বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
27 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅভিযানের গল্পরহস্যময় ডোবায় ভেসে আসা লাশ: ছায়া তদন্তে উন্মোচিত চোরাই অটোরিকশা চক্র

রহস্যময় ডোবায় ভেসে আসা লাশ: ছায়া তদন্তে উন্মোচিত চোরাই অটোরিকশা চক্র

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

১.শুভাঢ্যা, কেরানীগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। প্রতিদিনকার মতোই এই শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পূর্বপাড়ায় সন্ধ্যা নামলেই এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। কামারপাড়ার সরু গলিগুলো দিনের কোলাহল ঠেলে নির্জনতার সাগরে ডুব দেয়।সেরকমই এক সন্ধ্যা। গ্রামের রমিজ মিয়া হাট থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। প্রতিদিনের মতোই সে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আপন মনে বাড়ি ফেরে। কিন্তু সেটি ছিল আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা।হঠাৎ তার চোখ যায় সরু গলির পাশের ডোবাটার দিকে। খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। কেননা এরকম কত কিছুই তো ওই পরিত্যক্ত ডোবায় ভাসে—হয়তো ময়লার স্তূপ, অথবা গাছের গুড়ি।কিন্তু হঠাৎ কী মনে করে রমিজ মিয়া আবার তাকায় ডোবার দিকে। কেমন যেন অস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে।একটু কাছে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই যা দেখল, তা দেখে রমিজ মিয়া ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।এ কী! এটা তো একটা ডুবন্ত লাশ!পানির ভেতর নিথর পড়ে আছে এক পুরুষদেহ। মুখ নিচের দিকে, শরীর স্থির, আশপাশে কোনো নড়াচড়া নেই।রমিজ মিয়ার দেখাদেখি আরও কয়েকজন এগিয়ে আসে। খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে থানা-পুলিশকে জানানো হয়।দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পিবিআই ঢাকা জেলা ক্রাইম সিন টিম। এলাকা ঘিরে ফেলা হয়।ততক্ষণে প্রচুর মানুষ চারপাশে জড়ো হয়। সবার মাঝেই হাজারো প্রশ্ন।সবার প্রথমে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো-এই লোকটি কে?লাশের সঙ্গে পরিচয় জানার মতো কোনো তথ্য বা আলামতের চিহ্ন নেই। পকেট খালি। মোবাইল ফোন নেই। চোখে-মুখে আঘাতের লক্ষণ স্পষ্ট নয়, আবার স্বাভাবিক মৃত্যুও মনে হচ্ছে না। মৃত্যুর পদ্ধতি অজানা, তবে বোঝাই যাচ্ছে-পরিকল্পিত।সবাই যখন বিভিন্ন কথা বলাবলি করছিল, পিবিআই-এর এক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বললেন- “তদন্ত করার আগে কোনো কিছু বলার সময় এখনো আসেনি। সময়ই বলে দেবে, ঘটনা কী ঘটেছিল।”

২.পরদিন সকালে পিবিআই পুরোদমে তদন্ত-অনুসন্ধান কাজ শুরু করে। আশপাশের থানাগুলোতে নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা চেক করা হয়। ঢাকা জেলার পাশাপাশি ডিএমপি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার রিপোর্টও যাচাই করা হয়।আঙুলের ছাপ, দেহের গঠন, পরনের পোশাক-সবকিছু মিলিয়ে চলছে তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি।এ সময় জানা যায়, কেরানীগঞ্জের চরাইল এলাকায় বসবাসকারী এক নারী থানায় এসে গত রাতে অভিযোগ করেছিলেন-তার স্বামী রাতে বাড়ি ফেরেননি। পেশায় অটোরিকশা চালক। ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। লোকটির নাম এরশাদ হোসেন (ছদ্মনাম)।পিবিআই টিম স্ত্রী সলেহা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে মর্গে যায়। লাশের মুখ দেখেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পিবিআই পরিচয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়।এবার পুলিশ খুনের কারণ বের করার অনুসন্ধানে নামে।জানা যায়, এরশাদ-৪৬ বছর বয়সী, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সন্তান। বহু বছর আগে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসেছিলেন। দিনে অটোরিকশা চালান। রাতে বাড়ি ফিরতে কখনো কখনো দেরি হতো-এটা প্রায়ই হতো। বিষয়টি পরিবারের কাছেও স্বাভাবিক ছিল।সব তথ্যই তো স্বাভাবিক। তাহলে অস্বাভাবিক ব্যাপার কী?তদন্ত কর্মকর্তা ভাবতে থাকেন। তবে কি এরশাদের পরিবার কোনো তথ্য লুকাচ্ছে? হঠাৎ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আসে নিহত এরশাদের মোবাইলের কল রেকর্ড। সেখানে বেশ কিছু বিষয় তদন্তকারীদের চোখে অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।এরশাদের ফোন রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়-মৃত্যুর রাতের আগমুহূর্তে একটি নম্বরে একাধিকবার কথা হয়েছে। নম্বরটি পরিবারে কারো নয়।আবার আশপাশের অটোরিকশা চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়-এরশাদ রাতে প্রায়ই নির্দিষ্ট কিছু লোকের সঙ্গে বের হতো।শুধু এখানেই শেষ নয়-আরও কিছু রহস্যময় ও ভয়ংকর তথ্য আসে পিবিআই-এর হাতে। যার পরিপ্রেক্ষিতে পিবিআই সিদ্ধান্ত নেয়, এই মামলায় দরকার ছায়া তদন্ত।অর্থাৎ, প্রকাশ্যে তদন্ত করলে অনেক প্রমাণ এবং ঘটনা আড়ালে থেকে যাবে।

৩.শুরু হয় পিবিআই-এর ছায়া তদন্ত।পিবিআই যেন নতুন এক এরশাদের সন্ধান পায়। এরশাদ হোসেনকে যারা চিনত, তাদের কাছে সে ছিল সাধারণ একজন মানুষ। সকালে ঘুম থেকে উঠে অটোরিকশা নিয়ে বের হয়, রাতে ফিরতে দেরি হয়-এই পর্যন্তই।স্ত্রী সলেহা বেগমের কাছেও এরশাদের পৃথিবী ছিল খুব সাধারণ, নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ, দারিদ্র্যপীড়িত। তবে এরশাদ বিপজ্জনক হতে পারে-এটা কল্পনাতেও তার মনে আসেনি। তাই মাঝরাতে বাসায় ফিরলেও কেউ প্রশ্ন তুলত না।কিন্তু পিবিআই যখন এরশাদের ফোন, চলাফেরা আর যোগাযোগের তালিকা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন একের পর এক তথ্য সামনে আসতে থাকে।
তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পাড়ার কয়েকজন অটোরিকশা চালক প্রথমে কথা বলতে চাইছিল না-ভয়ে, সন্দেহে কিংবা পুরোনো সম্পর্কের দায়ে। তবে ধীরে ধীরে তদন্ত কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করলে তারা মুখ খুলতে শুরু করে।একজন বলেন, “ভাই, আমরা জানতাম এরশাদ শুধু চালক না। রাতে ও অন্য কাজ করত।”“অন্য কাজ”-এই শব্দটাই তদন্তকারীদের কানে সবচেয়ে জোরে বাজে।খোঁজ নিয়ে বেরিয়ে আসে-এরশাদ কিছুদিন ধরে একটি ছোট ছিনতাইকারী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রাত গভীর হলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মিশুক কিংবা অটোরিকশা নিয়ে বের হতো। কখনো লক্ষ্য হতো ভ্যান, কখনো রিকশা, আবার কখনো সুযোগ বুঝে নির্জন পথে থাকা মানুষ।কিন্তু প্রশ্ন হলো-এরশাদই যদি ছিনতাইকারী হয়, তাহলে তাকে হত্যা করল কারা?এই প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারে না।যেহেতু এরশাদ সেদিন তার স্ত্রীকে বলে গিয়েছিল, রাতে ফিরতে দেরি হবে-তাই তদন্ত কর্মকর্তারা ধরে নেন, সেদিনও তারা ছিনতাই করতেই বেরিয়েছিল।তাহলে কি ছিনতাইয়ের ভাগাভাগি, নাকি পুরোনো দ্বন্দ্ব? কারা মারল এরশাদকে?পুলিশ এবার অনুসন্ধান শুরু করে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে। কিন্তু সে রাতে এই এলাকায় কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।পুলিশ ভাবতে থাকে-এরশাদ কি মাদকের সঙ্গেও জড়িত ছিল?পুলিশ আবার এরশাদের শেষ রাতের কল লিস্ট খুঁজতে শুরু করে। সেই রাতে এরশাদ অনেককে ফোন দিয়েছিল। তার মধ্যে খুব ছোট একটি কল ছিল পাড়ার অটোরিকশা চালক নুরুর সঙ্গে। পুলিশ নুরুকে গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করে। পিবিআই-এর পরবর্তী টার্গেট নুরু। তবে এখনো নিশ্চিত নয়, নুরু এই ঘটনার সঙ্গে কতটা জড়িত।এরই মধ্যে পুলিশের কাছে খবর আসে-নুরু বেশ কয়েকদিন ধরে বাড়িতে আসছে না। শেষ পর্যন্ত একদিন পুলিশ নুরুকেও মৃত অবস্থায় খুঁজে পায় তার বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়ের ভেতর। কেউ মেরে রেখে গেছে।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেও এরশাদের সঙ্গে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা বুঝতে পারেন-ছক কষেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো করা হয়েছে। যারা যারা তথ্যের উৎস হতে পারে, তাদের একে একে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।এবার তদন্তকারীরা নতুন কৌশল নেন।খোঁজা শুরু হয়-চোরাই অটোরিকশা কোথায় বিক্রি হয়। কারণ এটি একটি চক্র বা সিন্ডিকেট। মূল মাথাকে ধরতেই হবে।পুলিশ বিভিন্নভাবে ওঁৎ পেতে থাকে এবং ছিনতাইকৃত অটোরিকশা কেনার জন্য দালাল সেজে চারদিকে খবর ছড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে শুরু করে। পুলিশ ছদ্মবেশে দরদাম করতে থাকে।এক সময় তদন্ত কর্মকর্তা নিজেকে ছিনতাইকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কয়েকটি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অফার দেয় এবং আরও লোকবল চায়। এই ফাঁদে ধরা পড়ে চক্রটি। পরিচয় হয় পুরো গ্যাংয়ের সঙ্গে।পর্যায়ক্রমে পুলিশ ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে পুরো গ্যাংকে গ্রেফতার করে। এরপর বেরিয়ে আসে এরশাদ ও পরবর্তীতে নুরু হত্যার রহস্য।প্রতিদিনের মতো সেদিনও এরশাদ অটোরিকশা ছিনতাইয়ে বের হয়। এরশাদ মাদকাসক্ত ছিল। সে কারণে সে কিছু টাকা অগ্রিম নিয়েছিল চক্রের কাছ থেকে। কিন্তু সেই রাতে তারা অটোরিকশা ছিনতাইয়ে ব্যর্থ হয়।এ নিয়ে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে নুরুসহ গ্যাংয়ের অন্য সদস্যরা এরশাদের ওপর হামলা করে। প্রথমে তারা তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর অবশ করার ওষুধ জোর করে খাওয়ানো হয়। কিছুক্ষণ পর এরশাদ নিস্তেজ হয়ে যায়। বিষক্রিয়ায় সে মারা যায়।এরপর তারা এরশাদের অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় এবং ঢাকায় একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।আর যখন নুরুর নাম ঘটনা সংশ্লিষ্ট হিসেবে সামনে চলে আসে, তখন তাকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়-যাতে কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট না থাকে।কিন্তু সত্যের কণ্ঠ বাতাসে নড়ে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা পিবিআই কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতার কাছে ধরা পড়ে যায়।তবে পিবিআই-এর অভিযান এখনো চলমান। পিবিআই-এর বর্তমান লক্ষ্য-ঢাকায় চোরাই অটোরিকশা কেনাবেচার মূল গ্যাং।

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ