সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
30 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমশখের গোয়েন্দাবারকোডের লেখা, ওষুধের কৌটা: এক নিখুঁত হত্যার রহস্য

বারকোডের লেখা, ওষুধের কৌটা: এক নিখুঁত হত্যার রহস্য

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

সকালের শুরুটা ছিল অন্যদিনের মতোই। ঢাকার মালিবাগ ফ্লাইওভারের নিচে প্রতিদিনের মতোই অফিসগামী ভিড়, ব্যস্ত রাস্তা আর যানজট। হঠাৎ এক কালো সেডান গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাঝের আইল্যান্ডে ধাক্কা খায়। আশপাশের লোকজন ছুটে আসে, গাড়ির দরজা খুলে দেখে—চালক নড়ছে না।

তাঁর পরনে ডাক্তারের গাউন, গলায় ঝুলছে হাসপাতালের আইডি কার্ড—নাম লেখা “ডা. আরিফ হায়দার”। পুলিশ এসে গাড়িটি পরীক্ষা করে দেখে, এয়ারব্যাগ খোলা, আর স্টিয়ারিং হুইলের চাপায় বুকের ওপর গভীর দাগ। সবকিছু দেখে মনে হলো, এটা হয়তো একেবারে স্বাভাবিক সড়ক দুর্ঘটনা।

দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হলো এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলো। কিন্তু কয়েকদিন পর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসতেই ঘটনাটির মোড় পুরোপুরি বদলে গেল।

রিপোর্টে দেখা গেল, ডা. আরিফের রক্তে অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘুমের ওষুধ—এক ধরনের শক্তিশালী সেডেটিভ—পাওয়া গেছে। এই ওষুধ সাধারণত অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে গভীর অচেতন অবস্থায় নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি কোনো সাধারণ নেশাদ্রব্য নয়; শরীরে গেলে মানুষ দ্রুত অচেতন হয়ে পড়ে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। অর্থাৎ, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ডা. আরিফ সম্ভবত অচেতন ছিলেন।

এই তথ্যের পর তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় পিবিআই-এর হাতে।

পিবিআই তদন্ত শুরু করে। শুরুতেই হাসপাতালের ওষুধের ইনভেন্টরি বা হিসাবব্যবস্থা পরীক্ষা করে। রেকর্ড থেকে জানা যায়, এই ধরনের ওষুধ ছোট কাচের বোতলে সংরক্ষিত থাকে, প্রতিটি বোতলে থাকে বারকোড, এবং ব্যবহার হলে সিস্টেমে রেকর্ড হয়—তারিখ, সময়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার বা নার্সের নামসহ।

কিন্তু তদন্তে দেখা গেল, একটি নির্দিষ্ট ওষুধের বোতলের কোনো রেকর্ড নেই। সেটি সিস্টেম থেকে “অদৃশ্য”। হাসপাতালের কেনাকাটার নথি বা স্টক রেজিস্টারেও সেই বোতলের কোনো চিহ্ন নেই। মনে হলো, কেউ ইচ্ছে করেই তথ্য মুছে দিয়েছে।

ব্যাকএন্ড লগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে বোতলটি চেকআউট করা হয়েছিল, সেটি ডা. আরিফের নিজের আইডি। এতে স্পষ্ট হয়—যারা এই ওষুধ সরিয়েছে বা তথ্য গায়েব করেছে, তারা কোনো না কোনোভাবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। প্রশ্ন উঠল, তাহলে কি হাসপাতালের ভেতরের কেউ? নাকি ডা. আরিফেরই কাছের কেউ তাঁর আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছে?

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ময়নাতদন্তের সময় আরও কিছু তথ্য পান। মৃতদেহের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতির প্রমাণ পাওয়া যায়—যা ইঙ্গিত দেয়, দুর্ঘটনার আগেই শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ফুসফুসে পাওয়া যায় “অ্যাসপিরেশন”-এর চিহ্ন, যা থেকে বোঝা যায়, তিনি হয়তো অচেতন অবস্থায় কিছু পান করেছিলেন—অথবা তাঁকে কেউ পান করিয়েছিল।

তরল পদার্থটি ভুলপথে ফুসফুসে ঢুকে গিয়ে শ্বাসরোধের কারণ হয়। সবকিছু মিলিয়ে তদন্তকারীরা ধারণা করেন, এটি ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত খুন, আর গাড়ির ধাক্কা ছিল কেবল হত্যাকে “দুর্ঘটনা” হিসেবে দেখানোর জন্য ব্যবহৃত উপায়।

এরপর শুরু হয় ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন। ডা. আরিফের মোবাইল পরীক্ষা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনার আগে তিনি সহকর্মী ডা. লিশার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। তাঁর বাসার গৃহকর্মীও সেই সময় ফোন করেছিল। যদিও কথার বিষয়বস্তু অজানা, তদন্তকারীরা সন্দেহ করতে শুরু করেন—ডা. লিশার এই ঘটনার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র আছে কি না।

তবে অন্য সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না—সম্ভবত কোনো রোগীর জরুরি আপডেট নিয়েই কথা হচ্ছিল। পুলিশ ডা. লিশার সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই সময়ই ঘটল আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা। ডা. আরিফের সহকারী খালেদ—যিনি তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলেন—তাকে পাওয়া গেল মৃত অবস্থায়, হাসপাতালেরই এক কক্ষে। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে দেখে, খালেদের গলায় তার পেঁচানো অবস্থায় রয়েছে।

তবে তাঁর রক্তেও পাওয়া গেল সেই একই ঘুমের ওষুধের চিহ্ন। ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়। পুলিশ এবার ওষুধ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে, পাশাপাশি ডা. লিশাকেও হাজির করা হয়।

ডা. হাসান জানান, ডা. লিশা ও ডা. আরিফের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল—যা হাসপাতালের অনেকেই জানতেন। ডা. লিশা আবার ছিলেন ডা. জামানের স্ত্রী, এবং কিছুদিন আগেই তাঁদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। বিষয়টি এত দূর গড়ায় যে তাঁরা বিচ্ছেদের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় ডা. লিশা স্বীকার করেন যে ডা. আরিফের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল, তবে ঘটনার দিন তাঁদের ফোনালাপ ছিল কেবল এক রোগীর সংকটজনিত বিষয়ে।

তিনি জানান, স্বামী ডা. জামানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেক আগেই খারাপ হয়েছিল, এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর স্বামী ডা. আরিফের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।

এরপর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয় ডা. জামান। পুলিশ তাঁর খোঁজে ছুটে যায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে, যেখানে তিনি চেম্বার করতেন। কিন্তু পৌঁছে জানা যায়, পুলিশের আগমন টের পেয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন। শুরু হয় তল্লাশি অভিযান।

এদিকে তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজে নতুন এক সূত্র পান—ডা. আরিফের শরীরে পাওয়া ওষুধটি হাসপাতালের ইনভেন্টরি থেকে যে কক্ষে তোলা হয়েছিল, সেখানে নিহত সহকারী খালেদকে দেখা যায়। অথচ ওই কক্ষে কেবল ডাক্তাররাই তাঁদের নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করতে পারেন।

অর্থাৎ, খালেদ হয়তো ডা. আরিফের আইডি ব্যবহার করে ওষুধটি নিয়েছিল। কিন্তু তারপর তাকেও সেই একই ওষুধ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়। তাহলে কি কেউ খালেদকে ব্যবহার করে এই কাজগুলো করিয়েছিল? আর কেনই বা খালেদ তাঁর নিজ বসকে হত্যা করতে যাবে?

তদন্তকারীরা এরপর হাসপাতালের পেছনের পার্কিং লটের ফুটেজ বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, দুর্ঘটনার আগে গাড়িটি সেখানে প্রায় দুই মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড থেমেছিল। ওই সময় গাড়ির পাশে কালো জ্যাকেট পরা দুইজন পুরুষকে দেখা যায়।

একজনের হাঁটার ভঙ্গি খালেদের সঙ্গে মিলে যায়, কিন্তু অন্যজন কে—তা স্পষ্ট নয়। খালেদকে ক্যামেরার সামনে দেখা গেলেও অন্যজনকে আড়ালেই রাখা হয়েছে। এটি কি কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পিত ফাঁদ?

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, সেই সময় ডা. জামান ও ডা. লিশা কেউই হাসপাতালে ছিলেন না। তাহলে কি তাঁদের অনুপস্থিতি ইচ্ছাকৃত? নাকি পুরো ঘটনাটাই একযোগে পরিকল্পিত?

তদন্ত দল সময়রেখা মিলিয়ে দেখে—ওষুধ প্রয়োগের সময়, গাড়ি হাসপাতাল ছাড়ার সময় এবং দুর্ঘটনার সময়ের মধ্যে ব্যবধান খুবই অল্প। যদি ওষুধ আগেই খাওয়ানো হয়ে থাকে, তবে তিনি গাড়ি চালানোর সময়ই প্রভাবিত ছিলেন। আর যদি ওষুধটি হাসপাতাল ছাড়ার ঠিক আগে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই দুই মিনিট ত্রিশ সেকেন্ডের বিরতিই ঘটনার মূল সূত্র হতে পারে।

সব প্রমাণ একত্র করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—এটি শুধুমাত্র দুর্ঘটনা নয়। রক্তে পাওয়া সেডেটিভ, নিখোঁজ ভায়াল, উদ্ধার বোতল, পার্কিংয়ে থেমে থাকা গাড়ি, এবং হাসপাতালের ফুটেজ—সবকিছু মিলে ঘটনাটি এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দিকেই ইঙ্গিত করে।

এটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে দেখতে দুর্ঘটনা মনে হয়, কিন্তু আসলে এটি চিকিৎসাজগতের ভেতরের এক জটিল ষড়যন্ত্র।

বর্তমানে পিবিআই তদন্তকারীরা পুরো সময়রেখা পুনর্গঠন করছেন—ড্রাগ কখন দেওয়া হয়েছিল, গাড়ি কখন চলেছিল, এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ কী। পুলিশের হাতে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসার বাকি।

তবে ডিজিটাল লগ, পাসওয়ার্ড ব্যবহার, এবং সংশ্লিষ্ট চরিত্রদের কার্যকলাপ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একাধিক ব্যক্তির পরিকল্পনার ফল হতে পারে।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ