খেলাধুলা শিশুদের শরীর ও মনকে প্রফুল্ল রাখে, তাদের মধ্যে সুস্থ
প্রতিযোগিতা, সামাজিক মেলামেশা, বন্ধুত্ব এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠে—অর্থাৎ
সামাজিকীকরণের স্বাভাবিক ও ইতিবাচক বিকাশ ঘটে। কিন্তু বর্তমান
সময়ে শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি তাদের শুধু শারীরিক
ও মানসিকভাবে অসুস্থ করছে না, একই সঙ্গে মনোজগতে
অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
এ বিষয় নিয়েই থাকছে বিশেষ লেখা
একটা সময় ছিল, যখন বিকাল বেলায় খেলার মাঠে ছিল শিশুদের রাজত্ব। ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেট-ফুটবল খেলা কিংবা লুকোচুরি ছিল তাদের আনন্দের দুনিয়া। কিন্তু এখন সেই মাঠগুলো ফাঁকা, আর শিশুদের চোখ বন্দি ছোট্ট এক পর্দায়। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট যেন তাদের নতুন দুনিয়া।
গ্রামের পাড়ায় কিংবা শহরের অলিগলিতে এখন দেখা যায় একই দৃশ্য—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে উঠতি কিশোর, সবার হাতেই স্মার্টফোন। সকাল-বিকাল, স্কুলের ফাঁকে কিংবা রাতে পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা ডুবে থাকে ইন্টারনেটভিত্তিক গেমস, ইউটিউব ভিডিও কিংবা টিকটক ও লাইকির রঙিন দুনিয়ায়। ধীরে ধীরে এই বিনোদনই পরিণত হচ্ছে আসক্তিতে। আর সেই আসক্তি থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংকট—কিশোর অপরাধ।
প্রথমে শুরুটা হয় কৌতূহল থেকে। বন্ধুর দেখানো গেম খেলতে খেলতে শিশু বুঝতেই পারে না যে কখন সেটি তার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এরপর আসে অনলাইন ভিডিওর দুনিয়া—যেখানে শিক্ষামূলক বা বিনোদনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অশ্লীল, সহিংস ও মানসিক বিকার সৃষ্টিকারী কনটেন্ট। অপরিণত মস্তিষ্কে এগুলোর প্রভাব মারাত্মক। এভাবেই ধীরে ধীরে তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। হারাচ্ছে মনোযোগ, মূল্যবোধ ও মানবিকতা।
এমনকি গ্রামের উঠতি কিশোরদের মাঝেও এখন টিকটক-লাইকি নিয়ে একধরনের উন্মাদনা দেখা যায়। কেউ নাচের ভিডিও বানাচ্ছে, কেউ অভিনয়ের চেষ্টা করছে, আবার কেউ এসব মাধ্যম ব্যবহার করে টাকার লোভে নানা অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দলবেঁধে আড্ডা দেয়, মাদক গ্রহণ করে, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। অর্থাৎ মোবাইলের অপব্যবহার থেকে তারা সরাসরি অপরাধের জগতে প্রবেশ করছে।
পারিবারিক অসচেতনতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ। অভিভাবকরা ভাবেন, ‘ছেলেটা তো ঘরেই আছে, বিপদ কোথায়?’ অথচ তারা বুঝতে পারেন না যে, শিশুরা ঘরের ভেতর থেকেই ভার্চুয়াল এক জগতে হারিয়ে যাচ্ছে। বইয়ের প্রতি অনাগ্রহ, পড়ালেখায় অনীহা, রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার, সকালে ক্লান্ত ভাব—সবই আসক্তির লক্ষণ।
সন্ধ্যার পর দেখা যায় বাজার কিংবা পাড়ার মোড়ে কয়েকজন কিশোর জড়ো হয়েছে। তাদের হাতে মোবাইল, চোখ স্ক্রিনে, আর কথাবার্তা ও আচরণে প্রকাশ পায় বেপরোয়া মনোভাব। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি অসম্মান দেখাতে শুরু করে। শিক্ষকদের পরোয়া করে না। এমনকি সামান্য বিষয়ে আধিপত্য নিয়ে মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ে।
মোবাইল গেমসের মধ্যে থাকা সহিংসতা বা অপরাধমূলক ভাষা শিশুদের মনে গেঁথে যায়। তারা সেই ভাষা ও আচরণ বাস্তবে প্রয়োগ করতে শুরু করে—কখনো না বুঝেই। এরই মধ্য দিয়ে তারা ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। অনেকেই আবার মোবাইলের খরচ জোগাতে পরিবারের কাছ থেকে টাকা চুরি করে কিংবা বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার দমবন্ধ সময়ে দেশের বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। ৭০ শতাংশ শিশু সেই সময়ে কোনো ধরনের খেলাধুলা বা শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেনি। এর ফলে তারা মানসিকভাবে আরও একাকী, ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী মোবাইল ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়েছে, যেখানে মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী তা ব্যবহার করেছে অনলাইন ক্লাসের জন্য। বাকি সবাই কার্টুন, নাটক, সিনেমা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গেমসেই ব্যস্ত থেকেছে।
এই আসক্তির শারীরিক প্রভাবও ভয়াবহ। আগে যেখানে শিশুদের সাধারণ অসুখের মধ্যে ছিল জ্বর বা ডায়রিয়া, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে মাথাব্যথা, চোখে জ্বালা, দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা, ঘুমের সমস্যা, খিটখিটে মেজাজ ও বিষণ্নতা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ স্মার্টফোনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, ফোন ছাড়া তারা অস্থির হয়ে ওঠে। ফোন না পেলে তারা আতঙ্কিত বা বিচলিত হয়। এটি শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—যেমন ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, হতাশা ও পড়ালেখায় ফলাফলের অবনতি।
তবে স্মার্টফোনকে সম্পূর্ণ নেতিবাচকভাবেও দেখা ঠিক নয়। সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে এটি হতে পারে শেখার ও যোগাযোগের এক কার্যকর হাতিয়ার। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অভিভাবকদের উচিত শিশুর হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে এর সীমা নির্ধারণ করা—সময়, উদ্দেশ্য ও তত্ত্বাবধান।
প্রযুক্তি আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে। আর সেই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো এখন সন্তানদের শিক্ষার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু-কিশোরদের আমরা যদি মোবাইলের দাস নয়, বরং জ্ঞান ও নৈতিকতার সহযাত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলেই সমাজের এই নীরব বিপর্যয়কে রোধ করা সম্ভব হবে।
ডিটেকটিভ ম
অক্টোবর ২০২৫
৩৯
লেখক
কর্মকর্তা
র্যাব সদর দপ্তর, কুর্মিটোলা, ঢাকা
