শুক্রবার, এপ্রিল ১০, ২০২৬
30 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঐতিহ্যের ধারাকে-৯ ইউনিট:আধুনিক পুলিশিংয়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী

কে-৯ ইউনিট:আধুনিক পুলিশিংয়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী

মো: নাজমুল হাসান
,

আধুনিক পুলিশিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হলো ডগ স্কোয়াড বা কে-৯ ইউনিট। মানুষের সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে ঘ্রাণশক্তি ও দ্রুত পরিস্থিতি অনুধাবনের ঘাটতি পূরণে এই কুকুরগুলো অসাধারণ ভূমিকা রাখে। অপরাধী শনাক্তকরণ, মাদক ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এরা মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। বিশ্বব্যাপী অন্যান্য দেশের মতো, বাংলাদেশেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কে-৯ ইউনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিশ্বজুড়ে ডগ স্কোয়াডের ঐতিহাসিক বিবর্তন

আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কুকুরের ব্যবহার হাজার হাজার বছর আগে শুরু হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার শুরু হয় ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে, যখন ফ্রান্সের সেন্ট মালোতে বন্দর ও ডক সুরক্ষিত করতে প্রহরী হিসেবে কুকুর ব্যবহার করা হতো। তবে আধুনিক পুলিশ ডগ স্কোয়াডের ধারণা বিকশিত হয় উনিশ শতকের শেষে। ১৮৮৮ সালে কুখ্যাত জ্যাক দ্য রিপার-এর অনুসন্ধানের সময় ব্রিটিশ পুলিশ প্রথমবারের মতো অপরাধী ধরতে কুকুর ব্যবহারের অনুমতি পায়, যা আধুনিক পুলিশি প্রশিক্ষণের পথ প্রশস্ত করে।

এর ধারাবাহিকতায়, ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামের ঘেন্ট শহর বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কে-৯ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে। এই কেন্দ্রটিই প্রথম কুকুর ও হ্যান্ডলারকে একটি একক দল হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী একটি আদর্শ মডেল হিসেবে গৃহীত হয়। এরপর ১৯০৭ সালে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (NYPD) যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রথম কেনাইন কোর প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে জার্মানির গ্রিনহাইডে একটি ডগ ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়, যা গন্ধ শনাক্তকরণ, আনুগত্য এবং আক্রমণে প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি স্থাপন করে।

তবে, বিশ্বব্যাপী ডগ স্কোয়াডের ইতিহাস একটি দ্বিমুখী চিত্র তুলে ধরে। একদিকে এটি অপরাধ দমনের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, অন্যদিকে এটি বিতর্কিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডগ স্কোয়াডের ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। সেসময়কার নাগরিক অধিকারকর্মীদের মতে, বর্ণবৈষম্য প্রতিরোধের আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ কুকুর ব্যবহার করা হতো শহুরে বিশৃঙ্খলা প্রশমিত করার জন্য। ১৯৬৩ সালে আলাবামার বার্মিংহামে নাগরিক অধিকার বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কুকুরের আক্রমণ সেই সময়ের জাতিগত উত্তেজনার এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছে। এটি দেখায় যে ডগ স্কোয়াডের ব্যবহার শুধু অপরাধ দমনের কৌশলগত বিষয় নয়, বরং এর ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে।

আধুনিক পুলিশ কুকুরের প্রশিক্ষণ ও প্রজাতি: প্রযুক্তি, কৌশল এবং বিশেষীকরণ

আধুনিক পুলিশিংয়ে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির কুকুর তাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। এদের মধ্যে জার্মান শেফার্ড, বেলজিয়ান ম্যালিনয় এবং ল্যাব্রাডর রেট্রিভার অন্যতম।

জার্মান শেফার্ড: এদের বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বস্ততা এবং কাজ করার প্রবল মানসিকতার কারণে এরা বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয় পুলিশ কুকুর হিসেবে পরিচিত। এরা মূলত ক্রাইম ট্র্যাকার এবং সাধারণ টহল কাজে ব্যবহৃত হয়।

বেলজিয়ান ম্যালিনয়: এই প্রজাতিটি জার্মান শেফার্ডের তুলনায় ছোট ও ক্ষিপ্র। এদের উচ্চ-শক্তির প্রকৃতি, গতি এবং বুদ্ধিমত্তা বিস্ফোরক শনাক্তকরণ, অপরাধী আটক এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য আদর্শ।

ল্যাব্রাডর রেট্রিভার: এদের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং এদের মেজাজ শান্ত হওয়ায় মাদক, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ দ্রব্য শনাক্তকরণে এরা বিশেষভাবে পারদর্শী।

এছাড়াও, কিছু বিশেষ কাজের জন্য অন্যান্য প্রজাতিও ব্যবহৃত হয়। যেমন, ব্লাডহাউন্ডের (Bloodhound) অবিশ্বাস্য ঘ্রাণশক্তির কারণে এদের ব্যবহার আইনত গ্রহণযোগ্য। ডাচ শেফার্ড (Dutch Shepherd) এবং ডোবারম্যান পিনশার (Doberman Pinscher) তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং আগ্রাসী অথচ সুশৃঙ্খল স্বভাবের জন্য পুলিশিংয়ে ব্যবহৃত হয়।

প্রশিক্ষণের আধুনিক পদ্ধতি

পুলিশ কুকুরের প্রশিক্ষণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা সাধারণত আট মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপে কুকুর নয়, বরং এর হ্যান্ডলারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একজন হ্যান্ডলারকে কে-৯ ইউনিটে যোগ দেওয়ার আগে পুলিশ একাডেমির প্রশিক্ষণ এবং এক থেকে দুই বছরের টহল অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।

আধুনিক প্রশিক্ষণে কুকুরকে একক উদ্দেশ্য (single-purpose) বা দ্বৈত উদ্দেশ্য (dual-purpose) হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। একক উদ্দেশ্য কুকুরগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট কাজে (যেমন: শুধুমাত্র ট্র্যাকিং বা শুধুমাত্র শনাক্তকরণ) দক্ষ হয়। অন্যদিকে, দ্বৈত উদ্দেশ্য কুকুরগুলো টহল, সুরক্ষা, ট্র্যাকিং এবং মাদক বা বিস্ফোরক উভয়ই শনাক্ত করতে পারে।

একসময়কার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট জনরোষ ও বিতর্কের প্রতিক্রিয়ায় আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতিগুলো আরও বেশি নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলোতে কুকুরকে আক্রমণ বন্ধ (“Out”) করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড শেখানো হয়—এমনকি যখন কুকুরটি উত্তেজিত থাকে। এই প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে যে, পুলিশ কুকুর একটি সুশৃঙ্খল, নিয়ন্ত্রিত এবং বুদ্ধিভিত্তিক সহায়ক সরঞ্জাম।

বাংলাদেশের ডগ স্কোয়াড: সূচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ

বাংলাদেশে ডগ স্কোয়াডের ব্যবহার একটি বিকেন্দ্রীভূত ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ডগ স্কোয়াডের যাত্রা শুরু হয় ১২টি জার্মান শেফার্ড ও ১৩টি ল্যাব্রাডর রেট্রিভার কুকুর নিয়ে। এর পর ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট ৪০টি কুকুর নিয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-এ ডগ স্কোয়াড যুক্ত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী ডগ স্কোয়াড তৈরি করছে। ২০১৭ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) দুটি ল্যাব্রাডর, দুটি জার্মান শেফার্ড এবং চারটি ম্যালিনয় কুকুর নিয়ে তাদের নিজস্ব কে-৯ ইউনিট চালু করে। ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৬৬-তে উন্নীত করার একটি পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) নেদারল্যান্ডস থেকে আনা ৯টি কুকুর (৫টি বিস্ফোরক এবং ৪টি মাদক শনাক্তকরণে পারদর্শী) নিয়ে কে-নাইন ইউনিট চালু করেছে।

সরকারি সংস্থা ছাড়াও, বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান যেমন এলিট ফোর্স এবং এইজিসও ডগ স্কোয়াড পরিচালনা করে। এলিট ফোর্সের ৩৫টি কুকুরের একটি ইউনিট রয়েছে, যা সিলেটে ব্যবহৃত হচ্ছে। এইজিস সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, যা তাদের প্রশিক্ষণের মানের একটি ইতিবাচক দিক।

ইউনিট সংখ্যা ও কুকুরের সংখ্যা

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোতে ডগ স্কোয়াড এককভাবে পরিচালিত না হয়ে বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত। এর ফলে, প্রতিটি ইউনিটের নিজস্ব কর্মপরিধি ও সক্ষমতা রয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও হ্যান্ডলার ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের ডগ স্কোয়াডের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্র থেকেই প্রভাবিত। সম্প্রতি, দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে পুলিশ কর্মকর্তারা ইতালি ও নেদারল্যান্ডস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ৭ জন মহিলা সদস্য কে-৯ ডগ হ্যান্ডলার কোর্স সম্পন্ন করে এই টিমে যুক্ত হয়েছেন, যা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিমানবন্দর নিরাপত্তা এবং কাউন্টার টেরোরিজমের মতো বিশেষায়িত চাহিদা মেটাতে ডগ স্কোয়াডের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, বিদেশি কুকুর ও প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা এবং এই বিকেন্দ্রীকরণ একটি সমন্বিত, জাতীয় প্রশিক্ষণ কাঠামোর অভাবকে তুলে ধরে। একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হলে প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন করা সম্ভব হবে।

ব্যবহার ও প্রয়োগ

ডগ স্কোয়াডগুলো মূলত বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ, ভিআইপি নিরাপত্তা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানগুলোতে তল্লাশি, অপরাধ দমন এবং নিখোঁজ ব্যক্তি অনুসন্ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও, জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ অভিযানে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই কুকুরগুলো তাদের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি এবং শ্রবণশক্তির কারণে দ্রুততার সাথে কার্যকর ফলাফল প্রদান করতে সক্ষম।

কুকুরগুলোর পরিচর্যা ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা

পুলিশ ডগ স্কোয়াডের কার্যকারিতা কেবল প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তাদের সঠিক বাসস্থান, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপরও নির্ভর করে। তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কলকাতা পুলিশের ডগ স্কোয়াডের জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হয়, যাতে সবজি, ডিম, মাংস, দই এবং উচ্চ প্রোটিনযুক্ত শুকনো খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাংলাদেশেও এই কুকুরগুলোর দৈনন্দিন পরিচর্যায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডগ স্কোয়াডের জন্য একটি আধুনিক দ্বিতল ভবন তৈরি করা হয়েছে, যেখানে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্রুমিং স্পেস, রান্নাঘর, শাওয়ার এবং প্রশিক্ষণের জন্য খোলা মাঠ রয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়োপযোগী চিকিৎসাও অপরিহার্য। বিদেশে অনেক ক্ষেত্রে হ্যান্ডলাররা তাদের কুকুরের সাথেই থাকে, যা তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে এবং যেকোনো সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট ভেটেরিনারি ব্যবস্থা না থাকলেও, বেসরকারি ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলো তাদের চিকিৎসার জন্য একটি সহায়ক উৎস হতে পারে। এভাবে কুকুরের যত্নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, যা তাদের সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি কার্যকর ডগ স্কোয়াড গড়ে তোলার জন্য শুধুমাত্র প্রশিক্ষণই যথেষ্ট নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত এবং লজিস্টিক সাপোর্ট সিস্টেম থাকা অপরিহার্য।

লেখক
অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার
বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট
স্পেশাল একশন গ্রুপ, সিটিটিসি,
ডিএমপি, ঢাকা

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ