বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
29 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅভিযানের গল্পর‍্যাবের পোশাকে ভয়ংকর ছদ্মবেশ: শাহবাগে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের পতন

র‍্যাবের পোশাকে ভয়ংকর ছদ্মবেশ: শাহবাগে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের পতন

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

রাজধানীর শাহবাগ—ব্যস্ততম এলাকা, যেখানে দিনের বেলায় মানুষে গমগম করে, আর রাতেও থাকে আলো আর শব্দের কোলাহল। কিন্তু এই প্রাণকেন্দ্রেই কয়েক সপ্তাহ আগে ঘটে যায় এমন এক ঘটনা, যা শুনে অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেনি। র‍্যাবের পোশাক পরিহিত একদল লোক প্রকাশ্যে দিবালোকে একজন পথচারীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মানুষ ভাবল, নিশ্চয়ই এটি কোনো নিয়মিত অভিযান। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেল—এটি আসলে ছিল একটি ভয়ংকর ডাকাতি, আর ‘র‍্যাবের পোশাকধারীরা’ ছিল ছদ্মবেশী অপরাধী।

একটি স্বাভাবিক দুপুরবেলা শাহবাগের দিক থেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন একজন পথচারী। হাতে ছিল নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারভর্তি ব্যাগ। হঠাৎই চারজন লোক—কালো র‍্যাব পোশাক পরে, বুকে ব্যাজ ঝুলিয়ে—একদম সরকারি কায়দায় তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। একজন রুক্ষ স্বরে বলে ওঠে,
“র‍্যাব, সাইডে যান, একটু কথা বলতে হবে।”

এর আগেই আরেকজন তাঁর হাত চেপে ধরে টেনে নেয় একটি সাদা হাইয়েস মাইক্রোবাসের দিকে।পথচারী তখন কিছুটা আঁচ করতে পারেন—বিষয়টা ঠিকঠাক নয়। মুহূর্তের সিদ্ধান্তে তিনি জোরে ধাক্কা মেরে নিজের ব্যাগটি রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেন। কিন্তু সেটাই হয়তো ছিল তাঁর ভুল বা সঠিক পদক্ষেপ—কারণ ব্যাগটি মুহূর্তেই তুলে নিয়ে ছদ্মবেশী “র‍্যাব” সদস্যরা গাড়ি চালিয়ে উধাও হয়ে যায়। ব্যাগের ভেতর ছিল প্রায় চার লক্ষ টাকা ও ১১ ভরি স্বর্ণালংকার।
ঘটনাটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সাধারণ মানুষ হতভম্ব—র‍্যাবের পোশাক পরে ডাকাতি! ভিক্টিমের অভিযোগের ভিত্তিতে শাহবাগ থানায় মামলা হয়। থানার অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ ছিনতাই নয়—এটি পরিকল্পিত, পেশাদার এক ডাকাত দলের কাজ।

শুরু হয় প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান। মোবাইল ট্র্যাকিং, সিসিটিভি বিশ্লেষণ, গোপন সূত্রের তথ্য—সব মিলিয়ে শাহবাগ থানার চৌকস টিম বের করে সেই সাদা মাইক্রোবাসের গতিপথ। তারপর এক সকালে, শাহবাগ থানা এলাকায় চালানো হয় অভিযান। নাটকীয়ভাবে ধরা পড়ে একে একে আটজন সক্রিয় ডাকাত সদস্য।

তাদের আস্তানা তল্লাশি করে যা পাওয়া যায়, তা দেখে হতবাক হন তদন্ত কর্মকর্তারা। তিনটি র‍্যাব ইউনিফর্ম (শার্ট), একটি প্যান্ট, চারটি শোল্ডার ব্যাজ, দুটি হ্যাট ব্যাজ, ছয়টি র‍্যাঙ্ক ব্যাজ, একটি “র‍্যাব” লেখা ক্যাপ, দুটি খেলনা পিস্তল, দুটি হ্যান্ডকাফ, দুটি সিগন্যাল লাইট, ১১টি মোবাইল ফোন এবং একটি হিরো স্কুটি উদ্ধার করা হয়।

পুরো আস্তানাটি যেন ছিল এক “ভুয়া বাহিনীর সদরদপ্তর”। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর স্বর্ণপট্টি তাঁতিবাজার এলাকায় নজর রাখত। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা যখন বিক্রির টাকা বা অলংকার নিয়ে ফিরতেন, তখন এই দল তাদের অনুসরণ করত। সুযোগমতো র‍্যাব বা ডিবি পরিচয়ে রাস্তা আটকিয়ে “অভিযান” চালাত এবং মুহূর্তের মধ্যেই সব লুট করে পালিয়ে যেত।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কয়েকজনের নামে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট ভূমিকা বণ্টন করেছিল—কেউ অভিনয় করত “অফিসার ইন চার্জ”, কেউ “চালক”, কেউ “দেহরক্ষী”। এমন পেশাদারিত্বে তারা কাজ করত যে সাধারণ মানুষ সন্দেহই করত না।

শাহবাগ থানা পুলিশ জানায়, এই গ্রেফতার একটি বড় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রকে ভেঙে দিয়েছে। এখনো কয়েকজন পলাতক রয়েছে, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

শাহবাগের সেই দুপুরের ঘটনাটি আজও শহরের মানুষকে নাড়া দেয়—যেখানে নিরাপত্তার পোশাকই হয়ে উঠেছিল অপরাধের ঢাল। কিন্তু সত্য যেমনই মুখোশ পরে লুকাক, আইন ও গোয়েন্দা নজর থেকে কিছুই চিরকাল গোপন থাকে না—যেমন গোপন থাকেনি এই “ছদ্মবেশী র‍্যাব” দলের ভয়ংকর কাহিনিও।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ