আমাদের সমাজে কিছু কিছু ঘটনা পেশাগত গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে তেমনই এক বিরল ঘটনার নায়ক ছিলেন দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ। ১৯১৪ সালে কিশোর নজরুলের দুঃসহ পরিস্থিতি দেখে তিনি শুধু তাকে রুটির দোকানের কঠিন কাজ থেকে মুক্তই করেননি, বরং নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ত্রিশালের দরিরামপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। এই একটি মানবিক উদ্যোগ নজরুলের জীবনকে নতুন পথে এগিয়ে দেয় এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির দিগন্তে তার অসামান্য অবদানের পথ মসৃণ করে দেয়। কাজী রফিজউল্লাহর এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বই পালন করেন না, বরং মানবিকতা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
আজকের বাংলাদেশে কি দারোগা রফিজউল্লাহর মতো মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা নেই? অবশ্যই আছেন। হতে পারে সংখ্যায় কম। আবার অনেকেই হয়তো পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন না। অনেক ঘটনাই হয়তো অন্তরালে থেকে যায়। অন্যদিকে নেতিবাচক ও বিব্রতকর এমন কিছু ঘটনাও ঘটে, যেগুলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের চোখে পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, যেখানে রফিজউল্লাহর মতো ব্যক্তিগত মানবিকতাকে সামষ্টিক নীতিতে রূপান্তর করা যায়। এক্ষেত্রে ‘পুলিশ সিটিজেন ফোরাম’ হতে পারে একটি কার্যকর প্লাটফর্ম। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে পুলিশি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছবে এবং মানবিকতা হবে পেশাদারিত্বের মূল ভিত্তি।
জনমুখী পুলিশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ শাসনামলে পুলিশের মূল দর্শন ছিল মূলত দমনমূলক। শিল্প বিপ্লবের পর ইংল্যান্ডে অপরাধ দমনে স্যার রবার্ট পিল ১৮২৯ সালে লন্ডন মেট্রো পুলিশ গঠন করেন। এর সাফল্য ভারত শাসনের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ সরকারকে অনুপ্রাণিত করে। ফলস্বরূপ ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্টের অধীনে গঠন করা হয় ভারতীয় পুলিশ বাহিনী। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসকদের শাসনকে পাকাপোক্ত করা। এই আইনি কাঠামো ও দর্শনভিত্তির কারণে জনগণ ও পুলিশের মধ্যে শুরু থেকেই একটি সহজাত দূরত্ব ও ভীতি তৈরি হয়, যা স্বাধীনতার এত বছর পরও খুব একটি দূর হয়নি। ব্রিটিশদের চালু করা পুলিশি ব্যবস্থা ছিল মূলত প্রতিক্রিয়াশীল (রেসপন্স-ভিত্তিক) কার্যভিত্তিক—অর্থাৎ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তার মোকাবেলা করা।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রথাগত পুলিশিংয়ের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা হয়। পুলিশ কেবল অপরাধ দমনের একটি সংস্থা নয়, বরং জনগণের বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে কাজ করবে—এই নতুন দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জনমুখী বা কমিউনিটি পুলিশিং ধারণার জন্ম হয়। এই দর্শনে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়। কমিউনিটি পুলিশিংয়ে অপরাধের পর ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে অপরাধের কারণগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো দূর করার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
পুলিশের একার পক্ষে সকল সামাজিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। এ কারণে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূলমন্ত্র ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে তাদের নিজ নিজ এলাকার অপরাধ প্রতিরোধে আইনি পরামর্শ দিয়ে সচেতন করা এবং পুলিশকে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করা।
বৈশ্বিক মডেল: নাগরিক সেবায় বৈশ্বিক অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্ত
জনমুখী পুলিশিংয়ের ধারণাটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব মডেল থেকে বাংলাদেশের শিক্ষণীয় অনেক কিছু রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলা যায় জাপানের ‘কোবান’ সিস্টেমের কথা, যা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের একটি দারুণ উদাহরণ। কোবান হলো পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট পুলিশ স্টেশন, যেখানে পুলিশ শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং জনগণের বন্ধু হিসেবে কাজ করে। তারা পথনির্দেশ দেওয়া, হারানো জিনিস খুঁজে বের করা এবং এলাকার বয়স্ক নাগরিকদের খোঁজখবর নেওয়ার মতো মানবিক কাজগুলো করে থাকে। এর ফলে জাপানের পুলিশ জনগণের কাছে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
একইভাবে সিঙ্গাপুরের পুলিশিং মডেলে জনগণের অংশগ্রহণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের ‘কমিউনিটি সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’ ও ‘সিটিজেনস অন প্যাট্রল’ কার্যক্রমের মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেরাই নিজেদের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। এই স্বেচ্ছাসেবকরা টহল প্রদানকালে সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখলে পুলিশকে জানায়। এই মডেল সমাজের প্রতিটি সদস্যকে নিরাপত্তার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করে।
ভারতের ‘পুলিশ মিত্র’ মডেলও একটি কার্যকরী দৃষ্টান্ত হতে পারে। এই মডেলে প্রতিটি পুলিশ বিটে ১০০ থেকে ২০০ জন নাগরিককে ‘পুলিশ মিত্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়, যারা পুলিশের ‘চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করে। তাদের নিয়ে গঠিত হয় কমিউনিটি লিয়াজোঁ গ্রুপ। এই ব্যবস্থা একটি সিটিজেনস ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা অপরাধ প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং থেকে সিটিজেন ফোরাম
বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে। ২০১৩ সালে সীমিত পরিসরে এর যাত্রা শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। এর মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক ও নারী নির্যাতনের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো প্রতিরোধে কাজ করা। তবে এই কার্যক্রম তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। জনগণের আস্থা অর্জনেও তেমন কোনো সাফল্য লাভ করেনি এই উদ্যোগ।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের কাছে পুলিশের সেবা পৌঁছে দিতে এই কার্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সব কমিটি ভেঙে দিয়ে প্রতিটি থানায় ‘সিটিজেন ফোরাম’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ফোরামের মূল লক্ষ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যক্রমে সরাসরি সহায়তা করা। এটি পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
সিটিজেন ফোরামে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবীর মতো বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মাধ্যমে সচরাচর পুলিশের সঙ্গে যাদের মিথস্ক্রিয়া হয় না, সেই ৯৫ শতাংশ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে পারবে বলে আশা করা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের কমিউনিটি পুলিশিংয়ের তুলনায় এই ফোরামে নতুনত্ব আনা হয়েছে। এর কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি আলাদা কমিটি থাকবে। এই কমিটি ফোরামের সদস্যদের অপরাধমূলক কাজে জড়িত হওয়া থেকে বিরত রাখবে এবং একই সাথে পুলিশের কার্যক্রম তদারকিতেও সহায়তা করবে।
সিটিজেন ফোরামের জন্য অনুসরণীয় মডেলসমূহ
ইতিহাসবিখ্যাত দারোগা রফিজউল্লাহর সেই মানবিক দৃষ্টান্তকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মডেলে রূপান্তর করার এখনই সময়। পুলিশ সিটিজেন ফোরামের মাধ্যমে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে জনকল্যাণমুখী মানসিকতা তৈরি করা যেতে পারে।
এই ফোরামের সদস্যরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারে, যেন ভবিষ্যতে আরও অনেক ‘নজরুল’ তৈরি হয়। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণের সফল দৃষ্টান্তকে এই ফোরামের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দেওয়া সম্ভব। ফোরামের সদস্যরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করলে যানজট কমবে এবং পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে। এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মব সহিংসতা ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা সহজ হবে। ফোরামের সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করবে এবং পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে কিশোরদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের জরুরি নম্বর ৯৯৯, অনলাইন জিডি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন-এর মতো অসংখ্য ডিজিটাল সেবা রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত তথ্য ও সচেতনতার অভাবে জনগণের কাছে এসব সেবার সুফল পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না। এই সমস্যা মোকাবেলায় সিটিজেন ফোরাম একটি কার্যকর প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ফোরামের মূল দায়িত্ব হবে ডিজিটাল সেবাগুলোর ব্যাপক প্রচারণা এবং নিয়মিত আলোচনা আয়োজনের মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা।
জনআস্থা অর্জনে পুলিশ সিটিজেন ফোরামের সাফল্য নির্ভর করে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও কৌশলগত পদক্ষেপের ওপর। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশ-বিষয়ক দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা। এগুলো মোকাবেলায় ফোরামকে কেবল একটি প্রতীকী কমিটি না রেখে সত্যিকার অর্থে জনগণের অংশীদারিত্বের প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি বিট ও থানায় কমিউনিটি লিয়াজোঁ গ্রুপ ও নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পুলিশ সদস্যদের মানবিক আচরণের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যেন তারা প্রতিটি নাগরিকের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন।
পুলিশের এই বিবর্তন একটি মৌলিক সত্যকে তুলে ধরে—জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কোনো পেশাগত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই অপরাধ প্রতিরোধ ও জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্ব অপরিহার্য।
লেখক
এআইজি
কমিউনিটি অ্যান্ড বিট পুলিশিং
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
ঢাকা
