বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
28 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমবাহিনীর কথাডিএমপিআইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ ও অংশীজনদের করণীয়

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ ও অংশীজনদের করণীয়

মোঃ শরিফুল ইসলাম 
,

আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, সমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। এটি কেবল একটি ধারণাই নয়, বরং একটি আদর্শ, যা সভ্য সমাজের বিকাশে অপরিহার্য। আইনের শাসন বলতে কেবল আইনের উপস্থিতি বোঝায় না, বরং আইনের প্রয়োগে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও বোঝায়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং সকলের জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। এই ধারণাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বারা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এর শর্তাবলি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে নিরন্তর আলোচনা হয়েছে।

আইনের শাসন কী?

আইন কোনো অস্ত্র নয়, বরং একটি আশ্রয়—এটিই আইনের শাসনের মৌলিক ধারণা। এখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সকলেই আইনের অধীন। এই চিন্তা আজকের নয়। এই চিন্তার সূচনা সেই প্রাচীন গ্রিসেই। দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘মানুষ নয়, আইন শাসন করুক।’ এই কথাটি যেন আজও প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতিতে। সপ্তদশ শতকে জন লক বলেছিলেন, মানুষ জন্মসূত্রেই তিনটি অধিকার নিয়ে আসে—জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পদ। এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর তাই রাষ্ট্র নিজেও আইনের অধীন। এই দর্শনকেই কাঠামোগত রূপ দিয়েছিলেন এভি ডাইসি, যিনি বলেছিলেন যে, আইনের শাসনের তিনটি মূল ভিত্তি হলো আইনের সর্বোচ্চতা, আইনের সামনেসমতা ও সাধারণ আইনের প্রাধান্য। এই বিন্যাসই আইনভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের মূল দিকনির্দেশনা।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামো

জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ আইনের শাসনের আদর্শে বিশ্বাসী। ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে। ২৬, ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৩ অনুচ্ছেদ নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং আইনের সামনে সমতার নিশ্চয়তা দেয়। একইভাবে ৯৪(৪), ১১৬ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা একটি কার্যকর আইনের শাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।

এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের আদালতগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৮৯ সালের একটি মামলায় (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম রাষ্ট্র) সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেন যে, আইনের শাসন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সংসদীয় ক্ষমতায়ও পরিবর্তনযোগ্য নয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালের আরেকটি মামলার রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই নীতিকে আরো সুসংহত করা হয়।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় চ্যালেঞ্জ

তবে সংবিধানে যতই সুন্দরভাবে আইনের শাসনের কথা লেখা থাকুক না কেন, বাস্তব চিত্রে আমরা এখনো বহু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বিচার প্রক্রিয়ার বিলম্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এসবই আইনের শাসনের ভিত্তিকে বারবার দুর্বল করে দিচ্ছে। এমনকি আইন প্রণয়নকারী ও প্রয়োগকারীদের অনেকেই কখনো কখনো নিজেরাই আইনের ব্যত্যয় ঘটান, যার ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।

একদিকে দেখা যায়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধীরা রেহাই পেয়ে যায়। অন্যদিকে নিরীহ ও দরিদ্র জনগণ বিচারিক সেবার ব্যয়বহুলতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে বিচারের প্রতিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বিচার বিলম্ব ও সুবিচার লাভের অনিশ্চয়তা সমাজে এক প্রকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা কালচার অব ইমপিউনিটি সৃষ্টি করে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ

এই বাস্তবতায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা শুধুমাত্র আইন প্রয়োগই করে না, বরং আইনের শাসনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়। নাগরিক জীবনে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে আসে পুলিশই। তারা যদি নিরপেক্ষ ও মানবিক পদ্ধতিতে কাজ করে, তবে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়। আবার যদি পুলিশ হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতিয়ার, তবে সেটি আইনের শাসন নয়, বরং আইনকে শোষণের যন্ত্রে পরিণত করে।

তাই বাংলাদেশে পুলিশের কাঠামোগত সংস্কার, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত এবং জনমুখী ও মানবিক পুলিশিং অত্যন্ত জরুরি। পুলিশে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করা যেতে পারে।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মানবাধিকার, আইনি প্রক্রিয়া, নৈতিকতা ও জনসম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের গুরুত্ব এখানে অপরিসীম। কারণ এটি স্থানীয় জনগণের সাথে পুলিশের পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত ব্যবস্থাকে কার্যকর করে দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পুলিশি কাজে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং তাদের আর্থিক কার্যক্রমের নিয়মিত নিরীক্ষা করতে হবে, যেন দুর্নীতির সুযোগ কমে।

অপরদিকে, সাইবার অপরাধসহ আধুনিক অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত সরঞ্জাম, ফরেনসিক প্রযুক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তদন্তের মান উন্নত করা যায়।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কেবল পুলিশের কাজ নয়। এর সাথে সম্পর্কিত রয়েছে বিচার বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক সমাজ। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের মানুষ যদি ন্যায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করে, তাহলে কোনো শক্তিই দীর্ঘদিন অন্যায়কে টিকিয়ে রাখতে পারে না।

মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা যখন আইনের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়, তখনই সমাজে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত হয়। তাই প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই? যদি চাই, তবে প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা, দায়বদ্ধ পুলিশ প্রশাসন এবং সর্বোপরি সচেতন ও সংবেদনশীল নাগরিক সমাজ।

সবশেষে বলা যায়, আইনের শাসন একটি রাষ্ট্রের প্রাণ। এটি কেবল শাসনব্যবস্থার অংশ নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি মূল্যবোধ, যা জাতিকে সভ্যতা, শান্তি ও উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর সেই পথ নির্মাণে পুলিশসহ রাষ্ট্রের সকল অংশীজনের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক
প্রভাষক
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ