যদি কেউ সিনেমা দেখতে বসে ঝকঝকে অস্ত্র হাতে, স্যুট পরা সুপার হিরো–ধরনের পুলিশের কাহিনি দেখতে চান তাহলে কান্নুর স্কোয়াড আপনাকে প্রথম ১০ মিনিটেই হতাশ করবে। কারণ এই সিনেমা পুলিশ ফোর্সকে অতিরঞ্জিত বা বীরত্বপূর্ণ আঙ্গিকে দেখায় না। বরং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাজের প্রকৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং ভুল করার আশঙ্কা নিয়ে দায়িত্ব পালন করা মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। এখানে তদন্তকারীরা আধুনিক দৃষ্টিনন্দন সদর দপ্তর বা উচ্চ বাজেটের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; পুরোনো টাটা সুমো গাড়ি, সস্তা থাকার জায়গা এবং চলার পথে পাওয়া খাবার নিয়েই তাদের বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়। গল্পের শুরুতেই স্পষ্ট—পুলিশ বিভাগের উচ্চপর্যায়ে কান্নুর স্কোয়াডকে নিয়ে দ্বিমত তীব্র। কেউ তাদের অসম্ভব কেস সমাধানের দক্ষুতার জন্য শ্রদ্ধা করে, আবার কেউ তাদের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা ভয় পায় বা খারাপ চোখে দেখে আর সবচেয়ে বড় ক্ষত এই স্কোয়াডের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ, যা এই স্কোয়াডের সম্মানকে প্রতিদিন নতুন করে আস্তাকুড়ে ফেলে দেয় এবং যেকোনো সময় দলটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার হুমকি তৈরি করে।
এই স্কোয়াডের নেতৃত্বে আছেন এএসআই জর্জ মার্টিন—মুখে ক্লান্তির রেখা, চোখে অভিজ্ঞতার কঠোরতা, আর ভেতরে বহুদিনের দহন। সততা নিয়ে ওঠা পুরোনো অভিযোগটা তাঁর জীবন থেকে কখনো মুছে যায়নি; তাই এই কেস তাঁর কাছে শুধু ডিউটি নয়, নিজের মর্যাদা ফেরানোর শেষ লড়াই। তার সঙ্গে আছে আরও তিনজন—জোসে, জায়ান এবং শাফি। বাইরে থেকে সবাই একই ইউনিফর্ম, কিন্তু ভেতরে প্রত্যেকে নিজের যুদ্ধ বহন করে চলে। জোসে সংসারের ভাঙনের ভয় নিয়ে বাঁচে, ঘরে শান্তি নেই তাই কাজে ডুবে থাকে। জায়ান সারাক্ষণ হিসেব করে — কীভাবে মেয়ের পড়াশোনার খরচ সামলাবে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে তার দুশ্চিন্তা তাকে নিরব করে রাখে। আর শাফি—পরিবার থেকে দূরে থাকার অভ্যাসে ক্লান্ত, তবু পেশার প্রতি দায়বদ্ধতায় কোনও অভিযোগ উচ্চারণ করতে পারে না। একেকজনের জীবনে আলাদা চাপ, আলাদা ক্ষত — তবু কাজে নামলে তারা এক হয়ে যায়। ব্যক্তিগত সংকট, ঘরের দুঃখ বা মানসিক ক্লান্তি কেউই সামনে আনে না; সবার একটা নীরব বোঝাপড়া আছে — ইউনিফর্ম পরার পর ব্যক্তিগত দুর্বলতা আর গোনে না। কষ্ট থাকুক, অনিশ্চয়তা থাকুক, তবু ময়দানে নামতেই হবে — কারণ যা করার দায়িত্ব তাদের ওপর, সেটা অন্য কেউ করবে না।
এমন সময় আসে এক কেস—দৃশ্যত স্রেফ খুন ও ডাকাতি, কিন্তু রাজনীতিবিদের বাড়িতে ঘটায় পুরো রাজ্য উত্তাল হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম চাপ দিচ্ছে, তদারকির পরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি বিব্রত, আর অন্য কোনো টিম কোনও সূত্র খুঁজে পাচ্ছে না। শেষ ভরসা হিসেবে কান্নুর স্কোয়াডকে মাঠে ফেরানো হয়—এমন শর্তে, দশ দিনের মধ্যে অপরাধীদের না ধরতে পারলে দলটি কার্যত শেষ। এটা শুধু তদন্ত নয়; এটা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
তদন্তের শুরুটা ছিল ধীর-স্থিরভাবে। কোনো জোরালো অভিযান বা দ্রুত একশন নয় — স্কোয়াড শুরু করল ফোন রেকর্ড, কল তালিকা এবং ডেটা মিলিয়ে দেখা দিয়ে। ছোট ছোট তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যখন জোড়া লাগে, তখন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়, এবং সেখান থেকেই যাত্রার দিক নির্ধারিত হয়। এরপর শুরু হয় রাস্তায় সময় কাটানো। এক জেলা থেকে আরেক জেলা, পরে রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে কাজ করতে হয়। নতুন ভাষা, আলাদা সংস্কৃতি এবং সন্দেহপ্রবণ মানুষের মুখে পড়তে হয় বারবার। বিশ্রামের জন্য আলাদা সময় বা জায়গা থাকে না ঘুম হয় গাড়িতেই, ভোরের নাশতা রাস্তার দোকানে, দুপুরের খাবার চলার পথে। অফিসিয়াল সুবিধা নেই, প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা কখনো প্রশাসনিক জট, কখনো ভুল তথ্য, আবার কখনো রাজনৈতিক চাপ। চাপ বাড়লে মানুষের মেজাজও প্রভাবিত হয়। ক্লান্তি জমে, মতবিরোধ তৈরি হয়, তর্কও হয়। কারও ব্যক্তিগত সমস্যা, কারও পরিবারের দূরত্ব, কারও ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা — সব মিলিয়ে সম্পর্ক খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তবুও কাজ থামেনি। লক্ষ্যই তাদের একমাত্র সংযোগ হিসেবে কাজ করেছে। ব্যক্তিগত মতানৈক্য থাকলেও কাজের জায়গায় সবাই জানত — দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই ধাওয়া শেষে গিয়ে পৌঁছায় উত্তর প্রদেশের প্রত্যন্ত এক গ্রামে। এমন এলাকা যেখানে আইন বইয়ের শব্দ মাত্র, বাস্তবে ক্ষমতার ভিন্ন নিয়ম চলে। অচেনা ভাষা, অচেনা ভূখণ্ড, আর সন্দেহে জর্জরিত গ্রামের লোকজন—এখানে তাদের লড়াই শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে নয়, পুরো পরিবেশের বিরুদ্ধেও। সেই মুখোমুখি সংঘর্ষে বীরত্বের আবেগ নেই, আছে বাস্তবের নোংরা, হিংস্র, অবসন্ন যুদ্ধ—যেখানে জয় মানে বেঁচে থাকা।
শেষ পর্যন্ত স্কোয়াড অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে ফিরিয়ে আনে। ঘটনাটি নিয়ে কোনো বড় উদযাপন হয় না, তারা আলোচনার কেন্দ্রেও আসে না। ডিউটি শেষে তারা যেভাবে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে — সেটাই দৃশ্যের সারাংশ। কাজ সম্পন্ন হয়, আর তারা নীরবে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম ও ঝুঁকি সত্ত্বেও তাদের অর্জন মূল্যায়িত হয় সংক্ষিপ্ত স্বীকৃতি দিয়ে, তবে সেটাই তাদের কাছে যথেষ্ট। এবং এখানেই কান্নুর স্কোয়াড একটি স্পষ্ট বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, যারা মাঠে কাজ করে, তারা অধিকাংশ সময় পরিচিত মুখ নয়। প্রচারের আলো পুলিশ বাহিনীর নির্দিষ্ট অংশকে ঘিরে থাকলেও, নিরাপত্তার মূল ভার বহন করে সেই অফিসাররা, যারা রাতভর পথে থাকে, তদন্তে বারবার নতুন করে শুরু করে, পরিবারের থেকে দূরে থাকে এবং চাপের মধ্যে কাজ চালিয়ে যায়। তাদের কাজের প্রকৃতি ত্যাগী, কিন্তু তা সাধারণত চোখে পড়ে না।
সিনেমা শেষে মনে থাকে এই উপলব্ধি—ন্যায়বিচারের পথ খুব কমই দৃশ্যমান, কিন্তু তা নির্মিত হয় নিরবচ্ছিন্ন শ্রমে। আর বীরত্ব এখানে কোনো আলাদা পরিচয় নয়; এটি দায়িত্ব পালনের এক স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
টেকনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি
কান্নুর স্কোয়াড–এর শক্তি শুধু গল্পে নয়, এর নির্মাণভঙ্গিতেও। সিনেমাটির ক্যামেরা ও এডিটিং ইচ্ছাকৃতভাবে ঝকঝকে রাখা হয় নি, বরং হ্যান্ডহেল্ড শট, প্রাকৃতিক আলো এবং দীর্ঘ ট্রাভেল সিকোয়েন্স ব্যবহার করে ক্লান্তি, সময়ের চাপ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দর্শকের শরীরে টেনে আনা হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সংযত; উত্তেজনা তৈরি করে এমন পরিস্থিতি, শব্দের মাধ্যমে অতিরঞ্জিত নয়। অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দ্রুত কাট বা স্টাইলাইজড নয়, বরং ধীর, ভারী ও বাস্তব—যা পুলিশি অভিযানের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
ট্রেইলার লিংক: Kannur Squad Official Trailer | Mammootty | Roby Varghese Raj | Sushin Shyam | Mammootty Kampany
কোথায় দেখবেন
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: ডিজনি প্লাস হটস্টার (Disney+ Hotstar)
রানটাইম: প্রায় ১৬০ মিনিট
ভাষা: হিন্দি, তামিল, তেলেগু
ধরন (Genre): ক্রাইম থ্রিলার, পুলিশ প্রসিডিউরাল
প্রধান অভিনয়শিল্পী: মামুট্টি , রনি ডেভিড রাজ, শাবরীনাথ, আজিথ কল্লাই, আর. শচিন
