সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
23 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধথানায় সবার জন্য সমান সেবা

থানায় সবার জন্য সমান সেবা

মোঃ তালহা
,

বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অনিবার্য স্তম্ভ। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও আইন প্রয়োগের গুরুদায়িত্ব তারা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে আসছে। বিশেষ করে গত বছরের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদলের সূচনালগ্নে সৃষ্ট অস্থিরতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে আইন-শৃঙ্খলা স্থিতিশীল হয়েছে, যা তাদের পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৩৯টি থানা এবং প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার পুলিশ সদস্য রয়েছে। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা কম। ফলে একজন পুলিশ সদস্যকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা শুধু শক্তি প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং এটি নাগরিক সেবারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। থানাই সেই সেবার প্রাথমিক কেন্দ্র, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে আস্থা, সহায়তা ও ন্যায়বিচারের |

উন্নত দেশগুলোর পুলিশিং ধারণা আজকাল অনেক বেশি বিস্তৃত ও আধুনিক। যেমন, জাপানের কোবান ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি মহল্লায় ছোট ছোট পুলিশ বক্স স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যায় সহায়তা প্রদান করেন। হতে পারে সেটি কোনো পথ হারানো ব্যক্তিকে দিকনির্দেশনা দেওয়া অথবা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমানোর জন্য ‘শপ উইথ আ কপ’ ও ‘সিটিজেনস পুলিশ একাডেমি’-এর মতো কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এ ধরনের উদ্যোগগুলো সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে পুলিশের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। একইভাবে যুক্তরাজ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে স্কুল ও কলেজগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সাইবার নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী সচেতনতা প্রচার করা হয়, যা তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ঔপনিবেশিক আমলে এই জনপদে পুলিশের কাজ ছিল মূলত অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও বিশৃঙ্খলা দমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদি আমরা পুলিশের কাজ শুধু এটুকুই ধরে নেই, তাহলে বিষয়টি একপক্ষীয় ও অসম্পূর্ণ হবে। আধুনিক সমাজে পুলিশি দায়িত্ব অনেক বেশি বিস্তৃত।

পুলিশ যদি নিজেদের জনসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তারা রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হয়ে উঠবে। মানুষ থানায় গিয়ে যদি ভয়ের পরিবর্তে আস্থা পায়, তাহলে সেই থানা হয়ে উঠবে সামাজিক ন্যায়বিচারের এক ভরসাস্থল।

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ থানায় কিছু আধুনিক সেবা যুক্ত হয়েছে। অনেক সেবা অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে—অনলাইন জিডি অ্যাপ ব্যবহার, ওয়েবসাইটে সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ, ফোন করে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করে সহায়তা গ্রহণ, নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক ডেস্ক এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ ইউনিট গঠনের মতো উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়। তবে বাস্তবতা বলছে, ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনের তুলনায় এই সেবাগুলো এখনও পর্যাপ্ত নয়।

আবার কখনো কখনো বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল পুলিশের ওপর চাপ দিয়ে মামলা নিতে বাধা দেয়। ফলে অভিযোগকারী হয়রানি ও মানসিক চাপের মুখে পড়েন। এমন বাস্তবতা মোকাবিলায় থানার সেবাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না রেখে সত্যিকার অর্থে নাগরিককেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে হবে।

পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে থানায় যাওয়ার অর্থ হবে ন্যায়বিচারের পথ খোলা। এতে করে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কমবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে।

কিন্তু কেবল ইচ্ছা থাকলেই হবে না; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে সহায়তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। পুলিশের সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি থানাকে একটি মাল্টি-ডাইমেনশনাল সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে।

বর্তমানে পুলিশ ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অনলাইন জিডি সেবা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? প্রচারণা ও সচেতনতা কার্যক্রম কি যথেষ্ট?

যদি দক্ষ, তথ্যনির্ভর ও প্রতিক্রিয়াশীল অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায়, তবে নাগরিকরা থানায় যাওয়ার আগেই প্রাথমিক সেবা নিতে পারবে। এর মাধ্যমে অভিযোগকারীর অবস্থান, অভিযোগের ধরন, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ—সবকিছুই স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হবে।

প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে থানা প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, থানায় ক্ষমতার দাপটে একটি পক্ষ সুবিধা পায়, আর অন্য পক্ষ হয়রানির শিকার হয়। এমন বৈষম্য দূর করার জন্য একটি নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা দরকার।

প্রতিটি থানায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর অভিযোগ পর্যালোচনা সভা, অভিমত সংগ্রহ এবং সেবাগুণমান মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগে সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি মানুষের প্রতি পুলিশের সংবেদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।

পুলিশের আচরণগত উন্নয়নের বিষয়েও বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। থানায় গিয়ে সেবাপ্রার্থীরা যদি কঠোর, রূঢ় কিংবা অপেশাদার আচরণের সম্মুখীন হন, তাহলে তা পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি পুলিশকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এজন্য আচরণগত উন্নয়নের লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া চালু রাখা উচিত, যেখানে মনোবিজ্ঞান, নাগরিক অধিকার, লৈঙ্গিক সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতিশীল আচরণ শেখানো হবে। পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসারেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, যেন পুলিশ সদস্যরা শুধু আইন প্রয়োগকারী নন, বরং সহানুভূতিশীল সেবাদানকারী হিসেবেও গড়ে উঠতে পারেন।

বর্তমান সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো থানায় সেবার বহুমাত্রিকতা। একজন নাগরিক কেবল মামলা দায়ের করতে নয়, বরং পারিবারিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সামাজিক বিবাদ, জিনিসপত্র হারানোর মতো বিভিন্ন বিষয়ে পুলিশের সহায়তা চান। এজন্য থানায় মাল্টি-সার্ভিস সেন্টার চালু করা যেতে পারে, যেখানে পুলিশ ছাড়াও আইনজীবী, কাউন্সেলর, স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজসেবক থাকবেন। একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কেন্দ্র পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে আরও বেশি মানবিক ও কার্যকর করে তোলে।

কিছু মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতোমধ্যে এ ধরনের সেবা চালু করলেও এর পরিধি ও সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি, যেন আরও বেশি নাগরিক সুবিধা পান।

তথ্য নিরাপত্তা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। অভিযোগকারীর তথ্য ফাঁস হলে সমাজে ভয় ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে নারী নির্যাতন অথবা অন্যান্য সংবেদনশীল অপরাধের শিকার অভিযোগকারীরা গোপনীয়তার অভাবে থানায় যেতে ভয় পান। এই সংকট মোকাবিলায় উন্নত তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি, এনক্রিপশন প্রযুক্তি ও আধুনিক ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা জরুরি।

পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে আরও শক্তিশালী করে এই সংবেদনশীলতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশিং হতে পারে একটি কার্যকর উদ্যোগ। এতে সাধারণ মানুষ সরাসরি পুলিশের সঙ্গে কাজ করতে পারে, স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয় এবং পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থায় পুলিশ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, ইমাম, সমাজকর্মী ও তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করবে, যার ফলে মানবিক ও বাস্তবসম্মত সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

কোনো প্রতিষ্ঠানই দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত সম্পদ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারে না। বাংলাদেশের অনেক থানায় এখনো পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এমনকি মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও অনেক সময় অনুপস্থিত। এসব সমস্যা দূর করার জন্য সরকারকে পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নতুন নিয়োগ, পেশাগত প্রশিক্ষণ, আধুনিক যানবাহন, সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা, কম্পিউটারাইজড রেকর্ডিংয়ের মতো প্রযুক্তি থানাভিত্তিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে তুলবে।

এসব কাঠামোগত ও আচরণগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি নীতিগত প্রতিশ্রুতি। আর সেই নীতি হলো—সবার জন্য সমান সেবা নিশ্চিত করার নীতি, যেখানে নাগরিকের পরিচয়, পেশা, আর্থিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থান বা লিঙ্গ কোনোভাবেই তার ন্যায্য সেবা পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করবে না। এটি কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; বরং একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা।

সবশেষে বলা যায়, পুলিশ যদি প্রকৃত অর্থে সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে চায়, তাহলে তাদের কাঠামোগত রূপান্তরের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যে সমাজে মানুষ থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশ্বাস পায়, সেখানে অপরাধ দমন সহজ হয়। আর যেখানে থানা ভয় বা প্রতিকূলতার প্রতীক হয়ে ওঠে, সেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এই দেশে একটি কার্যকর, জনবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে থানাকে রূপান্তরের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিটি থানাই হতে পারে ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল—একটি নিরাপদ ঠিকানা, যেখানে মানুষ আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করে এবং সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে আসে। এই আস্থার জায়গাটি গড়ে তোলা আমাদের সমাজকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করে গড়ে তোলার এক অপরিহার্য শর্ত।

লেখক
এমফিল গবেষক
ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন,নরওয়ে

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ