মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর অকুতোভয় বীর সদস্যরা। দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী সেই বীর শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর মিরপুর পুলিশ কমপ্লেক্সের মধ্যে তিন একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ’।
পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য উন্নতমানের শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০০০ সালে মাত্র ৩৪৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কলেজটি। সময়ের পরিক্রমায় একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আজ এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং সারাদেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা চর্চার এক উজ্জ্বল বাতিঘরে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এখানে বালিকা শিক্ষার্থীদের জন্য মর্নিং শিফট এবং বালক শিক্ষার্থীদের জন্য ডে শিফটে পাঠদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয়। এর বাইরে সরকারি, বেসরকারি বা অন্য কোনো খাত থেকে আর্থিক সহায়তা না পেলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছলতা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ৬ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন, সুসজ্জিত অডিটোরিয়াম, ব্যবহারিক ল্যাব, পাঠাগার, লিফট, ১৫০ কেভিএ নিজস্ব জেনারেটর, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, শিক্ষার্থী পরিবহনের সুবিধা, ক্যান্টিন এবং খেলাধুলার জন্য বিশাল মাঠসহ আরও অনেক সুবিধা।
শুরু থেকেই সম্মানিত ইন্সপেক্টর জেনারেল মহোদয়গণসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং দেশসেরা মেধাবী শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অল্প সময়ে সুনামের সারথি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পার্শ্ববর্তী নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেছনে ফেলে বিগত প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তিতে থানায় প্রথম স্থান অর্জনসহ এসএসসি পরীক্ষা ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে যথাক্রমে ১৬তম ও ১১তম স্থান অর্জনের সাফল্য দেখিয়েছে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ।
একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কো-কারিকুলার কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটির সফলতা ঈর্ষণীয়। তাছাড়া অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের চাহিদার প্রেক্ষিতে ইংলিশ ভার্সন চালুর মাইলফলকও অর্জিত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমায় সাফল্যের এ পর্যায়ে এসে সম্মানিত ইন্সপেক্টর জেনারেল মহোদয় গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর কলেজজুড়ে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে ইতিবাচকতায় সমৃদ্ধ স্কুল-কলেজ পরিচালনায় দক্ষ কনসালট্যান্ট মহোদয়ের উদ্দীপনাময় চিন্তা-চেতনা ও পদক্ষেপ পুলিশ কলেজকে নতুন স্বপ্নে যেভাবে উদ্দীপ্ত করেছে, তাতে প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই সারা দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কাতারে পৌঁছাবে—এ প্রত্যাশা সবার।
সবমিলে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক সাফল্যকে অল্প সময়ের এক দীর্ঘ উপাখ্যান বলাই সমীচীন।এ প্রতিষ্ঠান পুলিশ বাহিনীর গর্ব ও অহংকার। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী সকল শহীদ পুলিশ সদস্য, যাঁদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও ভালোবাসায় স্বপ্ন থেকে বাস্তব রূপে পরিণত হয়েছে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, ও তাঁরা প্রাতঃস্মরণীয়।
লেখক:
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
অ্যাডমিন ও ফাইন্যান্স অফিসার,শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ
