শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬
31 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধরাজারবাগের সেই ভয়াল রাত:মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ স্মরণে

রাজারবাগের সেই ভয়াল রাত:মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ স্মরণে

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, বিকাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় বিরাজ করছিল এক অস্বাভাবিক নীরবতা। সবার মাঝেই চলছিল চাপা উত্তেজনা, রক্তের উৎকণ্ঠা আর এক অনিশ্চিত বাস্তবতা। এতদিনের মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদমুখর ঢাকা যেন হঠাৎ থমকে গেছে। আতঙ্কের কালো ছায়া শহরের ওপর ভর করে বসেছে।শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল নানান খবর—ক্যান্টনমেন্টগুলোতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৎপরতা ও যুদ্ধের প্রস্তুতির আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। সারি সারি সাঁজোয়া যান, সৈন্যবহর—সব মিলিয়ে যেন পুরোদমে যুদ্ধের আয়োজন। একদিকে নিরীহ মানুষ, অন্যদিকে নিজেদের করের টাকায় লালিত সেই সেনাবাহিনী যেন জনতার ওপর তাদের নিষ্ঠুর লেলিহান শানাতে মরিয়া।বিভিন্ন সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করে ফেলা হয়েছিল। শহরের নানা অংশে টহল জোরদার করা হয়। এই রকম উৎকণ্ঠার বাতাস রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সেও এসে পৌঁছায়।তারাও তো এ দেশের মানুষেরই অংশ। তারাও প্রত্যক্ষ করেছে কীভাবে এই দেশকে, এই দেশের মানুষকে শাসনের নামে শোষণ করেছে কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী। ছাত্র-জনতা, এমনকি নিরীহ মানুষও সেদিন শোষণের বিরুদ্ধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে সংগ্রামের দৃপ্ত শপথ নিয়েছিল।পুলিশ সদস্যদের হাতে ট্যাংক, মর্টার বা অটোমেটিক গানের মতো অস্ত্র ছিল না; কিন্তু তাদের বুকে ছিল বিশ্বাস, স্বাধীনতা লাভের দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।তাই সেদিন, সবার আগে তারাই সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে এই দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধের বিরুদ্ধে। মুক্তিকামী জনতার পক্ষ থেকে প্রথম হুংকার তোলে এই পুলিশ বাহিনী।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। এই উপলক্ষে ডিটেকটিভ ম্যাগাজিনে থাকছে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের স্মরণে একটি বিশেষ নিবন্ধ।

সতর্কবার্তা আর প্রস্তুতির শুরু

দুপুর গড়াতেই পুলিশের সোর্সগুলো থেকে একের পর এক খবর আসতে থাকে রাজারবাগে। শহর থমথমে, মিরপুর-তেজগাঁও এলাকার অবাঙালি শ্রমিকদের অস্বাভাবিক তৎপরতা, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অস্বাভাবিক মুভমেন্ট—সবকিছু মিলিয়ে এক অজানা অস্থিরতা।বিকাল থেকে কন্ট্রোল রুম থেকে শহরের সর্বত্র প্যাট্রোল টিম পাঠানো হয়। টহল টিমগুলো ওয়্যারলেস সেটে বারবার জানাচ্ছিল—“শহর আতঙ্কগ্রস্ত, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।”রাত গড়াতেই আরও স্পষ্ট হতে থাকে বিষয়টি। কেউ কেউ সরাসরি বলে দেয়—রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আজ রাতে আক্রমণ হতে পারে। বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তখন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ শুরু করেন—“যদি আক্রমণের শিকার হই, তাহলে কী করব?”এক পর্যায়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় টহলে থাকা একটি দল বেতারে জানায়—যুদ্ধসাজে সাজানো ট্রাকে করে সেনাবাহিনীর একটি বড় কনভয় শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে আরেকটি রিপোর্ট আসে—তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিপুলসংখ্যক সাঁজোয়া যান অবস্থান নিয়েছে।একের পর এক এসব তথ্য রাজারবাগে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আর কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে এই দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই যুদ্ধ দুই দেশের মধ্যে নয়; বরং দেশের নিরীহ মানুষের সঙ্গে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর যুদ্ধ।

প্রতিরোধের প্রস্তুতি

রাত বাড়তে থাকল। পুলিশ লাইন্সে তখনও কোনো উচ্চপদস্থ বাঙালি কর্মকর্তা নেই, কিন্তু এতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলো না।হঠাৎ একসময় বেজে উঠল রাজারবাগের সেই বিখ্যাত ‘পাগলা ঘণ্টি’। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত সদস্যদের সতর্ক ও একত্র করতে তৎকালীন আইজিপির দেহরক্ষী কনস্টেবল আব্দুল আলী অস্ত্রাগারের ‘পাগলা ঘণ্টি’ বাজিয়ে সংকেত দেন।ব্যারাক থেকে, ক্যান্টিন থেকে, ডিউটি পোস্ট থেকে পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে একত্র হতে লাগলেন। কাউকে তখন আলাদা করে ডাকার দরকার হয়নি—ঘণ্টির শব্দই ছিল নির্দেশ, আহ্বান আর সতর্কবার্তা—সবকিছু একসাথে।অস্ত্রাগারের মূল চাবি সহজে মেলেনি। তাই অপেক্ষা না করে ভেঙে ফেলা হলো তালা। থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, গুলি—যা আছে সব বের করে ভাগ করে দেওয়া হলো। আরেকদিকে, পুলিশের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আরেকটি অস্ত্রাগার থেকেও অস্ত্র-গোলাবারুদ বের করে নেওয়া হয়।সেই রাতেই নামিয়ে ফেলা হয় পাকিস্তানের পতাকা। উঠিয়ে দেওয়া হয় লাল-সবুজের মানচিত্রখচিত পতাকা-যে দেশের অস্তিত্ব তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি, কিন্তু স্বাধীনতার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ইতোমধ্যেই বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে গেছে।একদল পুলিশ সদস্য অবস্থান নেয় রাজারবাগের চারতলা ভবনের ছাদে, কেউ যায় চামেলীবাগ-শান্তিনগর-বেইলি রোডের দিকের উঁচু ভবনে, আবার কেউ যায় মালিবাগ, মগবাজার, পাক মোটর (বর্তমান বাংলামটর) পর্যন্ত।কেউই তখন ভাবছে না, তারা ট্যাংক আর মর্টারের বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকতে পারবে; তারা শুধু ভেবেছিল—প্রতিরোধ শুরু করতেই হবে।

প্রথম গুলির শব্দ: সশস্ত্র প্রতিরোধের শুরু

রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। চামেলীবাগের দিকে পুলিশের বানানো ব্যারিকেডের সামনে এসে থামে পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম সামরিক যান। রাস্তা ফাঁকা করার চেষ্টা করতেই ওপরে প্রস্তুত বাঙালি পুলিশের হাতে থাকা থ্রি-নট-থ্রি থেকে ফায়ার করা হয়।চারদিকের সুনসান নীরবতা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে প্রথম গুলির শব্দে।ধরা হয়, এই বাংলার কোটি মানুষের ওপর চলা শোষণের প্রতিবাদে সশস্ত্র সংগ্রামের শুরুটাই ছিল এই গুলি। একই সঙ্গে এটি জানান দেয়—যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সূচনা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সেদিনের সংগ্রামী প্রতিরোধের মাধ্যমে।পাকিস্তানি সৈন্য ঢলে পড়ে, আরও কয়েকজন আহত হয়। এই আকস্মিক আক্রমণে কিছুক্ষণ থমকে যায় আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী। কিন্তু খুব দ্রুতই তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে—এসএলআর, হেভি মেশিনগান, মর্টার, এরপর ট্যাংক।বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে যায়, রাজারবাগ ডুবে যায় অন্ধকারে। আশপাশের ব্যারাক, ভবন, ক্যান্টিনে আগুন লেগে যায় মুহুর্মুহু গোলার আঘাতে। আকাশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে।গুলির শব্দে, বিস্ফোরণের ধাক্কায়, আগুনের আলো-অন্ধকারে রাজারবাগ মুহূর্তের মধ্যেই এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ওয়্যারলেসের মাইকে উচ্চারিত সেই বার্তা

অন্ধকারের মধ্যে একটি ঘরে তখনও জ্বলছে আলো—ওয়্যারলেস স্টেশন। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বার্তা নিয়ে অপেক্ষমাণ বাঙালি সদস্য কনস্টেবল মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া।

তার ভেতরে কাজ করছে চাপা উত্তেজনা। তিনি বুঝতে পারছেন, বাইরে তারই সহকর্মীরা রাইফেল নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ করছে। কিন্তু সেই প্রতিরোধ হতে হবে সম্মিলিতভাবে।

তাই তিনি সেই সংগ্রামের কথা জানিয়ে দিতে চান সমগ্র দেশে। যে প্রতিরোধের অগ্নিশিখা জ্বলছে রাজারবাগে, তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে যাক দেশের আনাচে-কানাচে।

তিনি ওয়্যারলেস মাইকে তার হাতে লেখা ইংরেজি বার্তাটি পড়েন

‘‘Base for all stations from East
Pakistan Police.I repeat, base for all stations
from East Pakistan Police.
Keep listening, watch.
We are already (being) attacked
by the Pak Army.
Try to save yourself. Over’’

ওয়্যারলেস বার্তা সম্প্রচারের মুহূর্ত

ওয়্যারলেস বার্তা সম্প্রচারের এই সময় রাজারবাগ ওয়্যারলেস বেজ স্টেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী উপ-পরিদর্শক ইয়াছিন আলী তরফদার, আরএস মুসলিম আলী শরীফ এবং কনস্টেবল মনির হোসেন, মতিউর রহমান (মতিন), আব্দুল লতিফ ও সোহরাব হোসেনসহ আরও কয়েকজন বাঙালি পুলিশ সদস্য।এই বার্তাই সে রাতে ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের সব জেলা-উপজেলার থানায়, পুলিশ লাইন্সে। রাজারবাগে চলা প্রতিরোধের কথা শুধু ঢাকাতেই নয়, ছড়িয়ে যায় পুরো দেশে—এমনকি দেশ ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বেও খবর পৌঁছে যায়।অনেকেই পরে বলেছেন—সে রাতে এই বার্তাই তাদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে; আর ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

তিন ঘণ্টার অসম যুদ্ধ

পাকিস্তানি সেনারা ফ্লেয়ার ছুড়ে ছাদ ও উঁচু স্থানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ট্যাংক প্যারেড গ্রাউন্ডে ঢুকে পড়ে এবং মর্টার ও কামানের গোলাবর্ষণে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ব্যারাকগুলো একের পর এক কেঁপে ওঠে।

প্যারামিলিটারি রেসপন্স ফোর্স (পিআরএফ)-এর ব্যারাকগুলোতে আগুন ধরে যায়। চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনে এলাকা অন্ধকার হয়ে পড়ে।সেনাবাহিনীর এই প্রবল আক্রমণের মাঝেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ চালিয়ে যান। কেউ পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলে গেরিলা কৌশলে পাল্টা গুলিবর্ষণ করেন, কেউ ছাদ ও নির্ধারিত অবস্থান থেকেই শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই চালান।একই সময়ে একটি দল অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে মালিবাগ-চামেলীবাগ প্রান্ত দিয়ে এলাকা ত্যাগ করে, যাতে পরবর্তী দিনগুলোতে এসব অস্ত্র সীমান্তবর্তী প্রশিক্ষণ শিবির ও সম্মুখসমরে ব্যবহার করা যায়।

রাত দেড়টা পেরিয়ে দুইটা, আড়াইটার পরও সংঘর্ষ থেমে থেমে চলতে থাকে। একদিকে ট্যাংক, মর্টার ও হেভি মেশিনগানের প্রচণ্ড আক্রমণ, অন্যদিকে সীমিত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও স্বল্প গোলাবারুদ নিয়ে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধ—এক অসম লড়াই, তবুও চলছে বীরদর্পে।ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।সারা রাতের সংঘর্ষে বহু পুলিশ সদস্য শহীদ হন, অনেকে আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। ভোরের দিকে পাকিস্তানি সেনারা প্রায় দেড়শ বাঙালি পুলিশ সদস্যকে বন্দি করে এবং এরপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন, অপমান ও অমানবিক আচরণ।যেসব পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই শহীদ হন, তাঁদের অনেকের মরদেহ পরবর্তী সময়ে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই রাতের সুনির্দিষ্ট শহীদের সংখ্যা কোনো দিনই নির্ধারণ করা যায়নি।বিভিন্ন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও পরবর্তী গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, ২৫ মার্চের সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অন্তত দেড়শ বাঙালি পুলিশ সদস্য শহীদ হন; তবে প্রকৃত সংখ্যা যে আরও বেশি ছিল, সে বিষয়ে কারোই সন্দেহ নেই।

রাজারবাগ থেকে সীমান্ত—যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়া

সব পুলিশ সদস্য সেই রাতে আটক হননি। কেউ কেউ পরিস্থিতির আলোকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সঙ্গে নিয়ে রাজারবাগ ত্যাগ করেন—শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, লড়াইকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার থেকেই।পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেন, যেখানে সাধারণ মানুষকে অস্ত্রচালনা ও যুদ্ধকৌশলের প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে প্রস্তুত করা হয়।রাজারবাগে ব্যবহৃত সেই থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও গোলাবারুদ পরে সীমান্তের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে শুরু করে সম্মুখসমরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত হয়। এভাবেই রাজারবাগের সেই রাতের অস্ত্র ও প্রতিরোধ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।এই অর্থে, ২৫ মার্চের রাজারবাগ কেবল প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ক্ষেত্র নয়; সেখান থেকেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের কার্যকর সূচনা ঘটে।

স্মৃতির ধারক: পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যাতে বিস্মৃত না হয়, সেজন্য রাজারবাগ স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই গড়ে উঠেছে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।এখানে ঢুকলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে দুর্লভ সব আলোকচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের বই-সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। সংরক্ষিত আছে সেদিনের থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, শহীদ পুলিশ সদস্যদের পোশাক, চশমা, টুপি, যুদ্ধকালীন হ্যান্ডমাইক, সার্চ লাইট, পুরোনো টেলিকম ভবনের ঘড়ি, চিঠিপত্র—অসংখ্য স্মৃতি।একটি ছোট কাচের ভেতরে রাখা পুরোনো রাইফেল হয়তো আজ আর ব্যবহারযোগ্য নয়, কিন্তু যারা জানে সেদিন ভোর পর্যন্ত ঠিক এই ধরনের অস্ত্র হাতে রেখেই বাঙালি পুলিশ সদস্যরা ট্যাংক আর কামানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের কাছে এটা শুধু ধাতব বস্তু নয়; এটি এক জাতির প্রতিরোধের প্রতীক।

যে স্মৃতি আমরা ভুলতে পারি না

আমাদের কাছে পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে নানা ধরনের কথা, অভিযোগ, বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের ন্যূনতম ন্যায়বোধ দাবি করে—আমরা যেন কখনও ভুলে না যাই, স্বাধীনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের দিনটিতে এই বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাই নিজের জীবন বাজি রেখে, প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় এক শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।তারা জানতেন, হয়তো বাঁচবেন না। তবু পিছু হটার পথ বেছে নেননি। কেউ বন্দি হয়েছেন, কেউ নির্যাতিত হয়েছেন, কেউ আত্মগোপনে চলে গিয়ে আবার অস্ত্র হাতে ফিরেছেন। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে কেউ বেঁচে ফিরেছেন, কেউ আর কখনো ফেরেননি।২৫ মার্চের রাজারবাগ শুধু অতীতের একটি যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয় না; বরং মনে করিয়ে দেয়—এই দেশের একজন কনস্টেবল কীভাবে দেশপ্রেম ও দেশরক্ষার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কামান আর মর্টারের সামনে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে যায়।যতদিন এই দেশ, এই পতাকা, এই সংবিধান থাকবে—রাজারবাগের সেই রাতে নাম না-জানা অসংখ্য পুলিশ সদস্যের পদচিহ্ন, চিৎকার, গুলির শব্দ আর আগুনের আলো-অন্ধকার আমাদের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসবে।তাদের জন্যই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তাদের জন্যই আজও রাজারবাগের আঙিনায় মাথা উঁচু করে উড়তে পারে লাল-সবুজের পতাকা।

তথ্যসূত্র

এই অংশের তথ্যসংকলন করা হয়েছে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে সংঘটিত ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সমকালীন সংবাদ প্রতিবেদন(bdnews24.com, The Daily Star,Jagonews24) এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (৯ম খণ্ড) ও পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রকাশিত নথির ভিত্তিতে।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ