চট্টগ্রামের ইপিজেডের এক নীরব দুপুরে ঘটেছিল এমন এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড, যা দীর্ঘ চার বছর পর পিবিআইয়ের সূক্ষ্ম অনুসন্ধানের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়ে আসে এক চমকে দেওয়া সত্য হিসেবে। অন্তঃসত্ত্বা তরুণী মেহেরিন আক্তার (ছদ্মনাম), যিনি একসময় নতুন জীবন ও নতুন সন্তানের স্বপ্ন দেখতেন, নৃশংসভাবে খুন হন তাঁর নিজের স্বামীর ঘরে। আর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন সেই মানুষ, যাকে তিনি মা বলে ডাকতেন—তারই শাশুড়ি।
মেহেরিনের বিয়ে হয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে, তাঁর খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকেই সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। শাশুড়ি ও স্বামীর নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। তবুও মায়ের ঘরে ফিরে না গিয়ে, সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় তিনি প্রতিদিন লড়াই করে গেছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—এক বিকেলে তাঁর খালাতো বোন মারিয়া ফোন করে জানায় ছোট বোন সিনথিয়াকে,
“কেউ এসে তোমার আপুকে গলা টিপে বেহুশ করে গেছে।”
ভয়, উদ্বেগ আর অজানা আশঙ্কা নিয়ে সিনথিয়া ছুটে যান। দরজা খুলেই দেখেন, বাড়ির শয়নকক্ষে মেঝেতে পড়ে আছে নিথর দেহ।
প্রাণহীন চোখে যেন তাকিয়ে আছে এক অন্য জগতের দিকে। সেই দৃশ্য কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো পরিবারকে। পরদিনই মেহেরিনের বড় ভাই মেহেদি থানায় মামলা করেন। আসামি হিসেবে উল্লেখ করেন ভিকটিমের স্বামী, শাশুড়ি জুলেখা বেগম (ছদ্মনাম) এবং বাসার ভাড়াটিয়া মোঃ রফিককে (ছদ্মনাম)।
থানা পুলিশ দীর্ঘ এক বছর তিন মাস ধরে তদন্ত চালিয়ে চার্জশিট দাখিল করে, কিন্তু সত্যের মূল সূত্রটি অধরাই থেকে যায়। পরে বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর হাতে আসে। পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সার্বিক নির্দেশনায় গঠিত বিশেষ একটি টিম তথ্যপ্রযুক্তি ও সোর্সের সহায়তায় কিছুদিনের মধ্যেই চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার হাজীপাড়া বেলতল এলাকা থেকে মূল আসামি মোঃ রফিককে (৩৫) গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে ধীরে ধীরে খুলে যায় ভয়ংকর সত্যের পর্দা। রফিক ছিলেন ভিকটিমের নিজের পুত্রবধূকে ‘সমস্যার মূল’ ভাবতে শুরু করেন। ক্রোধ ও প্রতিহিংসার বশে তিনি রফিকের সঙ্গে দেড় লক্ষ টাকায় মৌখিক চুক্তি করেন—“মেহেরিনকে শেষ করে দাও।” পরিকল্পনা হয় নিখুঁতভাবে।
ঘটনার দিন ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজের সময় ঘরে ছিলেন কেবল মেহেরিন। গর্ভে সন্তান নিয়ে শান্তভাবে নামাজ পড়ছিলেন তিনি। তখনই পরিকল্পনা অনুযায়ী রফিক তার সঙ্গে আরও তিনজন সহযোগীকে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায় সেই নির্মম দৃশ্য—গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যায় তারা। গর্ভে থাকা নবজীবনের আলো নিভে যায় অন্ধকারে।
পিবিআইয়ের হাতে ধরা পড়ার পর রফিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়, যেখানে সে শীতল ভঙ্গিতে পুরো হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে। আদালতে সেই বক্তব্য শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই।
এই ঘটনা থেকে একটিই বিষয় নিশ্চিত—সত্য যত গভীরেই লুকানো থাকুক, পিবিআইয়ের অনুসন্ধানী চোখের সামনে তা একদিন না একদিন প্রকাশ পেতেই হয়।
চট্টগ্রামের সেই দুপুরের নীরবতা আজও যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক প্রশ্নে—কীভাবে একজন মা তার নিজের পুত্রবধূর মৃত্যুর মধ্যে শান্তি খুঁজতে পারে? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখন আর কারও জানা নেই—শুধু ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় শুয়ে আছেন অন্তঃসত্ত্বা মেহেরিন আক্তার, এক নামাজরত নারীর নীরব আত্মত্যাগের নিদর্শন হয়ে।
শাশুড়ির পুরোনো পরিচিত এবং একই ভবনের ভাড়াটিয়া। পারিবারিক কলহের জেরে জুলেখা বেগম
