বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৯, ২০২৬
25 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমলাইফস্টাইলধারাবাহিক উপন্যাসঅপারেশন কিনশাসা: পর্ব ২ জিম্মি উদ্ধারে ২৪ ঘণ্টা

অপারেশন কিনশাসা: পর্ব ২ জিম্মি উদ্ধারে ২৪ ঘণ্টা

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

কিনশাসার ক্যাম্পের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। মিটিং শেষ হলেও কারো চোখে বিশ্রাম নেই। প্রতিটি কর্মকর্তা যেন মনে মনে জানেন—এবার তারা এমন এক খেলায় নামতে চলেছেন, যেখানে ভুলের সুযোগ নেই।আরিফ ধীর পায়ে বাইরে বেরোলেন। অন্ধকার পাহাড়গুলো দূরে দাঁড়িয়ে আছে—যেন পাহাড়বাসীদের প্রতিদিনকার সংগ্রাম, এবং তবুও তাদের শিরদাঁড়া সোজা করে মাথা উঁচু করে থাকার কথা জানান দিচ্ছে।পাহাড়ের ডালে নিকষ কালো অন্ধকার—যেন বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয়ংকর সব নিষ্ঠুর কাণ্ড, নিরীহ মানুষের আর্তনাদ, নারী-শিশুদের আহাজারি কালো হয়ে জমে আছে। আরিফ ভাবতে লাগলেন, এই নিষ্ঠুর পাহাড়ের বুকেই কোথাও লুকিয়ে আছে অপহৃত ইউএনএইচসিআর সদস্যরা। দেশের মায়া ত্যাগ করে তারাও তো ছুটে এসেছে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে—অনাহারে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুটিকে রক্ষা করতে। কিন্তু আজ তাদেরকেই বানানো হয়েছে জিম্মি।মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, “না, এই নিষ্ঠুরতার শেষ হওয়াই চাই।” বলতে বলতে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো, চোয়াল শক্ত ইস্পাতকঠিন, মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।এই কথোপকথনের মাঝেই ম্যাক তার একমাত্র কাজটি করে ফেলল—চুপিসারে একটি পাথর ছুড়ে দিল পাশের ঝোপে। অতি সামান্য, সাধারণ খেলাচ্ছলে। সেটাই ছিল ফায়ারফ্লাই। এখন কাবা যখনই ফোন ধরবে, স্যাটেলাইট ট্র্যাকার তাদের অবস্থান পাঠাতে শুরু করবে।

কিন্তু বিপদ খুব দ্রুতই ঘনিয়ে এলো। দুই পাহারাদারের একজন হঠাৎ ম্যাকের পা থেকে ঝুলে থাকা ডিভাইস কেসিং দেখে সন্দেহ করল। সে এগিয়ে এসে বলল, “এটা কী?”ম্যাক থমকে গেল।রাইসা চিনে গেল সে মুহূর্তটিকে—এটাই হতে পারে তাদের শেষ। সে তৎক্ষণাৎ সামনে এসে বলল, “মেডিকেলের কিট। আমাদের ডাক্তার থাকে—তোমরা চাইলে খুলে দেখাতে পারো।”পাহারাদার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নাড়িয়ে ফিরে গেল। এক চুলের ব্যবধানে বিপদ কেটে গেল। কিন্তু রাইসা বুঝলেন—শুশিরা সন্দেহপ্রবণ; আর সামান্য ভুলেই পুরো টিমকে মেরে ফেলতে পারে।কাবা বিদায়বেলায় বলল, “৩৬ ঘণ্টা নয়—৩০ ঘণ্টা। অতিরিক্ত ছয় ঘণ্টা দিচ্ছি। তারপর… একে একে তাদের গলা কেটে পাঠিয়ে দেব।”কথাগুলো যেন পাথরের মতো ঠান্ডা।রাইসা গলায় শান্ত সুর ধরে উত্তর দিলেন, “আমরা সময়মতো পৌঁছাব।” নামতে নামতে তিনি ওয়াকিটকিতে ধীর কণ্ঠে বললেন—
“ফায়ারফ্লাই স্থাপন সম্পন্ন। ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু তারা অত্যন্ত সন্দেহপরায়ণ। অপারেশন দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে।”অন্য প্রান্তে ক্যাম্প অধিনায়ক আরিফ চাপা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “কপি। টিম ফাইভ, প্রস্তুত থাকো। সিগন্যাল পেলে ঝড়ের গতিতে আঘাত করতে হবে।”

অপারেশনের পূর্ব মুহূর্ত

রাত প্রায় ২টা। গাড়িটি পাহাড় থেকে নেমে ক্যাম্পে পৌঁছানোর সময় রাইসার মুখ ছিল ফ্যাকাশে। কিন্তু তার চোখে ছিল অন্য ধরনের আগুন—দৃঢ় মনোবলের আগুন।ম্যাক তৎক্ষণাৎ ল্যাপটপ খুলল। ফায়ারফ্লাই সিগন্যাল ডিটেক্ট হচ্ছিল। নরম লাল বিন্দুর মতো পর্দায় ফ্ল্যাশ করছে—শুশি গোষ্ঠীর অবস্থান। গুহার সুনির্দিষ্ট অবস্থান।আরিফ সাহেব সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তিনি নিচু গলায় বললেন—
“অপারেশন শুরু। এটাই আমাদের একমাত্র সুযোগ।”রুমের বাতাসের ভেতর আবার সেই পুরনো টিক-টিক শব্দ ফিরে এলো—সময় কমছে। জীবন ঝুলে আছে এই টিকের ওপর।

অন্ধকার গুহায় অপারেশন

ক্যাম্পে তখন গভীর রাত। পুরো আকাশ ঢেকে আছে কালো মেঘে, যেন প্রকৃতি নিজেই বুঝে গেছে—আজ রাতে কেউ ঘুমোবে না।

শুশি গোষ্ঠীর অবস্থানের সঠিক তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের আলোচনাকক্ষ এক ধরনের যুদ্ধ-উত্তেজনার কাঁপনে ভরে উঠল। ম্যাক ল্যাপটপে লাল বিন্দুটির ওপর বারবার জুম করছে।বিন্দুটি স্থির নয়—ধীরে ধীরে এদিক-ওদিক সরে যাচ্ছে। রাইসা টেবিলের ওপর ঝুঁকে বললেন,
“ওরা পাহাড়ের গুহার ভেতর নড়াচড়া করছে… কিন্তু সিগন্যাল শক্তিশালী। আমরা নিশ্চিত অবস্থান পেয়েছি।”আরিফ সাহেব পরিস্থিতিটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। “তাহলে সময় এসেছে,” কণ্ঠ দৃঢ়। “স্পেশাল অপারেশন টিমকে প্রস্তুত করি। রাত শেষ হওয়ার আগেই আমাদের গুহার মুখে পৌঁছাতে হবে।”অপারেশন এলাকার পেছনের লুকানো শেডটিতে একে একে এসে জড়ো হলেন—মিস্টার চ্যাংপি, ব্রিটিশ পুলিশের স্পেশাল ফোর্স সদস্য রড ও লুইস, বাংলাদেশের তিনজন স্পেশাল অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের সদস্য—রশিদ, হাসান ও মাজেদ, এবং ইউএআরডিসির দুইজন পাহাড়ি-অভিজ্ঞ অফিসার।একটি ম্যাপ টেবিলে বিছানো হয়েছে। পাশে রাখা নাইট ভিশন গগলস, সাইলেন্সারযুক্ত কারবাইন, স্মোক গ্রেনেড এবং রশির বান্ডিল। রড বলে উঠলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য: জিম্মিদের জীবিত উদ্ধার। যে কোনো পরিস্থিতিতে শুশিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতে হবে। গুলির শব্দ উঠলে… অপারেশন শেষ।”চ্যাংপি আগেও অনেক আত্মবিশ্বাসী দেখাতেন, কিন্তু আজ তাঁর চোখের পেছনে লুকানো নিচু উদ্বেগ স্পষ্ট। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “আমরা এত কম লোক নিয়ে যাচ্ছি?”রশিদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “যত কম দল, তত কম শব্দ। অপারেশনটা ‘নিঃশব্দ বজ্রপাত’—মনে আছে তো?”লুইস মৃদু হাসলেন, “Tonight, we become shadows.”

অন্ধকার পাহাড়ে নিঃশব্দ যাত্রা

রাত ৩টা ৪৮ মিনিট। অস্থায়ী ব্রিফিং শেষ হয়েছিল মাত্র দশ মিনিট আগে। এবার সময় অপারেশন শুরু করার। দুটি ছোট টিএনজি যান নীল আলো বন্ধ রেখে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে রওনা হলো। চারদিকে সুনসান নীরবতা—শুধু টায়ারের নিচে ভাঙা পাথরের চাপা খচমচ আওয়াজ।সামনের গাড়িতে বসে আছেন আরিফ সাহেব। তার চোখে স্থিরতা, কিন্তু বুকের ভেতর দুর্দমনীয় মনোবল। তিনি জানেন—এই অপারেশনের একটি ভুল পদক্ষেপই কারও শেষ নিঃশ্বাসের কারণ হতে পারে।প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর গাড়িগুলো থেমে যায়। এরপর থেকে শুধু হাঁটা। মূলত বাড়তি সতর্কতার জন্য এই ব্যবস্থা—যাতে করে সন্দেহের চোখে না পড়ে।পুরো দল মাথায় নাইট ভিশন গগলস পরে নীরবে পাহাড়ের দিকে উঠতে থাকে। চাঁদের আলো নেই, শুধু মেঘের ভার আর দূর পাহাড় থেকে আসা পশুর হাকডাক। কখনো বাতাস জোরে বইলে গাছের ডালগুলো আকাশে কাঁপে—তখন মনে হয় শুশিরাই বুঝি টহল দিচ্ছে।মাঝপথে স্থানীয় গাইড হাত তুলে সিগন্যাল দিল—থামো।দল থেমে গেল।
দূর থেকে হালকা আলো দেখা যাচ্ছে—দুটি টর্চ। শুশি গোষ্ঠীর প্যাট্রোল।চ্যাংপি ফিসফিস করে বলল, “ওরা দুইজন। আমরা চারজন। এখনই কাজ—”কিন্তু আরিফ তাকে থামালেন। “না। আমরা লড়তে আসিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত ওরা আমাদের দেখবে না—ততক্ষণ কোনো অ্যাকশন নয়।”দলটি ঝোপের আড়ালে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল দশ মিনিট ধরে। শত্রুর টর্চলাইট সামনে দিয়ে চলে গেল—মনে হলো ঠিক পাশ ঘেঁষে মৃত্যু হেঁটে চলে গেল।গুহার খুব কাছে—হঠাৎ এক বিকট শব্দ।অবশেষে তারা পৌঁছল গুহার অবস্থানের কাছে। জিপিএস ট্র্যাকারেও এটাই দেখাচ্ছে। একটু দূরে নদীর কলকল শব্দ, এবং তার সাথে গুহার মুখ থেকে আসা নিস্তব্ধতা—এগুলোই জানিয়ে দিচ্ছে তারা ঠিক জায়গায় এসেছে। ম্যাক যন্ত্রে চোখ রেখে বলল, “সিগন্যাল খুব শক্তিশালী। জিম্মিদের ফোন বা শুশিদের স্যাটেলাইট রেডিও এখানেই… এখানেই।”এক অজানা মুহূর্তে—এক তীক্ষ্ণ শব্দ কানে এলো। ধাতুর শব্দ।হাসান দ্রুত নিচু স্বরে বলল, “ওরা হয়তো অস্ত্র লোড করছে… অথবা দরজা বন্ধ করছে।”
চ্যাংপি গুহার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখনই প্রবেশ করা উচিত।”রড মাথা নাড়লেন, “না। প্রথমে রেকি করতে হবে। গুহাটা ভেতরে কতখানি গভীর? কোথায় জিম্মিরা?”হঠাৎ দূর পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে এলো একটি গুলির শব্দ। সবাই থমকে গেল। শব্দটি গুহার দিক থেকে নয়—মারিয়া টিলার দিকে।

রাইসা ওয়াকিটকিতে বলে উঠল—কণ্ঠে তীব্র উৎকণ্ঠা, “মিস্টার আরিফ, শুশিরা মারিয়া টিলায় হামলা শুরু করেছে! তারা বুঝে ফেলেছে কিছু! তাদের আচরণ উত্তেজিত!”
আরিফের চোখে বিদ্যুতের ঝলক, “তারা বুঝে ফেলেছে… আমরা দেরি করলে জিম্মিরা বাঁচবে না।”রড দ্রুত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন, “স্যার, যদি শুশিরা বুঝে থাকে, তাহলে তারা এখানেও প্যাট্রোল বাড়াবে। আমাদের সময় নেই।”ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আরিফ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন।“দলকে দুই ভাগ করতে হবে।”

টিম–১: রড, হাসান, মাজেদ, রশিদ—গুহার ভেতরে প্রবেশ করে জিম্মিদের সন্ধান করবে।
টিম–২: চ্যাংপি, লুইস, দুই ইউএআরডিসি সদস্য—গুহার প্রবেশদ্বারের চারদিকে প্রতিরক্ষা দেবে।
আরিফ সামগ্রিক কমান্ড নেবেন, রাইসা টিলা থেকে রিয়েল-টাইম তথ্য দেবেন।রশিদ জিজ্ঞেস করল, “স্যার, শুশিরা যদি এখনই জিম্মিদের সরিয়ে নেয়?”আরিফের কণ্ঠ একদম শীতল, “তাহলে আজ রাতেই জীবন আর মৃত্যুর দৌড় শুরু হবে—এখানে যারা জিতবে তারাই বেঁচে থাকবে।”

অন্ধকার গুহায় নিঃশব্দ প্রবেশ

টিম–১ ধীরে ধীরে গুহার মুখে এগোল। এখানে বাতাস ঠান্ডা, ভেজা, পাথরের গন্ধে ভরা। গুহার ভেতরে মাঝেমধ্যে টর্চলাইটের ক্ষীণ ঝলক—যেন ভেতরে কিছু নড়াচড়া হচ্ছে।
ম্যাক ধীরে বলল, “তাদের ফোন এই গুহাতেই। আমরা খুব কাছে।”হঠাৎ ভেতর থেকে একটি কর্কশ আর্তনাদ শোনা গেল। এটা মানুষের শব্দ।মাজেদ ফিসফিস করে বলল, “জিম্মিদের একজন… হয়তো আহত হয়েছে।”আরিফ আর দেরি করলেন না।
“প্রবেশ—এখনই।”স্পেশাল অপারেশন টিম চাপা শ্বাসে অস্ত্র হাতে গুহার অন্ধকারের ভেতর ঢুকে পড়ল—ঠিক সেই মুহূর্তে গুহার গভীর থেকে কারো চিৎকার—“They are here!”শুশিদের একজন দেখে ফেলেছে।
এক সেকেন্ডের মধ্যেই সব পরিকল্পনা বদলে গেল।
চলবে…

লেখক
হেড অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন,
ইন্টেলিস সলিউশন লিমিটেড

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ