সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
25 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপুলিশি সংস্কারপুলিশ বাহিনীকে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ঐতিহাসিক বার্তা

পুলিশ বাহিনীকে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ঐতিহাসিক বার্তা

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

পুরোনো চিন্তা ও অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা এবং পুলিশ সমার্থক। যখন আইনের অনুপস্থিতি থাকে, তখন সরকার, গণতন্ত্র, অধিকার, জনগণ, নাগরিক—কোনো কিছুই টিকতে পারে না। সম্মুখসারির শক্তি হিসেবে পুলিশ উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করলেই কেবল সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। আইন ও শৃঙ্খলা ব্যতিরেকে যতই উন্নত চিন্তা থাকুক, পর্যাপ্ত অর্থ থাকুক—কোনো কাজই সফল হবে না।

রাষ্ট্র ও সমাজে পুলিশের ভূমিকা এবং তার গুরুত্বকে এভাবেই তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে ১৭ মার্চ ২০২৫, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

সরকার যা কিছুই করতে চায় না কেন, যেভাবেই করতে চায় না কেন—শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাত দিয়েই করতে হয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, তারা একটি পরিবেশ তৈরি করে দেয়; যা না থাকলে কোনো কাজই হয় না। এই উপলব্ধি থেকেই সারাদেশের পুলিশ সুপারদের সঙ্গে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার এই বৈঠক।

বৈঠকের শুরুতেই সবার সঙ্গে বসতে পেরে তাঁর ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে এখনো বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। তাই এই সুযোগ যাতে কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়, তার ওপর জোর দেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা।

তাঁর ভাষায়, এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি আমরা আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি, যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। এই যে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম—এটি একটি আনন্দের সংগ্রাম, কোনো কষ্টের সংগ্রাম নয়। যত আমরা এগিয়ে যাব, ততই আনন্দ পাব, তৃপ্তি পাব; নিজেদের সন্তানদের সাথে কথা বলতে আনন্দ পাব যে আমরা একটি মহৎ কাজ করছি।

সবার চোখেই এখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। এটা যে কেবল কথার কথা নয়, তা স্মরণ করিয়ে দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আমরা একে নতুন বাংলাদেশ বলি এই কারণে যে পুরনো বাংলাদেশ ছিল অন্ধকার যুগ, ভয়ের এক সময়। সেই ভয়াল দিন থেকে আমরা একটি সুন্দর, আলোকিত দিনে আসতে চাই—সেটাই হলো নতুন বাংলাদেশ।

আর এই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে পুলিশকে পুরোনো চিন্তা ও অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা। পুলিশকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আমরাই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করব—এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আমরা আমাদের কাজের মাধ্যমে দেখাব যে আমাদের হাত ধরেই এই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি হবে। আমরা এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করব। কারণ, আমাদের কাছেই রয়েছে আইন এবং শৃঙ্খলা। এই দুটি বিষয় আমরা প্রতিষ্ঠা করব। এটি প্রতিষ্ঠিত হলেই সেই পরিবেশ তৈরি হবে, যেখান থেকে দেশ এগিয়ে যাবে। দেশকে এগিয়ে যেতে হলে একটি শক্তিশালী উদ্দীপনার সৃষ্টি করতে হয়। এই উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন আইন ও শৃঙ্খলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। 

পুলিশের প্রতি জনআস্থায় যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা মেরামত করাই এখন প্রধান কাজ। পুলিশকে হতে হবে বন্ধু। কারণ, আইন হলো আমাদের সকলের আশ্রয়, আর পুলিশ হলো সেই আশ্রয়দানকারী শক্তি। তাই নতুন বাংলাদেশের পুলিশও হতে হবে নতুন। এই আহ্বান জানিয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একজন মানুষ হিসেবে আমি আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারি, সম্পূর্ণ নতুন ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি। যে সরকার তোমাদের নিয়ে কাজ করছে, তাদেরও ইচ্ছা যে, তোমরা সেই ভাবমূর্তিতে চলো, যাতে করে সবাই দেখে—বিশ্বের মানুষ দেখে, দেশের মানুষও দেখে—যে আমরা শুধু পুলিশ বাহিনী নই, আমরা নতুন বাংলাদেশের নতুন পুলিশ বাহিনী। যেন দেখলে মনে হয়, এই লোকটি, এই পুলিশটি নতুন বাংলাদেশের পুলিশ। তোমাদের কাজ ও কর্মের মাধ্যমেই মানুষ অতীত ভুলে যাবে, ক্ষমা করে দেবে। এখন সুযোগ এসেছে তোমাদের, নিজেদের চরিত্র নিজেদের মতো করে উন্নত করার।

পুলিশ বাহিনী সামগ্রিকভাবে একটি কাঠামো। এই কাঠামোর কাছে অনেক শক্তি। তাদের কাজ একটি টিমওয়ার্ক। এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা পুলিশের উদ্দেশে বলেন, সবাইকে মিলে একটি টিমের মতো খেলতে হবে, এবং বাংলাদেশের যত টিম আছে, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ টিম হলো তোমরা—পুলিশরা। আমরা বহু টিম আছি, কিন্তু গোড়াটা ঠিক করে দিতে হয় পুলিশকে। কাজ করার পরিবেশটা তোমাদেরকেই সৃষ্টি করে দিতে হবে এবং তোমরা পারবে। না পারার কিছু নেই।

আর যদি অতীতের কোনো কাজে তোমার মনে অনুশোচনা এসে থাকে, দুঃখ এসে থাকে—তাহলে মোচন করার এই হলো সুযোগ। এমন কাজ করতে হবে, মানুষ তা ভুলবে না। এই যে নতুন কাজ, সেটাই দিয়েই আমাদের স্মরণ করাবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা সংরক্ষণ। পুলিশ বাহিনীও এই সংরক্ষণের বাইরে নয়। এই সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় পুলিশকে তাদের অংশটুকু করার আহ্বান জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আমরা সেই ক্ষেত্রটা প্রস্ত্তত করলাম। ফলে আমরা থাকি বা না থাকি—এর রেশ থেকে যাবে, এটি চলবে। অনেকে বলবে যে, সুন্দর চলছে; এটি চলতে থাকুক।

নির্বাচনের সময় মানুষদের নানা চাপ মোকাবিলা করতে হয় পুলিশকে। শক্তভাবে এই চাপ মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কারো কথা মানার দরকার নেই—না অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের, না অন্যান্য সরকার যারা নির্বাচন করছে, তাদের কারো কথা। আইন যা বলে, তুমি সেই আইনের ভেতরে থাকো, তাহলে পরবর্তী সরকার আইন মানার সরকার হবে। যেই হোক—সে ছাত্রদের দল হোক, পুরোনো দল হোক, নতুন দল হোক—কিছু আসে যায় না।

পুলিশ সুপাররা সারাদেশের विभिन्न জেলা থেকে বৈঠকে অংশ নেন। একেক জেলার সমস্যাও একেক রকম। প্রত্যেককে তাই নিজ নিজ ঢঙে, নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা। কীভাবে তা করতে হবে, সেই উপায়ও বাতলে দেন তিনি।

তাঁর ভাষায়, জেলার সমস্যা–গুলোর একটি তালিকা করে কোনগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে সেটা নির্ধারণ করতে হবে। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তেই এটা করতে হবে। নারীদের নিরাপত্তা দিতে হবে—এটা একটি বিশাল কাজ। আইনে তাকে সম্পূর্ণ অধিকার দেওয়া আছে। সে আইন তাকে দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে, “হ্যাঁ, এই আইন আপনাকে অধিকার দেবে এবং আমি সেই আইন প্রয়োগ করার মালিক।”

তারপর আরও নানা রকম অধিকার আছে—সেগুলো থেকেও যেন আমরা বঞ্চিত না হই, সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যদি আমরা এটুকু না পারি তাহলে বহু সম্ভাবনার এই দেশ এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

একই কথা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নাগরিক হিসেবে তাদের সংবিধানে যত অধিকার দেওয়া আছে সবগুলো নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পুলিশের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হয়। কাজেই পুলিশ হিসেবে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, যেকোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা, অসহায়–গরিব মানুষের নিরাপত্তা, শক্তিশালী হাত থেকে তাদের বাঁচানো—সেটা যেন আমরা করতে পারি।

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে সত্যি। তাই বলে পরাজিত শক্তি বসে নেই। পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণের জন্য তারা প্রস্তুত। এই সুযোগ তারা যাতে নিতে না পারে সে ব্যাপারে পুলিশকে সতর্ক করে দেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, এটা যেন মনে থাকে যে আমরা যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আছি। এই যুদ্ধটা কীভাবে হয় তা পরিষ্কার। যারা পরাজিত শক্তি—তারা সুযোগ নেবে। একটি উসকানি দেবে, কিছু গোলমাল পাকিয়ে দেবে, এবং প্রথম নজর আসবে পুলিশের উপর। আমাদের শৃঙ্খলা ভেতরের কাজ করবে, আমাদের শান্তি নষ্ট করবে। এটা অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে। নির্বাচন যত কাছে আসবে, ততই তা তীব্রতর হবে। এখানে সম্মুখসারির শক্তি হলো পুলিশ বাহিনী। সম্মুখসারির এই শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করাও পুলিশের দায়িত্ব—সে যদি সন্দেহভাজন ও অপরাধী হয়, তা সত্ত্বেও।

এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, কাউকে সন্দেহ করেছি তার মানে এই নয় যে তাকে এখনই কারাগারে নিয়ে যেতে হবে। সেও দেশের নাগরিক, কাজেই দেশের নাগরিক হিসেবে তার অধিকার আছে। সে যদি দোষ করে থাকে, তার উপর নজর রাখতে হবে, যেন দোষ করা মাত্রই তাকে ধরে আনতে পারি।

একেক জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত একেকজন একেক রকম—কেউ হয়তো একটু বেশি সক্রিয়, কেউ হয়তো একটু কম সক্রিয়। প্রশ্ন হচ্ছে সেটা যাচাই করা হবে কীভাবে?

এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়কে একটি প্রক্রিয়া সৃষ্টি করার আহ্বান জানান মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, যাতে করে কাজের মধ্যে একটা উৎসাহ দেওয়া যায়। কেউ ঝিমিয়ে পড়লে এটা যেন তাকে জাগিয়ে দেয়।

মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার ভাষ্যে, এটা খেলার মনোবৃত্তি থেকে; শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। এটা কী ক্রাইটেরিয়াতে হবে—মন্ত্রণালয় তা ঠিক করে দেবে। প্রতি মাসে এটা তৈরি হবে ১ থেকে ৬৪-এর মধ্যে। একই ব্যক্তি বারবার ৬৪-তে থেকে গেলে বুঝতে হবে তার মধ্যে একটা মৌলিক সমস্যা আছে—হয় এটা তার পারিপার্শ্বিক সমস্যা অথবা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। তাহলে তাকে ট্রেনিং দিতে হবে, সাহায্য করতে হবে, যাতে করে সে একটু উপরে উঠতে পারে। আর যে ১০-এর মধ্যে ঢুকে গেছে, আর ১০ থেকে নামছে না, তার দিকে একটু নজর রাখা—যাতে ভবিষ্যতে তাকে অনেক কাজের দায়িত্ব দেওয়া যায়। এরকম একটি প্রক্রিয়া করতে পারলে ফুর্তি লাগে কাজের মধ্যে।

পুলিশের সার্বিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমাদের যা কিছু আছে, তা দিয়ে অনলাইন করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। আমরা লিখিত মামলা বন্ধ করে দিয়েছি। এটি অনলাইনে আসতে হবে। যত অনলাইনের সংখ্যা বাড়বে, তত বুঝবেন—কেউ কেউ উদ্যোগ নিচ্ছেন।

পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি এদেশের মানুষ, আমার এনআইডি আছে। নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট পাওয়া আমার অধিকার। আমার যদি কোনো মামলা থাকে, সরকার আমাকে সেটার জন্য বাধা দিচ্ছে—যে না, এই লোকের মামলা আছে, তাকে কোনো সময় পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না। সে সেটা করতে পারে। তার এনআইডিতে গেলেই আমরা তা পেয়ে যাব। পুলিশের ভেরিফিকেশনের দরকার নেই।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পুলিশ বাহিনী আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় প্রধান বাহিনী—যেটা মানুষের সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে আমাদের সংযুক্ত রাখে। মানুষের মনে উৎসাহ সৃষ্টি করে, আনন্দের সৃষ্টি করে যে আমরা জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা ঢিলেঢালা যাওয়ার জাতি না; আমরা জীবিত হওয়ার জাতি। আমরা পারি। আমাদের সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে। সেই সম্ভাবনাগুলো আমরা কাজে লাগাতে চাই। আজকে এই কথাগুলো বলেছি, ভবিষ্যতে আবারও বলব।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ