“পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধ দমন নয়—অপরাধের পূর্বাভাস, প্রতিরোধ এবং অপরাধ-পরবর্তী কার্যক্রমে কার্যকর অংশগ্রহণও।”
— আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম
জুলাই অভ্যুত্থান এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। এই নতুন বন্দোবস্তে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা কী? চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলই বা কেমন? এসব নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জনাব বাহারুল আলম, বিপিএম-এর সঙ্গে কথা বলেছে ডিটেকটিভ। কথোপকথনে উঠে এসেছে জনবান্ধব পুলিশিংয়ের রূপরেখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়টিও। আইজিপি মহোদয়ের কৌতূহলোদ্দীপক সাক্ষাৎকারটি আমাদের এই সংখ্যায় পাঠকের সামনে বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্বভার গ্রহণের পর আপনার প্রথম অনুভূতি কী ছিল?
আইজিপি: ধন্যবাদ। আমি এটাকে একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করছি। বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অভিপ্রায়ে পুলিশ যেন অর্থপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকবো। আমি এই দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এবং এটি পালন করতে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকবে।
শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আইজিপি: এই আন্দোলন দেশের ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখে যাওয়া ঘটনা। আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাদের মেধার স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল। এ আন্দোলনে অনেকে শহীদ হয়েছেন, যারা জাতীয় ইতিহাসে বীরের মর্যাদা পাবেন। একই সঙ্গে বেশ কিছু পুলিশ সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।
৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ পুলিশ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। এই প্রেক্ষাপটে আপনার অগ্রাধিকার কী?
আইজিপি: আপনি যথার্থই বলেছেন—৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ পুলিশ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। জাতির জীবন থেকে পুলিশ যেন অপসারিত হয়ে গিয়েছিল। অনেকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছিল এবং বাহিনীর মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে আমার অগ্রাধিকার হলো পুলিশের আত্মবিশ্বাসের বিকাশ ঘটানো, অপারেশনাল সক্ষমতা ও গতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?
আইজিপি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নির্ভর করে অপরাধের বিচারের ওপর। প্রতিটি অপরাধের ন্যায়বিচারই পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে। এজন্য অপরাধ উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম পুনঃপ্রচলন আমার এখনকার প্রধান অগ্রাধিকার।
পুলিশকে জনবান্ধব করতে আপনি কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চান?
আইজিপি: জনগণ যখন সহজে পুলিশের কাছ থেকে পুলিশি সেবা পাবেন, তখন মানুষ নিজেই পুলিশের প্রতি আস্থাশীল হবেন। এটাই আমার কাজ—পুলিশি সেবা সহজীকরণ করা। জনগণের আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো পেশাদারী, স্বচ্ছ ও মানবিক আচরণ।
জনবান্ধব ও জনকেন্দ্রিক পুলিশে রূপান্তর করতে গেলে তো তাদের সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
আইজিপি: পুলিশের অতিরিক্ত কাজের চাপের বিষয়টি সবারই জানা। তাদের যথেষ্ট ছুটিরও ব্যবস্থা নেই। যেকোনো সময় ডাকলে সাড়া দেওয়ার কথা পুলিশ আইনেই বলা আছে। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্যকে দিয়ে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করানো অমানবিক। ৮ ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালন করলে তাকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। সপ্তাহে এক দিন ছুটিও তাদের প্রাপ্য।
এ ছাড়া পদমর্যাদায় যারা নিচে, তাদের আবাসন সুবিধা নিয়েও অসন্তোষ আছে। নতুন বাস্তবতায় এসব বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ, সংকীর্ণ ব্যারাকে রেখে, ছুটিবিহীন, দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দায়িত্বপালন করিয়ে পুলিশের কাছ থেকে মানবিক আচরণ আশা করা যায় না।
পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে আপনার অভিমত কী?
আইজিপি: আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কাজে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন আসলে নেই। এজন্য শটগানই যথেষ্ট। রাইফেলের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা উচিত নয়। আমরা বিশ্বাস করি, পুলিশ কোনো কিলার ফোর্স হতে পারে না। জনশৃঙ্খলার কাজে পুলিশের হাতে লিথাল (প্রাণঘাতী) নয়, বরং নন-লিথাল অস্ত্র থাকা উচিত।
তবে তদন্ত বা টহল কার্যক্রমের অস্ত্রের প্রাধিকার ভিন্ন—জীবনের ঝুঁকি আছে এমন কার্যক্রমে পুলিশের অবশ্যই প্রাণঘাতী অস্ত্র লাগবে। তবে তার ব্যবহার হবে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার কাজে।
পুলিশের কোন পর্যায়ের সদস্যের কাছে বা কোন ইউনিটের সদস্যের কাছে কী ধরনের অস্ত্র থাকবে—সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। অস্ত্রাগার বা ‘আর্মামেন্টেরিয়াম’ নিয়ে সবাই মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো—অস্ত্র নয়, জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের প্রকৃত শক্তি। ইতিহাসও আমাদের সেটাই শিখিয়েছে। পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের পাশে থাকে, তাহলে ভয়ের নয়, তারা হয়ে ওঠে ভরসার প্রতীক।
বাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান কী?
আইজিপি: আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—কোনো ধরনের দুর্নীতি, অপেশাদার আচরণ কিংবা শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’। বাহিনীর ভেতরে কেউ যদি এ ধরনের অপরাধে জড়িত হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
“আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—
কোনো ধরনের দুর্নীতি, অপেশাদার আচরণ কিংবা শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’। বাহিনীর ভেতরে কেউ যদি এ ধরনের অপরাধে জড়িত হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
— আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম
নতুন প্রেক্ষাপটে আপনি কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?
আইজিপি: আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে সকল মানুষ মানবিক আচরণ করবে। বৈষম্য নয়, আইনের শাসন থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।
সাধারণ জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী?
আইজিপি: আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সাধারণ জনগণের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের সমর্থন এবং গণমাধ্যমের সত্নিষ্ঠ ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাব—তারা যেন সমালোচনার পাশাপাশি গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে পুলিশকে আরও কার্যকর করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ পুলিশ প্রস্তুত আছে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে এবং গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এই সম্পর্কই হবে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।
