সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
25 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅপরাধ বিশ্লেষণখুন ও হত্যা:সভ্যতার সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতা

খুন ও হত্যা:সভ্যতার সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতা

মোঃ খালিদুল হক হাওলাদার
,

মানবসভ্যতার ইতিহাস এক অদ্ভুত ও রহস্যময় উপাখ্যান। এর পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে হানাহানি, যুদ্ধ ও রক্তের কালিতে লেখা উত্থান–পতনের গল্প। এই রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে খুন ও হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ শব্দ।

আধুনিক ইংরেজি শব্দ ‘মার্ডার’ (Murder)-এর উৎপত্তি প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় MRTRO থেকে, যার অর্থ মারা যাওয়া। মধ্যযুগের ইংরেজি ভাষায় এটি Mordre রূপে ব্যবহৃত হয়েছে, যা অ্যাংলো-স্যাক্সন Murdrian এবং প্রাচীন ফরাসি শব্দের দ্বারা প্রভাবিত। অন্যদিকে বাংলা ‘খুন’ শব্দটি ফার্সি ‘খূন্’ থেকে এসেছে, যা সাধারণত বিচারবহির্ভূত, পূর্বপরিকল্পিত বা আক্রোশবশত বেআইনিভাবে কারও জীবন নেওয়াকে বোঝায়। সমাজ ও আইনের চোখে খুনকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে (যেমন—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড)।

অন্যদিকে ‘হত্যাকাণ্ড’ শব্দটি সাধারণত নিরস্ত্র ও সাধারণ মানুষকে অতর্কিত অথবা পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলাকে নির্দেশ করে। ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যা একক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছে। আব্রাহামিক ধর্মমতে মানব ইতিহাসের প্রথম হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয় আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল কর্তৃক তার ভাই হাবিলকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই ঘটনা প্রমাণ করে সংঘাত ও ধ্বংসের প্রবণতা মানবজাতির ইতিহাসের একেবারে শুরু থেকেই বিদ্যমান।

সভ্যতার নামে নৃশংসতা: হোমো স্যাপিয়েন্সের বিবর্তন

মানুষের এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বহু ‘ইজম’ বা মতবাদের জন্ম হয়েছে, যা কখনও কখনও প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য–খাদক সম্পর্ককে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাঘের হরিণ শিকারের প্রাকৃতিক নিয়মকে মানুষ হত্যার সঙ্গে তুলনা করা এক চরম পাপাচার। কারণ মানুষের রয়েছে উন্নত মস্তিষ্ক ও নৈতিক চেতনা, যা তাদের ভালো–মন্দ বিচার করতে শেখায়।

হোমো স্যাপিয়েন্স আজ থেকে প্রায় এক লাখ বছর আগে তাদের নিকটতম জ্ঞাতি হোমো নিয়ানডারথালেনসিসকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল—এমন এক প্রচলিত মতবাদ রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মানুষ শুরু থেকেই হিংস্রতার পথ বেছে নিয়েছে। তবে জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণে নিয়ানডারথালদের ডিএনএ মানুষের জিনে খুঁজে পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হয় কখনও কখনও তাদের মধ্যে আন্তঃপ্রজননও ঘটেছিল।

এই তথ্যগুলো একদিকে যেমন সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি মানব প্রজাতির বিবর্তনের জটিল ও সংঘাতময় দিকটিকেও ইঙ্গিত করে।

মানব মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর উন্নত জ্ঞান ও চেতনা, যা ‘কগনিটিভ ফাংশন’ হিসেবে পরিচিত। বিবর্তন তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়, দুর্বল ও নখ–দন্তহীন প্রাণী হিসেবে মানুষ নিজেদের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে অন্য প্রাণীকে পরাস্ত করে সভ্যতার সূচনা করেছিল। কিন্তু এই সভ্যতার উত্থানের পথেই অনবরত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এই হিংস্রতার পথ ধরে চলতে থাকলে মানুষ হয়তো একদিন নিজেদেরই শেষ করে দেবে। ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ ও ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরে, যা আজও আমাদের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

সংকটের যুগ: প্রকৃতি, যুদ্ধ ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ

বর্তমানে আমরা এক জটিল সময়ে বাস করছি। একদিকে যেমন করোনার মতো মহামারি প্রাকৃতিক প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে চলছে যুদ্ধ ও হানাহানি। ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, কতিপয় মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে হয়। পরমাণু যুদ্ধের হুমকি আজ বাস্তব। একটি বোতামের চাপে একটি গোটা শহর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সত্যজিৎ রায় তাঁর আগন্তুক উপন্যাসে সভ্যতা ও সভ্য মানুষ নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্নগুলো রেখেছিলেন, সেগুলো আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় আশি বছর আগে ‘সভ্যতার সংকট’ নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সেই সংকট আজ ঘনীভূত।

২০২০ সালে দেখা গিয়েছিল করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর রূপ, যা আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেনের মতো উন্নত দেশগুলোতেও মৃত্যুর মিছিল নামিয়ে এনেছিল। শ্মশান ও গোরস্তানে দীর্ঘ লাইন, নদীতে ভেসে যাওয়া মরদেহ—এসব ছিল এক অন্ধকার মৃত্যুযজ্ঞের বাস্তব চিত্র। জীবনানন্দের ভাষায়—
‘কড়ির মতন শাদা মুখ তার,
দুইখানা হাত তার হিম;
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম চিতা জ্বলে।’

এই মহামারি হয়তো প্রকৃতির প্রতিশোধ ছিল, কারণ প্রকৃতি তার সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলে। প্রাণিতত্ত্ববিদদের মতে, আমাদের শরীরে সাড়ে তিনশ ট্রিলিয়ন ভাইরাস বাস করে, যাদের কিছু আমাদের অসুস্থ করে, আর কিছু আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে টিকে থাকে। প্রকৃতি এভাবেই তার ভারসাম্য রক্ষা করে।

তবে যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো ক্ষমা বা সামঞ্জস্য নেই। বোমার আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে যায় ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল এবং মানুষও। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে ব্রহ্মাস্ত্রের ভুল ব্যবহারের মতো আধুনিক যুগেও মেধাবী মনন তৈরি করছে নানা মারণাস্ত্র, যা সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।

অসাম্য ও হানাহানির নির্মম পরিণতি

আমাদের পৃথিবী বিভক্ত নানা শ্রেণিতে—প্রথম বিশ্ব, দ্বিতীয় বিশ্ব, তৃতীয় বিশ্ব। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও অধিকারের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। ধর্ম, জাতি, বর্ণ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিতে মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। মানুষের সহ্যশক্তি সীমিত। যখন অহংকার ও বৈষম্যের কারণে ‘আমি বড়, ওরা ছোট’-এর মতো মানসিকতা জন্ম নেয়, তখন এর পরিণতি হয় মৃত্যু ও ধ্বংস। এই হানাহানির মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে তথাকথিত মানবসভ্যতা।

শেষ পর্যন্ত এই সবকিছুর অন্তরালে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—সভ্যতার এই এত আয়োজন কিসের জন্য? সনাতন ধর্মমতে, মানুষের দেহ পঞ্চভূতে মিশে গেলেও আত্মা ‘ন হন্যতে’, অর্থাৎ তাকে হত্যা করা যায় না। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই সীমিত সময়ই জীবন। এই ‘আগে’ ও ‘পরে’-এর উত্তর খুঁজতে মানুষ ধর্ম, বিজ্ঞান ও দর্শনের দিকে ধাবিত হলেও কোথাও নিশ্চিত উত্তর মেলে না।

তাহলে কি এই হানাহানি ও ধ্বংসের পথেই মানবজাতির সমাপ্তি ঘটবে? হয়তো ভবিষ্যতের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী তাদের লাইব্রেরিতে লিখবে—
‘নিজেকে হোমো স্যাপিয়েন্স, অর্থাৎ জ্ঞানী মানুষ বলে জাহির করা একদল প্রাণী নিজেদের মধ্যকার হানাহানিতে একসময় লুপ্ত হয়ে গেছে।’
এই ভাবনাটিই আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে।

লেখক
অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি)
র‌্যাব-২

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ