বাবা এখনও বাসায় ফেরেননি। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছে। এর অর্থ হলো মা রান্নাঘরে কাজ করছেন। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ।কয়েকদিন পর পরীক্ষা। বই-খাতা নিয়ে পড়ায় মন দেয় রাশেদ।হঠাৎ দরজায় ধুপধাপ শব্দ হতে শুরু করে। রাশেদ টের পায়, মা দৌড়ে যাচ্ছেন দরজা খুলতে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে শুনতে পায় বাবার হুংকার আর চপেটাঘাতের শব্দ—‘এত দেরি হয় কেন দরজা খুলতে?’
বুলেটের মতো ছুটে আসা বাবার অশ্রাব্য গালাগালির মধ্যে মা মিনমিন করে কী জবাব দিলেন, রাশেদ তা শুনতে পায় না। একটু পর মা-বাবার শোবার ঘর থেকে আবার ধুপধাপ আওয়াজ। সঙ্গে মায়ের চাপা কান্নার শব্দ। এমন পরিবেশে কি পড়াশোনা করা যায়? পড়ার টেবিল থেকে উঠে রাশেদ ঘরসংলগ্ন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন একই ঘটনা দেখতে তার আর ভালো লাগে না। অন্ধকার অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে—
‘আমাদের জীবনটা এমন কেন?’উত্তর কোথায় পাওয়া যাবে, তা রাশেদ জানে না।সকালে নাস্তার টেবিলে আরেক দফা শুরু হলো। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাবা মুখটা বিকৃত করে ফেললেন। তারপর গরম চা ছুড়ে মারলেন মায়ের দিকে। ‘আহ!’ বলে চিৎকার দিয়েই মা মুখ বন্ধ করে ফেললেন। রাশেদের দিকে একবার তাকিয়ে, হাত ডলতে ডলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাবাও অফিসে চলে গেলেন।বাসা থেকে বেরিয়ে আজ আর স্কুলে যেতে ইচ্ছা হলো না রাশেদের। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল, রেলস্টেশনের পেছনের দিকে যেখানে কিছু পরিত্যক্ত ওয়াগন রাখা আছে, সেখানে চলে এসেছে ও। হঠাৎ নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে রাশেদ। তাকিয়ে দেখে, একটি বগির ভেতর থেকে সহপাঠী নিজাম তাকে ডাকছে।
বগির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে যায় রাশেদ। পুরো বগি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, কেমন বিশ্রী গন্ধ।
নিজাম ওর হাত ধরে টেনে ভেতরে বসায়। তারপর একটা জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে বলে— ‘জোরে টান দে। তোর চেহারাই বলছে তোর মন ভালো নাই। এটা টানলে তোর মন ভালো হয়ে যাবে।’এক মুহূর্ত ইতস্তত করে রাশেদ জোরে একটা টান দেয়। মাথাটা ঘুরে ওঠে সাথে সাথে , সেইসঙ্গে কাশির দমক। তারপরও জেদ করে আরও কয়েকটা টান দেয়। একটু পর মাথা ও মন দুটোই বেশ হালকা লাগে। কষ্টগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কষ্ট ভোলার এত সহজ উপায় পেয়ে এটাকেই আঁকড়ে ধরে রাশেদ।
এখন মায়ের ব্যাগ কিংবা বাবার মানিব্যাগ থেকে মাঝে মাঝে টাকা চুরি করে স্কুল পালিয়ে পরিত্যক্ত বগিতে বসে গাঁজা খাওয়াই রাশেদের প্রিয় কাজ। একটি শিক্ষিত, সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও কিশোর রাশেদ অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে গেল।
এর জন্য দায়ী কে?
পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যখন নিয়ামক
সমাজে দেখা যায় রাশেদের মতো আরও অনেক শিশু-কিশোর নানারকম অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশের অসংখ্য শিশু-কিশোর বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এখন প্রশ্ন হলো, এসব কাজ তারা কীভাবে শেখে?
একটি শিশু কি অপরাধী হয়েই জন্ম নেয়, নাকি সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক প্রভাবে অপরাধী হয়ে ওঠে?
এই প্রশ্নের জবাবে মনোবিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত।
প্রখ্যাত মনসমীক্ষণবিদ ফ্রয়েডের মতে, শিশু জন্মগতভাবেই স্বার্থপর। আত্মতৃপ্তির জন্য তারা যেকোনো কিছু করতে পারে। অন্যের কথা একটুও ভাবে না।অন্যদিকে অস্তিত্ববাদীদের মতে, প্রতিটি মানুষই ভালো হয়ে জন্মায়। কিন্তু সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপ তাকে ক্রমশ অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। অস্বীকার করার উপায় নেই বংশগতি ও পরিবেশ, এই দুয়ের মিথস্ক্রিয়ার ফল হলো মানুষ। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ ও শিক্ষিত পরিবারে জন্ম নেওয়া একটি শিশু যদি অপরাধমূলক পরিবেশে বড় হয়, তবে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
একইভাবে অপরাধী বাবা-মায়ের সন্তানকে যদি সুস্থ, স্বাভাবিক ও চাপমুক্ত পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি
একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার। এখান থেকেই সে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, নৈতিক-অনৈতিক ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে সংঘাতময় সম্পর্ক থাকে—সেই পরিবারের শিশুরা সাধারণত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এর ফলে তাদের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, আক্রমণাত্মক মনোভাব, বাইরের জগৎ সম্পর্কে অনীহা ও বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। এই নেতিবাচক মনোভাবই অনেক সময় তাদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের দিকে ঠেলে দেয়।
এ ছাড়া সাধারণত শিশুরা বাবা-মাকে তাদের রোল মডেল হিসেবে দেখে। অপরাধপ্রবণ বা মানসিকভাবে অসুস্থ বাবা-মা সন্তানকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন না। সেই অভাবেও শিশুরা পথভ্রষ্ট হতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে বড় হওয়া বাচ্চাদের তুলনায় ডিভোর্সি পরিবারের বাচ্চারা কম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়।
বন্ধুবান্ধব বা সঙ্গী-সাথিরাও অনেক সময় এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে নেশা করা, মিলেমিশে চুরি বা ছিনতাই করা, অহেতুক মারামারিতে জড়িয়ে পড়া,এসবই অসৎ বন্ধুর সংস্পর্শের ফল। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা বা কুশিক্ষাও শিশু-কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রবৃত্ত করে।
প্রতিকার
এবার আসা যাক, এর প্রতিকার কীভাবে হতে পারে সে বিষয়ে।
প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে পরিবারকে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেন সে তার জীবনের সমস্যাগুলো খোলামেলাভাবে শেয়ার করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, একটি সুস্থ ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে সন্তান বাবা-মাকে রোল মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কারা তাদের বন্ধু,এগুলোর খোঁজখবর বাবা-মাকেই রাখতে হবে, যেন অসৎ সঙ্গের কারণে কোনো সর্বনাশ না ঘটে। সন্তানদের ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়,এই বিষয়গুলোয় নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, যদি কোনো শিশু অপরাধমূলক আচরণ করে ফেলে, তবে সরাসরি শাস্তি না দিয়ে তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মানসিক সমস্যা থাকলে মনোবিজ্ঞানী বা পারিবারিক থেরাপির সাহায্য নিতে হবে। এছাড়া সন্তানের অনলাইন কার্যক্রমের দিকেও নজর রাখতে হবে, যেন তারা অনিরাপদ বা অপরাধোদ্দীপক কার্যক্রমে জড়িয়ে না পড়ে।
শিশু-কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালনা করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। অমনোযোগী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকরা যেমন সহায়তা করতে পারেন, তেমনি সঠিক বন্ধু-বান্ধব নির্বাচনেও তারা দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, বিদ্যালয়ে অত্যধিক কঠোর শৃঙ্খলার কারণে যেন শিশুরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে বিপথে না যায়। পরিবার ও বিদ্যালয় উভয়েরই উচিত ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করা, যেন শিশু-কিশোরেরা সৎ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মানবিক জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হয়।
লেখক
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জেনে রাখা ভালো
| সোশ্যাল কন্ট্রোল থিওরি বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব অনুযায়ী (ট্রাভিস হির্শি, ১৯৬৯), মানুষ তখনই অপরাধ বা সমাজবিরোধী আচরণ থেকে বিরত থাকে, যখন তার সঙ্গে সমাজের দৃঢ় সম্পর্ক বা বন্ধন থাকে। পরিবার, বিদ্যালয়, বন্ধু ও সমাজ— সব মিলিয়ে এই বন্ধন একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করে, যা মানুষকে নিয়ম ও নৈতিকতার মধ্যে রাখে। কিন্তু যখন এই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিশুর মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জন্ম নিতে শুরু করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, সামাজিক বন্ধন যত শক্তিশালী, অপরাধপ্রবণতা তত কম। পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, বন্ধুমহল ও বৃহত্তর সমাজ— এসবের সমন্বয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হয়, যা মানুষকে সামাজিক নিয়ম, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গণ্ডির মধ্যে রাখে। যখন এই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়, তখনই ব্যক্তির মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জন্ম নেয় এবং সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। এই তত্ত্ব চারটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এটাচমেন্ট,কমিটমেন্ট,ইনভলভমেন্ট ও বিলিফ।
এটাচমেন্ট বা আবেগীয় বন্ধন হলো সন্তানের সঙ্গে পরিবারের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। যখন পারিবারিক কলহ বা নির্যাতনের কারণে এই আবেগীয় সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিশুর ভেতর থেকে নিরাপত্তা ও সহানুভূতি হারিয়ে যায় এবং মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কমিটমেন্ট বা অঙ্গীকার বোঝায় জীবনের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতি দৃঢ় সংকল্প ও বিনিয়োগ|একজন ব্যক্তি যদি পড়ালেখা বা ক্যারিয়ারে প্রচুর সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে, তবে সে এমন কোনো কাজ (যেমন অপরাধ) করতে চাইবে না, যা সেই বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। পরিবারে অশান্তি ও অবহেলার ফলে শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদাসীনতা তৈরি হয়। ইনভলভমেন্ট বা সম্পৃক্ততা বলতে বোঝায় সমাজের ইতিবাচক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। যখন পরিবার একজন শিশুকে সঠিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতে পারে না, তখন সে সময় ব্যয় করে অসৎ বন্ধুর সঙ্গে। এর মাধ্যমে সে অবৈধ কাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বিলিফ বা বিশ্বাস বলতে বোঝায় সমাজের আইন ও নৈতিক নিয়মের বৈধতার প্রতি ব্যক্তির আস্থা। পরিবার ও সামাজিক পরিবেশে নিয়ম, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীলতার চর্চা থাকলে শিশু আইন মানাকে নৈতিক কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে; বিপরীতে ঘরে নিয়মভঙ্গ ও সহিংসতা স্বাভাবিক হলে এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। |
