পুলিশের চাকরি জীবনে বহু বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছে। জীবনের এই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে প্রায়ই আমি থমকে যাই। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে বিভিন্ন সময়ে ভাগ করে নিয়েছি। কর্মজীবনের এই ভাণ্ডার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ঘটনা দিয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে। বর্তমানে আমি পিবিআই মানিকগঞ্জে কর্মরত, যা ঢাকার খুব কাছেই একটি জেলা। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আমাকে তাদের সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে সাহায্য করেছে।
মানিকগঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রা
পদ্মা নদীর তীরবর্তী এই অঞ্চলের মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা তুলনামূলকভাবে কম। যমুনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি ও কালীগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের মানুষগুলো যেন সরলতার প্রতিচ্ছবি। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার অনেক মানুষ বিভিন্ন সময় এই অঞ্চলের চরাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজ, ইটভাটা, নির্মাণশ্রমিক, ফল ও গরুর খামার, এবং গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। দিনমজুরের সংখ্যা এখানে বেশি।
এছাড়া, ভাসমান শ্রমজীবীরা ক্ষুদ্র ব্যবসা, যেমন—মৌসুমি ফল বিক্রি, শাক-সবজির খামারে কাজ, বা দুধ-মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এখানকার শিক্ষার হার মাত্র ৬৬%, যা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও কম। বৃহত্তর ঢাকার অংশ হওয়া সত্ত্বেও এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা আশানুরূপভাবে বিকশিত হয়নি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হীরালাল সেনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের জন্মস্থান হলেও, এটি সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অঞ্চলে পরিণত হতে পারেনি। ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ, ভাষাসৈনিক খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ বহু শিল্পী, অভিনেতা, লেখক ও রাজনীতিবিদ এই জেলার সন্তান।
এখানে কাজ করার সুবাদে এখানকার মানুষের নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। এখানকার মানুষ গান ভালোবাসে এবং সুরের জাদুতে মগ্ন। অবসরে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া তাদের নেশা, যেখানে তাদের মধ্যে এক ধরনের নির্বিকার ভাব দেখা যায়। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়—সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দেশে কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেয়ে প্রবাসজীবনের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি। বিভিন্ন উপায়ে কর্মসংস্থানের সন্ধানে তারা বিদেশে যাওয়ার জন্য ব্যাপক আগ্রহী। এমনকি প্রতারণার শিকার হয়েও তাদের এই আগ্রহ ও উৎসাহে কোনো ভাটা পড়ে না। জমিজমা বিক্রি করে টাকা হারিয়েও তারা নতুন করে ফাঁদে পা দেয়, এই ভেবে যে, “একবার ঠকেছি, এবার নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে।” এটাই এখানকার বাস্তবতা।
আইনের প্রয়োগ: পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মানিকগঞ্জ পিবিআই-এ প্রতারণার বিভিন্ন ধারায় মোট ১৮৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ আত্মসাতের, কিছু জমিজমা সংক্রান্ত এবং বাকিগুলো অন্যান্য বিষয়ের। এসব মামলার মধ্যে ৯০টি প্রমাণিত হয়েছে, ৭৩টি অপ্রমাণিত, ২১টি রিকল ও অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৩টি মুলতবি রয়েছে।
একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৫৭টি মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি প্রমাণিত, ১৯টি অপ্রমাণিত, ১০টি রিকল ও অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি, এবং ৯টি মুলতবি। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দায়ের করা মামলার অভিযোগের সাথে তদন্তের ফলাফলের অনেক সময় মিল পাওয়া যায় না এবং অনেক ক্ষেত্রে মামলা প্রমাণও করা যায় না। সহজ কথায় বলতে গেলে, উদ্দেশ্যমূলক বা প্রতারণামূলকভাবে মামলা দায়ের করার প্রবণতা এখানে লক্ষণীয়, যা মোটেও কাম্য নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কর্মজীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা পরিবার বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সাথে আলোচনা করতে দ্বিধা বোধ হয়। এই ধরনের ঘটনাগুলো এতই অবিশ্বাস্য মনে হয় যে সাধারণ মানুষ তা সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। সম্প্রতি এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছি, যা অন্যদের সচেতন করার জন্য তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করি।
মামলার নামে প্রহসন
ঘটনাটি ছিল এমন—একজন বাবা দাবি করলেন যে তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে, এ মর্মে তিনি চারজনকে আসামি করে কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(১)/৩০ ধারায় দায়ের করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্ত করার জন্য পিবিআই, মানিকগঞ্জকে নির্দেশ দেন।
মামলা পাওয়ার সাথে সাথেই পিবিআই-এর পুলিশ সুপার এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে একজন দক্ষ ও তৎপর জ্যেষ্ঠ পুলিশ পরিদর্শককে তদন্তের দায়িত্ব দেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শককে ডেকে মামলার বিষয়ে সরাসরি ব্রিফ করেন। এর পেছনে একটি কারণ ছিল। মামলাটি পিবিআই অফিসে আসার আগেই বাদীপক্ষের কেউ একজন ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, মামলাটি এখানে গৃহীত হয়েছে কি না। এর থেকে বোঝা যায় যে মামলা দায়ের করার পর থেকেই তারা এর ব্যাপারে কতটা সচেতন ও উদ্বিগ্ন ছিলেন।
সাধারণত এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কোর্ট পিটিশন মামলায়, বাদী মামলা দায়েরের ব্যাপারে যতটা আগ্রহী থাকে, পরে সাক্ষী হাজির করা বা তদন্তে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে ততটা উৎসাহ দেখায় না। এর একটি কারণ হলো, অনেক সময় মামলা দায়েরের পর বিবাদীপক্ষ নানা কৌশলে বাদীর সাথে সমঝোতা করে ফেলে। একবার সমঝোতা হয়ে গেলে বাদী তখন মামলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সঠিক তথ্য দেয় না। বাস্তব জীবনে এমন ঘটনা খুবই সাধারণ।
উল্লিখিত ঘটনায় দেখা যায়, বাদীপক্ষ একাধিকবার মামলাটি পিবিআই কার্যালয়ে এসেছে কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে থাকে। যার ফলস্বরূপ পুলিশ সুপার মামলাটি হাতে পেয়েই একজন জ্যেষ্ঠ পরিদর্শককে দায়িত্ব দেন এবং দ্রুত ভিকটিম উদ্ধারের পদক্ষেপ নিতে বলেন।
এরই মধ্যে ভিকটিমের মা পুলিশ সুপার, পিবিআই মানিকগঞ্জকে টেলিফোন করে তার মেয়ে অপহৃত হয়েছে এবং মামলা দায়েরের কথা জানান। তারা তাদের মেয়ের জন্য খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তখন পুলিশ সুপার ভিকটিমের মাকে পিবিআই কার্যালয়ে এসে সরাসরি বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করেন। জবাবে ভিকটিমের মা জানান যে ভিকটিমের বাবা সদরের একটি হাসপাতালে আছেন এবং তিনি দ্রুত পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করতে পারবেন। পুলিশ সুপার সম্মতি দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিকটিমের বাবা পিবিআই কার্যালয়ে হাজির হন।
প্রাথমিকভাবে তিনি খুব অস্থির ছিলেন। হাউমাউ করে কাঁদছিলেন এবং অসংলগ্ন কথা বলছিলেন। তাকে শান্ত হয়ে বসতে অনুরোধ করা হলো এবং সুস্থিরভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বলা হলো। তার কোনো ওষুধ লাগবে কি না বা অন্য কোনো কিছু প্রয়োজন আছে কি না, তাও জানতে চাওয়া হলো। তাকে স্থির হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হলো। এরপরও তিনি একই রকম অস্থিরতা নিয়ে অসংলগ্ন কথা বলতে থাকলেন।
তিনি বলছিলেন, তিনি জানেন না তার মেয়ে কোথায় আছে। আবার বলছেন, তিনি মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন এবং মারধরের শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তার মেয়ে কুষ্টিয়ায় কোথাও আছে এবং তিনি সেখানে মেয়েকে আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের হাত ধরে টানাটানি করার পরও সে আসতে চায়নি এবং যে বাড়িতে আটক আছে, সেখানকার লোকজনও মেয়েকে তার হাতে তুলে দেয়নি। এটাই ছিল তার মূল বক্তব্য।
তিনি অস্থিরভাবে কথা বলে যাচ্ছিলেন। মেয়ের মায়ের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি বাড়িতে সুস্থ আছেন। মেয়ের বাবার এই অবস্থা দেখে বলা হলো, “ঠিক আছে, আজ রাতেই অভিযান চালানো হবে। মেয়ের মা ও বাবা, আপনারা দুজনই তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তার টিমের সাথে থাকবেন।” তখন ভিকটিমের বাবা যেতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ভিকটিমের মাও যেতে পারবেন না এবং তিনিও অসুস্থ।
তখন তাকে বলা হয়, “ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নেই। একদিন পরেও যাওয়া যেতে পারে। বরং আপনি বাড়িতে যান, একটু বিশ্রাম নিন, ওষুধ খান। আপনি সুস্থ হলে এক-দুই দিনের মধ্যে আপনার মেয়েকে উদ্ধার করতে যাওয়া হবে।” এরপর ভিকটিমের বাবা অফিস ত্যাগ করে বাড়িতে চলে যান।
এর পরই ঘটল আরেক ঘটনা। এক অপরিচিত ব্যক্তি নিজেকে ভিকটিমের বাবার ভাই পরিচয় দিয়ে পুলিশ সুপারের সরকারি নম্বরে ফোন করেন। তিনি ভিকটিম সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি, কিন্তু বড় ভাই সম্পর্কে বলেন, তিনি পিবিআই অফিসে গিয়েছিলেন। তার সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়নি, মামলার কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং ভিকটিম উদ্ধারের জন্য কোনো আগ্রহ প্রকাশ করা হয়নি।
উল্টো ভিকটিমের বাবাকে নাকি গালাগাল করে বলা হয়েছে, “আপনি কেমন মেয়েকে জন্ম দিয়েছেন? দেখে রাখতে পারেন না? কোথায় যায়?” এমন কথাও নাকি তাকে শোনানো হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিজেকে ভিকটিমের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে পুলিশ সুপারকে এসব কথা জানান।
পুলিশ সুপার তো হতবাক হয়ে গেলেন। সব ঘটনা তো তার সামনেই ঘটেছে। তবে এসব কথা কোথা থেকে এলো? এটা কি একই মামলার ঘটনা, নাকি অন্য কোনো মামলার? তিনি আবার পরিদর্শককে ডেকে সব কিছু জানতে চাইলেন। পরিদর্শক বললেন, “না স্যার, আলাদা করে তেমন কোনো কথা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, আপনি বাড়িতে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিন, দুশ্চিন্তা করবেন না। আমরা তো আছি। ইনশাআল্লাহ, এক-দুই দিনের মধ্যে আপনার মেয়েকে উদ্ধার করে দেব। আপনি একটু সুস্থ হোন। আপনি টেনশন করলে আপনার শরীর খারাপ করবে।”
তখন পুলিশ সুপার যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, সেই নম্বরটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দিয়ে তার সাথে কথা বলতে বললেন। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা ফোন করলেও সে আর ফোন ধরল না।
একই দিন বিকেলে ভিকটিমের বাবার ছোট ভাই পরিচয়ে সেই ছেলেটি আবার পুলিশ সুপারকে ফোন করে। ভিকটিম উদ্ধারের জন্য অনুরোধ করে এবং বলে যে ভিকটিমের মা-বাবা দেখা করতে চান। পুলিশ সুপার তখন কিছুটা বিভ্রান্ত হন, এটা কি আবার নতুন কোনো ঘটনা, নাকি আগের ঘটনা? তখন মামলার নম্বর জানতে চাইলে একই মামলা নম্বর জানানো হয়। পুলিশ সুপার বুঝতে পারেন যে একই মামলা বিষয়ে কথা হচ্ছে।
এবারে নিজেকে ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভিকটিমের সেই আত্মীয় এমনভাবে কথা বলতে থাকে যে তারা বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান। তখন পুলিশ সুপার আবারও তাকে আশ্বস্ত করেন, ভিকটিমের বাবা এসে বিস্তারিত কথা বলে গেছেন এবং পিবিআই-এর তদন্তকারী কর্মকর্তা এই বিষয়ে তৎপর আছেন। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
তবুও স্বস্তি নেই। যেন এক ভৌতিক গল্প। বারবার ফোন আসছে আর একই মামলার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ধৈর্যের সাথে কথা বলছে। এমনটা হতেই পারে। যার মেয়ে, তার তো দুশ্চিন্তা হতেই পারে। এটাই স্বাভাবিক।
পুলিশের সরলতা ও ভালো ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে পরের দিন সেই একই ব্যক্তি মানিকগঞ্জের নারী ও শিশু আদালতের বিজ্ঞ বিচারকের কাছে অভিযোগ করেন যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাদীর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন এবং ভিকটিম উদ্ধারের কোনো চেষ্টা করছেন না। এই বিষয়ে পুলিশ সুপারকে জানানো হলে তিনি বিজ্ঞ বিচারককে সকল বিষয় অবহিত করেন এবং আশ্বস্ত করেন যে তিনি নিজে ভিকটিমের পিতা-মাতার সাথে কথা বলেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে ভিকটিম উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এর ঠিক পরের দিন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিমের বাবাকে অনুরোধ করেন অভিযান পরিচালনার সময় তার সাথে থাকার জন্য। কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হননি। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিমের মা পরিচয়ে বোরকা পরিহিত একজন নারী এবং ভিকটিমের বড় বোনের স্বামী পরিচয়ে একজনকে সাথে নিয়ে, মহিলা পুলিশসহ একটি দল নিয়ে অভিযানে বের হন।
ভিকটিমের বাবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কুষ্টিয়া জেলায় অভিযান চালিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। এরপর যথারীতি সকল কার্যক্রম যেমন—ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা এবং ২২ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ—সম্পন্ন করা হয়। ভিকটিমকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করার পর আদালত তাকে তার মায়ের হেফাজতে দেন। তদন্ত চলাকালে জানা যায়, ভিকটিম তার বাবা-মায়ের জিম্মায় রয়েছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহসহ মামলার বিস্তারিত তদন্ত করছিলেন। এরই মধ্যে ভিকটিমের বাবা নিজে এবং ভিকটিমের মাতাকে দিয়ে পুনরায় পুলিশ সুপারকে ফোন করান। এবার তাদের বক্তব্য ছিল, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের কথা শুনছেন না, মামলা সঠিকভাবে তদন্ত করছেন না এবং গাফিলতি করছেন।
পুলিশ সুপার তখন বুঝতে পারেন যে এই ঘটনার পেছনে আরও কিছু ঘটনা থাকতে পারে। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয় কেন বাদী বিভ্রান্তিকর কথা বলেছেন এবং মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, তা খুঁজে বের করার জন্য। পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে যেহেতু সব ঘটনা ঘটেছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে মামলাটি তদারকি ও খোঁজখবর নিচ্ছেন, তাই তিনি নিশ্চিত যে পিবিআই কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ বা তদন্তকাজে কোনো অবহেলা করেনি। বরং একজন অভিজ্ঞ পরিদর্শককে দিয়ে মামলাটি তদন্ত করানো হয়েছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
তদন্তকারী কর্মকর্তা ইতোমধ্যে কিছু ঘটনার খোঁজ পান। জানা যায়, ভিকটিমের বাবার নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসা বা কাজ নেই। এর আগে তারা সপরিবারে কুষ্টিয়ায় বসবাস করতেন। সেখানে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা ছিল না। তিনি মানুষের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে তা আর ফেরত দিতেন না। এই ধরনের প্রতারণা করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সংসার চালাতেন।
সেখানে বসবাসরত অবস্থায় তার প্রতিবেশী এক পরিবারের একটি ছেলের সাথে তার মেয়ের পরিচয় এবং সম্পর্ক হয়। পরবর্তীতে উভয় পরিবারের সম্মতিতে তাদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়। ভিকটিমের বাবামা উপস্থিত থেকে বিবাহ দেন এবং উভয় পরিবারের মধ্যে যাতায়াত ছিল।
ভিকটিমের বাবা ওই এলাকায় অনেক মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন—এই বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ তিনি তার মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকেও তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে দুই লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি কারও চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। এমনকি তিনি তার মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছিলেন, তা ফেরত দিতে না পারায় তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়।
কিছুদিন আগে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গেলে স্থানীয় লোকজন তার কাছে পাওনা টাকা দাবি করেন। তখন মেয়ের জামাইও তার টাকা পরিশোধ করতে বলে। তখন তিনি তার মেয়েকে সেখান থেকে জোর করে নিয়ে আসতে চান এবং ঝগড়া-বিবাদ করে এক পর্যায়ে মেয়েকে রেখেই চলে আসেন।
এরপর এই ভিকটিমের বাবা মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ে একটি বাসা ভাড়া নেন। মানিকগঞ্জকে ঘটনাস্থল সাজিয়ে মানিকগঞ্জ সদর কোর্টে গিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(১)/৩০ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ভিকটিমের মায়ের পরিচয়ে যিনি কথা বলেছেন, তিনিও নাকি ভিকটিমের সৎমা।
সন্তানের দুশ্চিন্তায় একজন বাবা যে কী নিখুঁত অভিনয় করতে পারেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর! একজন প্রতারক বাবা মিথ্যাচারের কত কৌশল অবলম্বন করতে পারেন, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এরই মধ্যে একদিন সেই প্রতারক বাবা ৯৯৯-এ কল করে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা দিয়ে বলেন যে সেখানে তার মেয়েকে নির্যাতন করে মারধর করা হচ্ছে। কুষ্টিয়া জেলার খোকসা থানা পুলিশ এই ফোন পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে ব্যক্তি ফোন করেছেন, তাকে আর পাওয়া যায়নি। থানা পুলিশ ওই ঠিকানায় গিয়েও ঘটনার সাথে কোনো মিল পায়নি। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ওই প্রতারক বাবার ফোন থেকেই থানা পুলিশকে কল করা হয়েছিল।
পিবিআই কর্তৃক মামলাটির তদন্ত চলমান রয়েছে। যদিও ওই ঘটনার পর থেকে বাদীপক্ষ তদন্তকাজে কোনো ধরনের সাহায্য বা সহযোগিতা করছে না। তাদের ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যে তারা ঠিকানা বদলের জন্য নতুন বাসা খুঁজছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে, তবে এর পেছনে আরেকটি ছায়া তদন্ত চলছে—কেন মেয়ের বাবা এত অভিনয় করলেন এবং মিথ্যা ঘটনা উল্লেখ করে মামলা দায়ের করলেন! তিনি আর কী কী করছেন এবং করবেন, তা নিয়ে।
সুযোগ পেলে পাঠককে নিশ্চয়ই এর পরবর্তী ঘটনাগুলো জানানো হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভালো থাকবেন এবং পুলিশ সদস্যদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: মামলা তদন্তের কাজে শতভাগ পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করবেন, তাহলে এমন অনেক অন্তরালের কাহিনী বেরিয়ে আসবে। সকল পুলিশ সদস্য সর্বদা মানবিক সেবাদানের জন্য নিবেদিত থাকবেন, এটিই প্রত্যাশা।
লেখক
পুলিশ সুপার
পিবিআই
মানিকগঞ্জ জেলা
