাড়িয়েছে। এসব সিগন্যালের সময়সূচি ট্রাফিকের প্রবাহ অনুযায়ী পরিবর্তিত হয় এবং রাতে সেন্সরভিত্তিক সিস্টেম গাড়ি শনাক্ত করে সিগন্যাল পরিবর্তন করে। বিশেষ সিগন্যালের মধ্যে সবুজ তীরচিহ্ন রয়েছে, যা মূল আলো লাল থাকলেও নিরাপদে মোড় নেওয়ার অনুমতি দেয়। হলুদ ঝলকানি সতর্কতার সঙ্গে চলার সংকেত দেয় এবং লাল ঝলকানি তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা নিরাপদ হওয়ার পর অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়। বৃহৎ শহরগুলোয় এই সিগন্যালগুলো ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের (আইটিএস) সাথে সংযুক্ত থাকে, যা যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
জাপানে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সড়কে পুলিশ সরাসরি নজরদারি করে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড ক্যামেরা ও রেড-লাইট ক্যামেরা ব্যবহার করে নিয়ম ভঙ্গ শনাক্ত করে। সামান্য গতিসীমা অতিক্রম, সিটবেল্ট না বাঁধা বা ভুল পার্কিংয়ের জন্য চালককে ‘নীল টিকিট’ দিয়ে জরিমানা করা হয়। গুরুতর অপরাধ যেমন মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, বেপরোয়া ড্রাইভিং বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ‘লাল টিকিট’ দেওয়া হয়, যেখানে আদালতে হাজিরার প্রয়োজন হয়। জাপানে পয়েন্ট সিস্টেম চালু আছে। প্রতিটি আইন ভঙ্গের ঘটনায় চালকের নামে পয়েন্ট যোগ হয়। এই পয়েন্ট নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। পার্কিং ভঙ্গের ক্ষেত্রে গাড়িতে স্টিকার লাগিয়ে পরে ডাকযোগে জরিমানার নোটিশ পাঠানো হয়। মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ব্যবহার করে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করা হয় এবং জরিমানা আরোপ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় ড্রাইভার ডেটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। ফলে প্রতিটি সতর্কতা বা জরিমানা সরাসরি লাইসেন্সে রেকর্ড হয়।
সাধারণ ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি জাপানে বিশেষায়িত ইউনিটও সক্রিয় থাকে। যেমন হাইওয়ে প্যাট্রল ইউনিট এক্সপ্রেসওয়ে ও হাইওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। শহরের ভিতরে সাইকেল ব্যবহারের জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ দল আছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো পুলিশকে সহায়তা করে (যেমন স্কুল এলাকার পাশে শিশুদের রাস্তা পারাপারে সহায়তা করা)। এই যৌথ উদ্যোগ সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যেহেতু আমি সাইকেলে বেশি চলাচল করি, তাই এই তদারকি আমি সরাসরি দেখেছি। একবার আমি সাইকেলের লেন দিয়েই যাচ্ছিলাম, কিন্তু গাড়ির লেনের বিপরীতমুখী। এক পুলিশ সদস্য আমাকে থামালেন এবং জানালেন, সাইকেল ও গাড়ি অবশ্যই একই একমুখী হয়ে চলতে হবে। আরেকদিন বৃষ্টির সময় আমি সাইকেলে ছাতা ব্যবহার করছিলাম। এটিও তারা আমাকে সতর্ক করে, কারণ এটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো জরিমানা না করলেও তারা ভদ্রভাবে সতর্ক করে দিল, যেন ভবিষ্যতে এমন আর না করি।
জাপানের এই পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলনা করলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে অনেক সময় আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হয় না। দুর্ঘটনার পরে বাদানুবাদ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব প্রবল। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সঙ্গে মানুষের তৈরি হওয়া দূরত্ব, পুলিশের প্রতি ভয় বা অনীহার কারণে আইন মেনে চলা অথবা পুলিশের কাজে সহযোগিতার অনভ্যাসও রয়েছে।
অনেক সময় দেখা যায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা আইন বা পুলিশের নির্দেশনা কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা না করে পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ নিজেই এক্ষেত্রে নিরুপায়। অন্যদিকে জাপানে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের তাৎক্ষণিক সাহায্য প্রদান করে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটিও তারা দায়িত্বশীলতার সাথে করে থাকে। সেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অনুরোধ বা প্রভাব আইন প্রয়োগে বাধা দিতে পারে না। সাধারণ জনগণও আইন ভঙ্গ করা বা আইনকে পাশ কাটিয়ে চলার কথা চিন্তাও করে না।
সর্বোপরি, জাপানের ট্রাফিক পুলিশ ও সিগন্যাল ব্যবস্থা কেবল আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং তারা নিরাপত্তা, জনসচেতনতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতীক। প্রযুক্তির ব্যবহার, পেশাদারিত্ব, কঠোর কিন্তু ভদ্র আচরণের মাধ্যমে তারা সড়ক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করে তুলেছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে যে, নাগরিকদের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে জাপানের ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ যদি জাপানের এই মডেল অনুসরণ করতে পারে, তবে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে এবং একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক
গবেষক
ইউনাইটেড এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি
কাগোশিমা, জাপান
