বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
28 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

রোহিঙ্গাদের বিয়ে

রহিমা আকতার
,

“রোহিঙ্গা” মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এক বাস্তুচ্যুত মুসলিম গোষ্ঠী, যারা বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া ছাড়াও দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া সত্ত্বেও তারা ধরে রেখেছে তাদের সংস্কৃতি ও স্বকীয় পরিচয়। সেই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের বিবাহ প্রথা—যা রোহিঙ্গা সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের ধারক। এই প্রবন্ধে রোহিঙ্গাদের বিবাহ-সংক্রান্ত রীতি-নীতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিয়ে শুধুই দুটি প্রাণের মিলন নয়, বরং এটি পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিরও এক আত্মিক বন্ধন। বিবাহ শুধুমাত্র একটি চুক্তি নয়; বরং এটি একসঙ্গে স্বপ্ন গাঁথার, পথচলার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বীজ বপনের এক শুভসূত্রপাত। পৃথিবীজুড়ে বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা ও উপলব্ধি বিভিন্ন হলেও, মানুষের আবেগ ও অনুভূতির ভাষা চিরকাল এক ও অভিন্ন। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিয়ের রীতিনীতি আমাদের চেনা ধারার চেয়ে কিছুটা পৃথক, আবার সংগ্রাম, বেদনা ও টিকে থাকার গল্প দিয়েও সমৃদ্ধ।

পশ্চিম মায়ানমারের ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের বিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মে পরিচালিত হয়, যেখানে পরিবার ও ঘটকের ভূমিকা মুখ্য। এখানে ছেলে ও মেয়ে সরাসরি একে-অপরকে জানার সুযোগ তেমন থাকে না; পরিবারের সম্মতি ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে চলে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের প্রক্রিয়া। বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই আয়োজন হয় ‘বউজোড়া’ বা এনগেজমেন্টের। এই আয়োজনে মেয়ের বাড়িতে ছেলের পক্ষকে উৎসবমুখর পরিবেশে আপ্যায়ন করা হয়। ছেলের পরিবার মেয়েকে স্বর্ণালংকার বা অন্যান্য উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করে। আর সেই মুহূর্তে বিয়ের মোহরানার পরিমাণ নির্ধারিত হয়, যার আংশিক অংশ বিয়ের দিনই মেয়েপক্ষকে দিয়ে দিতে হয়।

রোহিঙ্গা সংস্কৃতিতে বিয়েকে ঘিরে মোহরানার পাশাপাশি যৌতুকের চলও পরিলক্ষিত হয়, যদিও ইসলাম ধর্মে যৌতুক নিষিদ্ধ। বিশেষত বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর মানবিক সংকট আর অনিশ্চয়তার কারণে যৌতুকের প্রচলন ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের পরিস্থিতিতে ৭৯% বিয়েতে যৌতুক দেওয়া হয়, যার অংশ হিসেবে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, কাপড়চোপড় বা ফোন–মোটরসাইকেলের মতো সামগ্রী প্রদান করা হয়।

অনেকে মনে করেন, এই প্রথা শুধু পরিবারকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে না, বরং মেয়েদের জন্য সামাজিক ও মানসিক চাপও সৃষ্টি করে। তবে আশার বিষয় হলো, বর্তমানে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা ও সরকারি উদ্যোগে ক্যাম্পে সচেতনতা বৃদ্ধি করে যৌতুক রোধের চেষ্টা চলছে।

বিয়ের তারিখ মূলত এনগেজমেন্টের দিনই নির্ধারণ করা হয় এবং সাধারণত শুক্রবার কিংবা আরবি মাসের কোনো শুভক্ষণকে বেছে নেওয়া হয়। বিয়ের কয়েক দিন আগে থেকেই পুরো গ্রামে বা ক্যাম্পে উৎসবময় আমেজ ছড়িয়ে পড়ে; আয়োজন হয় গানের আসর ও নানা রকম খাবারের। বিয়ের দিন ছেলের পক্ষ দুপুরে মেয়ের বাড়ি পৌঁছায়, ডগর বাজিয়ে ও আনন্দঘন পরিবেশে। রাতের নামাজের পর ইমাম এসে ইসলামী নিয়মে ‘নিকাহ’ সম্পন্ন করেন। এরপর কনে মুখ কালো কাপড়ে আবৃত করে, আত্মীয়-স্বজনের কাঁধে চড়ে বা যানবাহনে চেপে পাত্রের গৃহে গমন করেন।

আধুনিক সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতি, সামাজিক অনুশাসন কিংবা সীমিত সম্পদের কারণে আগের তুলনায় বিয়ের আয়োজন অনেক অনাড়ম্বর হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্যাম্পের চৌকিতে বা ছোট ঘরে কাপড় দিয়ে সাজিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়; স্বামী-স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন জীবনের স্বপ্ন। বিয়ের সাত দিন পর নববধূর পরিবার-স্বজনেরা তার শ্বশুরবাড়িতে আমন্ত্রিত হন; তখন নববধূকে কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়ি নিয়ে আসা হয় এবং পরে আবার শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়—এভাবেই দুই পরিবারের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।

রোহিঙ্গারা তাদের নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়েছে; তারা সম্মুখীন হয়েছে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, স্বজন হারানোর বেদনা এবং বাস্তুহীন জীবনের নির্মম বাস্তবতার। তবুও তারা এখনও আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাদের সংস্কৃতি ও রীতিনীতিকে।

রোহিঙ্গা বিবাহ শুধুমাত্র একটি সামাজিক বা ধর্মীয় রীতি নয়—এটি একটি মানবিক প্রতিরোধের প্রতিফলন, যেখানে ভালোবাসা, দায়িত্ব, স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম এক অবিনাশী মিথস্ক্রিয়ায় মিলিত হয়। অনিশ্চিত, দুঃসহ এই পরিবেশেও, যেখানে প্রতিদিন টিকে থাকাই এক বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে একটি বিয়ের গল্প হয়ে ওঠে অন্ধকারে এক টুকরো আলো—সংহতি, সংস্কৃতি ও মানবতার এক প্রতীক, যা আশার দৃষ্টান্ত হয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়।

বউজোড়ার কয়েক দিন পর ছেলের পরিবারের নারী সদস্যদের মেয়ের বাড়িতে যাওয়া রোহিঙ্গা বিয়ের এক অনুষঙ্গ, যা তাদের সামাজিক পারস্পরিক সম্পর্ককে জোরদার করে। এই পরিদর্শনে মেয়েকে আপ্যায়ন করে তাদের সম্মান প্রদর্শন করা হয়। যদিও মেয়ের প্রতি পছন্দের ক্ষেত্রে ছেলের পরিবার সন্তুষ্ট নাও হতে পারে, তবুও বিয়ে বাতিল করার কোনো সুযোগ থাকে না। পাত্র যদি ইচ্ছে প্রকাশ করে মেয়েকে নিজে দেখতে চান, তবে তাকে বন্ধু-বান্ধবসহ যেতে হয়। যদিও এই সময় বন্ধুরা তার সঙ্গে থাকে, কিন্তু মেয়েকে শুধুমাত্র পাত্রই দেখতে পায়, বন্ধুরা নয়। এ দিনের একটি বিশেষ দায়িত্ব হলো ছেলেকে মেয়েপক্ষ থেকে উপহার প্রদান করা, যা রীতিনীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বউজোড়ার প্রথম দিনে যদি পাত্র মেয়েকে পছন্দ না করেন, তাহলে এনগেজমেন্ট বা বউজোড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। এ অবস্থায় ছেলেপক্ষ অনেক সময় কৌশলে বড় ধরনের যৌতুক দাবি করে বা এমন কোনো ত্রুটি উপস্থাপন করে, যা সহজে পূরণযোগ্য নয়—ফলে এনগেজমেন্ট এড়িয়ে চলা হয়। তবে বউজোড়া হওয়ার পর যদি পাত্রপক্ষ অসম্মত হয়, তাহলে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব আপ্যায়ন ও খরচ হয়েছে, তা ছেলেপক্ষকে পরিশোধ করতে হয়। এর ব্যতিক্রম ঘটলে বা পাশাপাশি সম্মানহানির আশঙ্কা দেখা দিলে মেয়ের পরিবার আইনের আশ্রয় নেয়। এক্ষেত্রে তাদের অভিযোগ দায়ের করা হয় মূলত মহল্লার মাঝিদের নিকট। এসব প্রচলিত নিয়ম ও বিধান রোহিঙ্গাদের মাঝে সামাজিক নিয়ম-কানুন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

বিয়ের দিন নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, তবে নির্ধারিত কোনো বিশেষ পোশাকের বাধ্যবাধকতা থাকে না। প্রথাগতভাবে বর নতুন ও দামি লুঙ্গি, শার্ট ও টুপি পরিধান করে, আর কনে সাধারণত বাচিক লুঙ্গি, বাজু, ব্লাউজ ও মাথার ওড়না পরে। কনের বিয়ের পোশাক ক্রয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত এনগেজমেন্টের সময়ই গৃহীত হয় এবং বিয়ের আগে ঘটকের মাধ্যমে তা কনের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। অতীতের স্মৃতিতে পালকি নিয়ে একটি মানসিক ও শোকাবহ ঘটনা আছে—প্রায় ৩০ বছর আগে মায়ানমারের মংডু এলাকায় পালকি বহনকালে অনিয়ন্ত্রিত স্রোতে পালকি পড়ে যাওয়ার কারণে কনে ও দুই শিশুর মৃত্যু ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে পালকির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

এনগেজমেন্টে মোহরানা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে পরিশোধ করা হয়। বিয়ের দিন ছেলেপক্ষের পুরুষ ও মহিলা সদস্যরা কনের বাড়িতে মেয়েকে সাজিয়ে দেয়। যদি ছেলেপক্ষের নৈবেদ্য না দেয়, তাহলে মেয়ের পরিবার সাজানোর দায়িত্ব নেয়; এক্ষেত্রে ছেলেপক্ষকে ২–৩ হাজার টাকা দিতে হয়। সাজানো শেষে ছেলেপক্ষের প্রতিনিধি কনেকে নিয়ে বরের বাড়িতে আসে এবং বিয়ের অনুষ্ঠান সেখানে সম্পন্ন হয়। নিকাহ অনুষ্ঠানের আগে মেয়েপক্ষের লোকজন ‘পাঁচকরা’ নিয়ে উপস্থিত হয়, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যবহার্য জিনিসপত্রের জোগান। এই ‘পাঁচকরা’ তালিকায় মেসওয়াক, টুপি, ব্রাশ, জুতা, শার্ট, টর্চ, প্রসাধনী ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা মেয়ের জন্য উপহার হিসেবে আনা হয়। পুরনো সময়ে মায়ানমারে মোটরসাইকেল উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি ছিল, যার প্রচলন বর্তমানে শরণার্থী শিবির এলাকায় নেই।

দুই পরিবারের সদস্যরা মিলিত হয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুযায়ী নিকাহ সম্পন্ন করেন। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে প্রচুর খাবার পরিবেশন করা হয় এবং অতিথিদের জন্য উপহার ও অর্থ প্রদান করা হয়, যদিও এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেয়ের পক্ষ চলে গেলে সাত দিনের মধ্যে নবদম্পতি মেয়ের বাড়িতে গমন করেন। সেখানে নববধূ সাধারণত একাই ছেলেকে নিয়ে থাকে এবং সাত দিন পরে শ্বশুর বা অন্য পুরুষ সদস্যরা তাঁকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এই সফরটি দুই পরিবারের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।

রোহিঙ্গা সমাজে বিয়ের এই জটিল বিধানসমূহ জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই একধরনের সামাজিক সহায়তা ও নিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। সংকটপূর্ণ পরিবেশ ও অস্থিরতার মধ্যে, এই সংঘর্ষের মাঝেও তারা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় অটল। বউজোড়া থেকে শুরু করে নবদম্পতিদের পথে যাত্রা—প্রত্যেকটি পদক্ষেপে ভালোবাসা, সম্মান এবং সামাজিক বন্ধনের এক অপার শক্তি নিহিত থাকে। মানবিক দুর্দশার

মাঝেমাঝে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের এই সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতা যেন তাদের জীবনের নতুন স্বপ্ন ও আশার আলো হয়ে প্রতিফলিত হয়।

বিবাহ মানবসমাজের অপরিহার্য ও প্রাচীনতম সামাজিক প্রথাগুলোর মধ্যে একটি, যার আদি ইতিহাস গুহাবাসী পূর্বপুরুষের যুগ থেকে শুরু হয়ে আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বব্যবস্থাতেও অটুটভাবে টিকে আছে। এটি কেবল দুটি ব্যক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিষ্ঠাই নয়, বরং মানবজাতির পূর্বপরিচয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিবাহের মাধ্যমে সমাজ গঠিত হয়েছে, পরিবার গড়ে উঠেছে এবং বিবিধ সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।

আধুনিক সমাজে যদিও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং সম্পর্কের নতুন বিচিত্র রূপগুলো বিবাহের ধারণাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, তবু বিবাহের সামাজিক ও আইনি মর্যাদা অক্ষুণ্ন রয়েছে। যেখানে ভিন্নমত, বিচ্ছেদ ও সম্পর্কের পুনর্গঠন ঘটে, সত্ত্বেও বিবাহের ভিত্তিগত গৌরব ও মহিমা অপরিবর্তিত। কারণ এটি বহু যুগ ধরে সামাজিক কাঠামো ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি হিসেবে কার্যকর।

যতদিন মানবসমাজ থাকবে, বিবাহ ততদিন পর্যন্ত মহিমান্বিত ও অপরিহার্য থাকবেই—সমাজের নিয়ম, সংস্কৃতি এবং মানবিক গুণাবলির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে। এই চিরস্থায়ী প্রথার মাধ্যমে মানবজাতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছে আগামী দিনের জন্য।

লেখক
পুনাক সদস্য

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ