বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে আমার পথচলা প্রায় এগারো বছরের। সময়টা যে খুব বেশি, তা নয়। আবার একেবারে কমও না। মাঝেমাঝেই আমি আমার এই এগারো বছরের কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকাই। তখন আমার বিগত জীবনের স্মৃতিগুলোকে নক্ষত্রভরা আকাশের মতো মনে হয়। এর কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট। কোনোটা খুব উজ্জ্বল, কোনোটা আবার শুধু মিটমিট করে জ্বলে।
এর মধ্যে একটা নক্ষত্র আছে, যেটা অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই ঝলমলে। সেটি হলো ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আমার প্রায় সাড়ে ষোল মাসের কর্মকাল। এই সময়টায় আমি একজন শান্তিরক্ষী হিসেবে কঙ্গোয় কর্মরত ছিলাম। দেশটির পুরো নাম ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো।
আমাদের রোটেশন ছিল কঙ্গো ফর্মড পুলিশ ইউনিটসের (এফপিইউ) চৌদ্দতম রোটেশন। প্রতিটি রোটেশনের কার্যক্রম প্রায় একই রকম। একটির সঙ্গে অন্যটিতে অভিজ্ঞতার পার্থক্যও তেমন নেই। তবে অনেকের তুলনায় আমার অভিজ্ঞতা একটু আলাদা ছিল। এর কারণ হলো, কঙ্গোয় বাংলাদেশের এফপিইউ সদস্যরা সাধারণত কিনশাসায় অবস্থান করে। এটি কঙ্গোর রাজধানী শহর।
এই শহরের নিরাপত্তাবেষ্টিত ইনকাল সুপার ক্যাম্পে বাংলাদেশ পুলিশের ক্যাম্প ছিল। বলা যায়, এটি তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ একটা জায়গা। অবশ্য এই শান্তির পরিমাণ খুব বেশিও নয়। রাজধানী শহর হওয়ায় লোকজন আছে, দোকানপাট আছে, চলার পথে ঢাকা শহরের মতো ট্র্যাফিক জ্যাম আছে। বাজারঘাট, হৈ-হুল্লোড় আছে। ছোট-বড় অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনাও আছে। সব মিলিয়ে আমাদের ঢাকা শহরের কাছাকাছি পরিবেশ। নতুনত্বের তেমন কিছু নেই।
এই ক্যাম্পটিতেই আমাদের কনটিনজেন্টের প্রায় সবার মিশনের পুরো সময় কেটেছে। তবে কিনশাসার বাইরে যে তিনজন কমান্ড স্টাফের কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, তার মধ্যে আমি একজন ছিলাম। আমি প্রায় ছয় মাস কিনশাসা থেকে ১১০০ কিলোমিটার দূরে কানাঙ্গায় কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
কানাঙ্গা কঙ্গোর একটি প্রদেশ। নামটা শুনলেই কেমন যেন ভয়ের অনুভূতি জাগে। কেননা একের পর এক ভয়াবহ কাহিনি ঘটে গেছে সেখানে। খুব অস্থির আর অশান্ত অঞ্চল। সহিংসতার ছড়াছড়ি। কিছু হলেই স্থানীয় গোত্রের এক দল আরেক দলের গলা কেটে ফেলে। একে অপরের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।
শান্তিরক্ষীরাও এই নির্মমতা থেকে রক্ষা পায়নি। তাদের অনেককে এই সহিংসতায় জীবন দিতে হয়েছে। এমন জায়গায় যাওয়ার কথা শুনে অনেকে আমাকে বলল,
“ওখানে যাচ্ছ কোন দুঃখে? কামিনা-নাসাপুরের কথা শোনোনি? খুব ভয়ংকর তাদের গ্রুপ। এরা মানুষের গলা কেটে ফেলে!”
আমি তাদের কথা শুনে মাথা নাড়তাম, নিরুত্তর থেকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। কেমন যেন ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছুঁয়ে যেত শরীরে। অথচ টের পেতাম, মনের গহিনে কোথাও একটা শিহরণ জাগছে। ভয় আর রোমাঞ্চ মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
সেই টানেই একদিন ভয়, দ্বিধা, সংশয়—সব পাশ কাটিয়ে সিও স্যারকে বলেই ফেললাম,
“স্যার, প্লিজ আমাকে পাঠান কানাঙ্গায়।”
কেন বলেছিলাম—জানি না। আসলে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত যুক্তি দিয়ে হয় না। মনে হয় করতে হবে, তাই করি। এটাও বোধহয় তেমনই একটি সিদ্ধান্ত ছিল।
আমার মনে আছে, এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে এক বন্ধু আমাকে বলেছিল,
“তুমি কি বোকা? মনে রেখো, বোকার সাহস কিন্তু ভয়ংকর জিনিস।”
আমি সেদিন তার কথার কোনো উত্তর দিইনি, শুধু হেসেছিলাম।
আমার যাওয়া হবে কি হবে না—তা নিশ্চিত নয়, এমনই সময়ে সিও স্যার একদিন আমাকে ডেকে বললেন,
“ফারিয়া, তোমাকে কানাঙ্গায় পাঠাচ্ছি।”
কথাটি শুনেই খুশিতে লাফ দিলাম। আমার এত আনন্দ দেখে স্যার বললেন,
“তুমি খুশিতে আগেই লাফিও না। আগে কারণটা শোনো কেন পাঠাচ্ছি। আমি দেখেছি, ক্যাম্পে তুমি নিশাচরের মতো রাতে হাঁটো, আবার খুব ভোরে উঠে পড়ো। ঘুরে বেড়াও। তোমার এই অভ্যাস আমাদের কাজে লাগবে। আর তোমার ফায়ারিং পারফরম্যান্স ভালো। যদি কোনো দিন দরকার পড়ে, তখন তোমার এই স্কিলও কাজে লাগতে পারে।”
স্যারের কথায় সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। আমার কোনো বিশেষ স্কিল বা গুণের কথা উনি বলেছেন, সেটা শুনে নয়। খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমি যাচ্ছি এক নতুন জায়গায়, যেখানে গেলে এক সত্যিকারের আফ্রিকা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। যে আফ্রিকার পরিচয় মিলেছে নানা বইপত্রের গল্পকথায়—বিশেষত বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়ে।
তবে হ্যাঁ, কেবল আনন্দই নয়। সেই আফ্রিকার কথা এবং সেখানে এক প্লাটুন ফোর্সের দায়িত্ব নেওয়ার কথা চিন্তা করে আমার একটু ভয়ও লাগছিল। কিন্তু ভয়টাকে পাত্তা দিতে চাইছিলাম না একটুও।
আসলে জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোর জন্য কোনো প্রস্তুতি থাকে না, কোনো গাইডলাইনও না। তবু মানুষ এগিয়ে যায়। আমিও এগিয়েছিলাম। এই এগিয়ে চলার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি ছিল আফ্রিকা দেখার প্রবল ইচ্ছে, কিংবা হতে পারে একটা অচেনা পৃথিবীতে পা রাখার দুর্বার নেশা।
কানাঙ্গা ক্যাম্পে কাজের পরিবেশ ছিল কিনশাসার থেকে ভিন্ন। একই ক্যাম্পে পাশাপাশি ঘরে আমরা কখনো ঘানার মানুষদের সঙ্গে থেকেছি, আবার কখনো থেকেছি সেনেগালিজদের সঙ্গে। এমন মেলামেশার সুযোগ কিনশাসার ইনকাল ক্যাম্পে ছিল না। কানাঙ্গায় আমরা একসঙ্গে থেকেছি, খেয়েছি, কাজ করেছি। একসঙ্গে গল্পগুজব করেছি।
তাদের ভাষা ফ্রেঞ্চ। ইংরেজি বলতে পারে না। আর আমাদের ভাষা বাংলা। অনেক সময় আড্ডায় কেউ কারো ভাষা বুঝতে পারেনি। তবে হাসি বুঝেছি। আর পারস্পরিক ভালো বোঝাপড়ায় সেই হাসিটুকুই যথেষ্ট ছিল।
কানাঙ্গায় বহুজাতিক মানুষের সঙ্গে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। সেখানকার কর্মপরিবেশ দেখে আমার মনে হতো—জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে যেন একটা জ্যামিতির ক্লাস চলছে আমাদের চারপাশে। আর সেই ক্লাসে আমরা সবাই একসঙ্গে বসতাম একটাই পরিচয়ে। পরিচয়টির নাম শান্তিরক্ষী।
জাতিসংঘ মিশনে ইউনিফর্ম যার যার দেশের হলেও সবাই একই রঙের নীল হেলমেট পরে। এই নীল হেলমেটটির একটা অসাধারণ ব্যাপার আছে। এটা শান্তিরক্ষীদের দেশের নাম আর জাতীয়তাকে মুছে দিত না, কিন্তু তাদের ভেতরকার সীমারেখাগুলোকে মুছে দিত—সচেতনভাবে।
কানাঙ্গায় আমাদের ক্যাম্পটি বেশ অনিরাপদ ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে ছিল কিছু অপ্রতুল কাঁটাতারের বেড়া আর আমাদের পায়ের শব্দ। ক্যাম্পের চারপাশে ছিল জঙ্গল, বড় বড় ঘাস। সেসবের মাঝে চলাফেরা করতে গেলে মাঝে মাঝে অচেনা গন্ধ পেতাম। প্রায়ই বিষধর সাপের দেখা মিলত। স্থানীয় বাজারে কার্বলিক অ্যাসিড আর অ্যান্টিভেনম পাওয়া যেত না। দেশ থেকে নিয়ে আসতে হতো।
অন্যদিকে প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ছিল কিনশাসার চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে কানাঙ্গায় সবার মনে মনে ভয় ছিল, কিন্তু ভয়টা কারও মুখে ফুটে উঠত না।
ক্যাম্পের অপ্রতুল কাঁটাতারের বেষ্টনীর কারণে ক্যাম্পে আক্রমণের ঝুঁকি ছিল। তাছাড়া মাঝেমাঝেই খবর আসত—অমুকের বাড়ি চুরি হয়েছে, অমুকের বাসায় ডাকাতি। এমন ঘটনা ঘটলেই মিশন হেডকোয়ার্টার থেকে মিটিংয়ের ডাক আসত।
সেই মিটিংয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মুখ গম্ভীর করে বলতেন,
“ক্যাম্পের সিকিউরিটি বাড়ান।”
আমরা মাথা নেড়ে বলতাম, “বাড়াব।”
কিন্তু কতখানি বাড়ানো সম্ভব!
তাদের চাপ আর আমাদের সীমাবদ্ধতা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের এক ধরনের অদৃশ্য সেতু বানাতে হতো। ওই সেতুই ছিল আমাদের দায়িত্বের আসল মাপকাঠি।
সেই মাপকাঠি দিয়ে আমরা সবাই আমাদের দায়িত্ব পালনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। আমাদের চোখে রোদ পড়েছে, গায়ে বৃষ্টি, তবু সময়মতো সবাই যার যার ডিউটিতে চলে গিয়েছি। নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি।
জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যদের বিশেষ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে মোনাস্কো (অর্থাৎ কঙ্গো) নারী সদস্যদের অবদানের বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। ফিমেইল কনটিনজেন্ট হওয়ায় আমাদের কনটিনজেন্টে নারী সদস্যের সংখ্যা পুরুষের প্রায় সমান ছিল। সব রকম দায়িত্বে নারী সদস্যদের সরব উপস্থিতি ছিল।
যাদের মিশন অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা জানেন—মিশনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকার কষ্ট সহ্য করা। আমি মনে করি, নারী ও পুরুষ সদস্যদের জন্য এই কষ্ট একরকম নয়। যে নারী বাড়িতে শিশুসন্তান রেখে এসেছে, নিঃসন্দেহে তার জন্য মিশন সবচেয়ে কঠিন।
কিন্তু আমার কনটিনজেন্টের মেয়েদের দেখে সেটা বোঝার উপায় ছিল না। সেখানে সব মেয়ের কর্মস্পৃহা আর মনোবল দেখে আমি মুগ্ধ হতাম। নিজের আবেগ, খারাপ লাগাকে তারা চমৎকার করে সামলে নিয়েছিল। তারা যেন জানত—এই মাঠে সে কেবল একজন মা নয়, সে একজন শান্তিরক্ষী, একজন অফিসার।
একবার এক মিটিংয়ে এক জর্ডানিজ সহকর্মী আমাদের বলল,
“তোমাদের কনটিনজেন্টে এত বেশি মেয়ে! আর সবাই এত ডিউটি করে। কীভাবে এত অ্যাকটিভ আর সিস্টেমেটিক তোমাদের মেয়েরা?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“আমাদের দেশের মেয়েরা ঘরের ভেতর মেয়ে থাকে শুধু। ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে ডিউটি করতে যাওয়ার সময় মেয়েগুলো ভুলে যায় যে তারা মেয়ে!”
পরিবার ছেড়ে, নিজের দেশ ছেড়ে, ভিনদেশে প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘকাল কাটানোর এই চ্যালেঞ্জ অনেক নারী নিতে চান না। কিন্তু আমি মনে করি, যাদের মিশন অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা ভাগ্যবান।
কারণ মিশনে যাওয়া মানে শুধু বিদেশযাত্রা নয় কিংবা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া নয়। মিশনে যাওয়া মানে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে শেখা। সর্বোপরি নিজের জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করা। এটাই মিশনের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
তাই আমি যদি বলি, পুলিশে চাকরি করে কেউ যদি মিশনে না যায়, তাহলে সে শুধু ইউনিফর্মটাই পরেছে, কিন্তু তার ভেতরের পুলিশসত্তার পূর্ণতা ঘটেনি—তাহলে বোধহয় ভুল কিছু বলা হবে না।
নিজের ছোট্ট একটা উপলব্ধি দিয়ে শেষ করি। আমাদের জীবন তো সময়ের সমষ্টি। আর কারো জীবনেরই সকল সময় একরকম গুরুত্ব বহন করে না। কখনো কখনো মানুষ এমন কোনো সময়ের মধ্যে বেঁচে থাকে, যে সময়টি হয় কর্মে ও অভিজ্ঞতায় অনন্য।
যে সময়ের স্মৃতিচারণ তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়, তাকে আজীবন বেঁচে থাকার রসদ জোগায়।
শান্তিরক্ষী হিসেবে আমার কাজ করার সমগ্র অভিজ্ঞতা—বিশেষ করে কানাঙ্গার স্মৃতিকে আমি এভাবেই মনে রেখেছি। কানাঙ্গা আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। কানাঙ্গা আমার জীবন-আকাশের এমন একটি নক্ষত্র, যা এতদিন পরেও পূর্ণ দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে—একটু বেশি আলোয়।
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
ঢাকা
