একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন? এখন সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায়ই শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যার খবর উঠে আসছে। শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রায় প্রতিটি পরিবারের মা-বাবার মুখেই শোনা যাচ্ছে, তাদের সন্তান পড়াশোনায় মনোযোগী নয়। কোনো কিছু শিখতে যে ধৈর্য দরকার, তাতে রয়েছে তাদের অনেক ঘাটতি। অনেক বাচ্চা কথায় কথায় রেগে যায়, অশোভন আচরণ করে কিংবা অল্পতেই অতিরিক্ত অভিমানী হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, শৈশব শেষ হওয়ার আগেই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
আমাদের চারপাশের শিশু-কিশোরদের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে—যে বয়সে তাদের নির্মল ও নিষ্পাপ মনোজগতের অধিকারী হওয়ার কথা, সেই বয়সেই তারা ক্রমেই হয়ে উঠছে অসহিষ্ণু ও নিষ্ঠুর। এদের কেউ মাদকের প্রতি আসক্ত হচ্ছে, কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, এমনকি একে অপরকে হত্যাও করছে। যদিও এসব ঘটনার নেপথ্যের সকল কারণ নির্ধারণ করা সহজসাধ্য নয়, এবং তা বিস্তর গবেষণার বিষয়; তবুও একটি বিষয় এখানে সুস্পষ্টভাবে কাজ করছে। আর তা হলো আমাদের শিশুদের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা ।খোলা মাঠে খেলাধুলার সুযোগ দ্রুত কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকা এই সমস্যার একটি প্রধান কারণ। আমাদের দেশে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। আবাসন ও কৃষির চাহিদা মেটাতে জমির পরিমাণ দিন দিন অপ্রতুল হচ্ছে। প্রকৃতিতে বিচরণের সুযোগও অনেক হ্রাস পাওয়ায় আমরা ক্রমশ প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এই দূরত্ব যত বাড়ছে, ক্ষতির মাত্রা ততই বাড়ছে।প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগহীন শিশুরা বেড়ে উঠছে নানান শারীরিক ও মানসিক সমস্যাকে সঙ্গী করে। এ প্রসঙ্গে রিচার্ড লুভের আলোচিত বই Last Child in the Woods: Saving Our Children from Nature-Deficit Disorder–এর কথা উল্লেখ করা যায়।
তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকার ফলে শিশুদের কী কী মানসিক ও শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। সেগুলোকে তিনি নাম দিয়েছেন “প্রকৃতিবিচ্ছিন্নতা উপসর্গ”। তবে শুধু শহুরে শিশুরাইনয়, যে সকল মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে থাকে, তারাও নানাভাবে এর শিকার হয়। শিশুদের নিয়ে যেহেতু আলোচনা শুরু হয়েছিল, তাই তাদের কথাই বলা যাক।
আমাদের দেশের অধিকাংশ স্কুলে
শিক্ষাগ্রহণ মূলত পাঠ্যবই, ক্লাস
লেকচার, ক্লাসরুম, পরীক্ষা আর
ফলাফল নির্ভর। আমাদের বাচ্চারা
স্কুলে যাচ্ছে, ক্লাস করছে, বাসায়
এসে হোমওয়ার্ক করছে এবং
নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
এতে তারা অনেক কিছু জানতে
পারলেও, সেগুলো সত্যিকার অর্থে
কর্মোপযোগী শিক্ষা হচ্ছে কিনা, তা
ভেবে দেখা প্রয়োজন।
এ দেশে এমন স্কুলের সংখ্যা কম, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দেয়। শহরের অসংখ্য স্কুলে তো খেলার মাঠই নেই। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ শিক্ষাগ্রহণ শিশুদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে, কারণ সেখানে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে।
অন্যদিকে, প্রাকৃতিক ও খোলা পরিবেশে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ; সেখানে শেখা হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এ বিষয়ে গবেষক কাপলান তাঁরThe Experience in Nature: A Psychological Perspectiv এ গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাত্রছাত্রীদের সচেতন প্রয়াস ছাড়াই শেখাতে পারে। শুধু তাই নয়, কাপলানের সঙ্গে আরও দুই গবেষক, বেরম্যান ও জনিডেস Cognitive Benefits of Interacting with Nature-এ প্রমাণ করেছেন যে মুক্ত প্রকৃতিতে বিচরণ করা ছাত্রছাত্রীদের মস্তিষ্ক শহুরে বদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও দক্ষ।এছাড়া, বদ্ধ পরিবেশের বাইরে মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা স্বভাবতই সৃজনশীল হয়। তারা বইপড়া জ্ঞানকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোর পারদর্শিতা অর্জন করে। প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ, ইকোসিস্টেম, পানিচক্র কিংবা পরাগায়নের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো কাছ থেকে দেখা এবং হাতে-কলমে যেকোনো বিষয় শেখার অভিজ্ঞতা শিশুদের বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে সহায়তা করে। এতে তারা বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝে এবং মনে রাখতে পারে।
অ্যাচলি ও স্ট্রেয়ার তাঁদের Creativity in the Wild শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, মাত্র চার দিন প্রাকৃতিক পরিবেশে নিমগ্ন থাকলে শিশুদের সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
তাহলে আমাদের দেশের শিশুদের জন্য করণীয় কী হতে পারে? আমরা আমাদের শহরের শিশুদেরকে গ্রামীণ প্রকৃতির কোলে বড় করতে পারব না, সেটি বাস্তবসম্মতও নয়। কিন্তু এই শিশুদেরকে শহরের ভেতরেই যতখানি সম্ভব উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি। আমাদের স্কুলগুলোতে মাঠে খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি করা, খোলা মাঠে শারীরিক পরিশ্রমের ব্যবস্থা রাখা, স্কুল ভবনের ছাদে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেখানে উন্মুক্ত পরিবেশে কিছু বিষয় হাতে-কলমে শেখানোর মতো উদ্যোগগুলো শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
খেলাধুলা শরীরের রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে; এতে শরীর তুলনামূলক বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। ফলে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়। এই শারীরিক সুস্থতাই স্নায়বিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে যথাযথ রাখে, যা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত বিশ্ব এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেই তাদের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে আউটডোর কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় একে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষত নরওয়ে ও সুইডেনে, আউটডোর কার্যক্রমকে স্কুলের পাঠ্যক্রমে আবশ্যক করা হয়েছে। এই সকল দেশের মতো আমাদের দেশেও এখন সময় এসেছে এই বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখার।
বিশেষত প্রাথমিক স্তরের স্কুলগুলোতে খেলার মাঠে খেলাধুলা এবং ক্লাসরুমের বাইরের পরিবেশে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সুযোগ রাখা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। আমাদের দেশের গ্রামীণ স্কুলগুলোতে মাঠ ও পর্যাপ্ত খোলা জায়গা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। শহরের স্কুলগুলোতে খেলাধুলাকেন্দ্রিক যে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব, সব স্কুল শিক্ষার্থীদের সে সুযোগ দিতে পারছে না।
তাই আমাদের উচিত কেন্দ্রীয়ভাবে এই বিষয়ে যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ করা। উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষকদেরকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং স্কুলগুলোকে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা গেলে আশা করা যায়, আমরা এর দ্রুত ভালো ফল পেতে শুরু করব।
‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’—এটা শুধুমাত্র কবিতার লাইন নয়। এটি একটি চিরাচরিত এবং মহৎ ধারণা। বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি আমাদের জন্য যে পাঠশালাকে উন্মুক্ত করে রেখেছে, সেটিই সেরা ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এই পাঠশালাকে উপেক্ষা করে আমাদের শিশুদের শিক্ষাকে কেবলমাত্র চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানে অসংখ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারা।
তাই আমাদের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদেরকে সুযোগ করে দিতে হবে—দেখে, শুনে, বুঝে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষাগ্রহণ করার। তবেই এ দেশ একদিন মানসিক ও শারীরিকভাবে বলিষ্ঠ একটি সুস্থ-সৃজনশীল আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা করতে পারবে।
লেখক:
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
এপিবিএন হেডকোয়ার্টার
