যেখানেই সংঘাত, সেখানেই ছুটে চলেন একদল নির্ভীক মানুষ মাথায় তাদের নীল হেলমেট। দেশ, জাতি বা পরিচয়ের ভেদাভেদ ভুলে তারা এগিয়ে যান একটিমাত্র লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বশান্তির অভীষ্ট পথে।বলছি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর কথা। ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে এই সংখ্যায় থাকছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সূচনা কাহিনী শান্তিরক্ষা মিশনের বিবর্তন সেখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে ক্লান্ত বিশ্ব যখন বুঝতে পারল, শুধু যুদ্ধ জয় করার ক্ষমতা নয়, বরং যুদ্ধ ঠেকানোর সক্ষমতাই টিকে থাকার শর্ত, তখনই বিশ্বনেতারা ভাবতে শুরু করেন একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে
এমন একটি সংস্থা হবে, যার কাজ হবে যুদ্ধ উস্কে দেওয়া নয়, বরং নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুদ্ধ থামানো, সংলাপ ও আপসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো।
১৯৪৫ সালে সেই ঐতিহাসিক ধারণা ও অঙ্গীকার থেকেই জন্ম নেয় জাতিসংঘ (United Nation)। এটি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে গড়ে ওঠে ‘নীল হেলমেট’ পরিহিত শান্তিরক্ষী বাহিনী, যেখানে সংঘাত, অশান্তি, গৃহযুদ্ধ, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা—সেখানেই তাদের পদচারণা।
শুরুতে শান্তিরক্ষীদের দায়িত্ব ছিল সীমিত—যুদ্ধবিরতির তত্ত্বাবধান, পর্যবেক্ষণ ও নিরপেক্ষ উপস্থিতি বজায় রাখা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংঘাতের চরিত্র বদলেছে, জটিলতা বেড়েছে, সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে শান্তিরক্ষা মিশনও তার প্রাথমিক কাঠামো পেরিয়ে আরও বিস্তৃত ও গভীরতর ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
সামরিক বাহিনী সাধারণত কোনো বিরোধপূর্ণ এলাকায় প্রাথমিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কাজটি করে। যেমন—বাফার জোন স্থাপন, অস্ত্রবিরতি তদারকি এবং বড় ধরনের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ। তবে একটি সংঘাতপরবর্তী সমাজে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল সামরিক উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হয় আইন-শৃঙ্খলা ও বেসামরিক সুরক্ষার, এবং এই ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ বাহিনী জাতিসংঘ পুলিশ (UNPOL) ম্যান্ডেট নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করে, অপরাধ দমন করে, ফৌজদারি তদন্তে বিশেষ দক্ষতা প্রয়োগ করে এবং স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াটি একটি দেশের আইনশাসিত সমাজকে পুনর্গঠিত করার ভিত্তি তৈরি করে।
তাছাড়া সামরিক বাহিনীর চেয়ে পুলিশ স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সহজে আস্থা ও ভরসার সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, যা সংঘাতের মূল কারণগুলো মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সুসংহত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে সুপরিচিত। সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীও ১৯৮৯ সালে নামিবিয়ায় প্রথম মিশনের মাধ্যমে এই গৌরবময় যাত্রায় শামিল হয়। বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ পুলিশের ২১ হাজারের বেশি সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা বর্তমানে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (MONUSCO), দক্ষিণ সুদান (UNMISS), মালিসহ (MINUSNA) একাধিক মিশনে ফরমড পুলিশ ইউনিট (FPU) ও ইনডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসার (IPO) হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের এই অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যাগত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুণগত দিক থেকেও তারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত। বিশেষ করে নারী পুলিশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ গোটা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে। ২০১০ সালে মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম পুলিশের নারী কন্টিনজেন্ট পাঠায়। এই নারী শান্তিরক্ষীরা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, লৈঙ্গিক সমতার বিষয়ে জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্য পূরণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তাদের পেশাদারিত্ব এবং শৃঙ্খলার জন্য একাধিক মিশনে তারা বিশেষ সম্মান ও পদক লাভ করেছেন। বিশ্বমানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ২৪ জন অকুতোভয় সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, যা বিশ্বশান্তির প্রতি বাংলাদেশের গভীর অঙ্গীকারের প্রতীক।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সমন্বিত প্রয়াস বিশ্বকে এক স্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা ও বেসামরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এবং একটি শান্তিপ্রিয় জাতির প্রতিনিধিত্ব করছে।তাদের এই নিরন্তর আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
