গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো আইনের শাসন। এছাড়া গণতান্ত্রিক চর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো মানবাধিকার—অর্থাৎ একজন নাগরিক তার অধিকার কতটা উপভোগ করতে পারছেন, সেই বিষয়টি। আর আইনের শাসন ও মানবাধিকার উভয়ই অনেকাংশে প্রযুক্তিগত ও পেশাগতভাবে দক্ষ আধুনিক পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল, যে বাহিনীর দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পুলিশের কার্যক্রমের সঙ্গে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। বিদ্যমান আইন ও চর্চায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মানবাধিকারের অকৃত্রিম রক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা এখন গণমানুষের আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। আইনি ও কাঠামোগত নানা সংস্কার এবং জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সেই পথেই যাত্রা করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।
মানবাধিকার কী
মানবাধিকার হলো মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার। মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রেই এই অধিকার তৈরি হয়। এটি সর্বজনীন ও সমতাভিত্তিক অধিকার, যা স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত ও সুরক্ষিত।
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী, জীবনের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার—এগুলো হলো প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই অধিকার নিশ্চিতে যতটুকু সচেষ্ট, তার সভ্যতার মানচিত্র ঠিক ততটাই সমুন্নত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশও সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী মানবাধিকার সংরক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পুলিশের। কারণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের সংবেদনশীল কাজটি পুলিশকেই করতে হয়।
মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। এগুলো কতটা পরিপালিত হচ্ছে তার ওপরই নির্ভর করে দেশে কেমন মানবাধিকার পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো
মানবাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক যেসব প্রধান প্রধান সনদ ও ঘোষণা রয়েছে, তার সবগুলোতেই অনুস্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন, ১৯৬৫ ও ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর), ১৯৬৬। বাংলাদেশ অনেক আগেই এ দুটি কনভেনশনের পক্ষভুক্ত হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার (সিএটি), কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড (সিআরসি) ও কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন (সিডও) সনদেও। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সে (আইসিপিইডি) অনুস্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মানবাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি বা প্রটোকল স্বাক্ষর করার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র তিন ধরনের বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে নেয়। এগুলো হলো—মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, মানবাধিকারের সুরক্ষা ও মানবাধিকারকে পূর্ণাঙ্গতা প্রদান।
মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অর্থ হলো নাগরিকের অধিকার ভোগে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা। অধিকার রক্ষার অর্থ হলো কেউ যদি কারও অধিকার লঙ্ঘন করতে চায়, তাহলে তা প্রতিরোধ করা। এক্ষেত্রে সবসময় যে কঠোর হতে হবে, তা নয়। ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমেও এই কাজ করা যায়। একই সাথে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন অধিকার লঙ্ঘন করলে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো সিদ্ধান্তও নিতে হয়।
অধিকারের পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয় (যেমন আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা)। প্রশাসনিক অর্থাৎ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের কাজ এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন, ১৯৬৫: কনভেনশনটি কার্যকর হয় ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি, যার উদ্দেশ্য জাতিগত সব ধরনের বৈষম্য দূর করে এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করা, যা হবে সব ধরনের জাতিগত বিভেদ ও বৈষম্যমুক্ত। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ-২ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষের ওপর সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সুরক্ষায় বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রকে। এই অঙ্গীকারে ১৯৭৯ সালের ১১ জুন কনভেনশনটিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।
ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস, ১৯৬৬ (আইসিসিপিআর): বাংলাদেশ জাতিসংঘের এই সনদে অনুস্বাক্ষর করে ২০০০ সালে। এর অনুচ্ছেদ ২(২) অনুযায়ী, আইসিসিপিআরে স্বীকৃত অধিকারগুলোর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনগত ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর। পাশাপাশি অনুচ্ছেদ ২(৩) অনুযায়ী, কারও অধিকার লঙ্ঘিত হলে এর কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
কনভেনশন অন এলিমিনেশন অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন, ১৯৭৯ (সিডও): নারীর প্রতি বৈষম্যের চিরন্তন ও পদ্ধতিগত প্রথাকে সামনে এনেছে সিডও। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২(ই) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা নারী যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সেজন্য কার্যকর সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অনুচ্ছেদ ২(এফ) অনুযায়ী, নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে বিদ্যমান এমন আইন, নীতিমালা, প্রথা ও চর্চা সংশোধন অথবা বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করবে রাষ্ট্র। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সনদটিতে স্বাক্ষর করেছে।
কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার, ১৯৮৪ (সিএটি): বাংলাদেশ কনভেনশনটিতে অনুস্বাক্ষর করেছে ১৯৮৯ সালে। কনভেনশনটিতে অনুস্বাক্ষরকারী দেশগুলো যেন কার্যকর আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করে, কনভেনশনের ২ নং অনুচ্ছেদে সেই বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। কনভেনশনে ঐচ্ছিক একটি প্রটোকলও ২০০২ সালে গৃহীত হয়েছে, যেখানে নির্যাতন প্রতিরোধে একটি জাতীয় প্রতিরোধ কৌশল প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো ঐচ্ছিক এই প্রটোকলটিতে স্বাক্ষর করেনি।
সিএটি অনুস্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে এর অত্যাবশ্যকীয় অনুচ্ছেদগুলো পরিপালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বাংলাদেশের। সব ধরনের নির্যাতনকে ফৌজদারি আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্যাতনের চেষ্টা এবং নির্যাতনকারী ও সহযোগিতাকারীর ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এসব অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব চাইল্ড, ১৯৮৯ (সিআরসি): শিশু অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক আন্দোলনের ফল এই কনভেনশন ১৯৯০ সালে কার্যকর হয়। কনভেনশনের ১ থেকে ৪২ নং পর্যন্ত অনুচ্ছেদে শিশুদের সব ধরনের নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪-এ শিশুদের জন্য স্বীকৃত এসব অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষকে উপযুক্ত আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও অন্যান্য পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে সিআরসিতে অনুস্বাক্ষর করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অব দ্য রাইট অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বার্স অব দেয়ার ফ্যামিলি, ১৯৯০: ২০০৩ সালে কনভেনশনটি কার্যকর হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ এতে অনুস্বাক্ষর করে। কনভেনশনটির উদ্দেশ্য অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সব অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য এবং পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়া ও ফিরে আসা পর্যন্ত এই অধিকার বলবৎ থাকবে।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (আইসিপিইডি): অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। আইসিপিইডি হচ্ছে মানবাধিকারসংক্রান্ত চুক্তি, যা ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত হয়, কার্যকর হয় ২০২০ সালে। চুক্তিটির লক্ষ্য হচ্ছে, জোরপূর্বক গুমের বৈশ্বিক যে সমস্যা, তার প্রতিরোধ ও সমাধান করা। এজন্য আইসিপিইডি একটি আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যাতে করে ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা যায়।
ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)
এই সনদের মূল বিষয় হলো প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। এর মাধ্যমে জাতিগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
১৯৬৬
চার্টার/ কনভেনশন/সনদের টাইটেল | সাল | বিবরণ
কনভেনশন অন এলিমিনেশন অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন (সিডও) | ১৯৭৯
এই সনদে মোট ৩০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মধ্যে ধারা-২, ১৩(ক), ১৬.১ (গ) ও (চ) ধারাগুলোয় আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ সরকার তা সে সময় অনুমোদন করেনি। পরবর্তী সময়ে সরকার ধারা-২, ও ১৬.১ (গ) বাদে বাকি দুটো অনুচ্ছেদ থেকে আপত্তি তুলে নেয়।
কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার (সিএটি) | ১৯৮৪
এই কনভেনশন ‘নির্যাতন’ শব্দটির সংজ্ঞা দিয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা বা তাদের জ্ঞাতসারে বা সমর্থনে অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণার উদ্দেশ্যে করা যেকোনো কাজকে বোঝায়।
কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব চাইল্ড (সিআরসি) | ১৯৮৯
এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দেশ কর্তৃক অনুমোদিত একটি মানবাধিকার চুক্তি। এই সনদ শিশুদের সহিংসতা, অবহেলা, শোষণ এবং যেকোনো ধরনের অপব্যবহার থেকে রক্ষা করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অব দ্য রাইট অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বার্স অব দেয়ার ফ্যামিলি | ১৯৯০
এই সনদ অভিবাসী শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করে। এর মধ্যে আছে জীবন ধারণের অধিকার, নির্যাতন থেকে সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (আইসিপিইডি) | ১৯৯০
এই কনভেনশনটি ‘বলপূর্বক গুম’কে সংজ্ঞায়িত করে। এটি এমন একটি কাজ, যা রাষ্ট্রের এজেন্ট বা তাদের সমর্থনে কাজ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা সংঘটিত হয়। যেসব দেশ এটি অনুমোদন করে, তারা এই বিধানগুলো মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্য।
জাতীয় আইনি কাঠামো
রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা দেওয়া আছে বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’
মানবাধিকারের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদের ধারা-১ এ বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। ধারা-২ এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন।
প্রত্যেকের আইনের আশ্রয়লাভের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাসরত এ দেশের নাগরিক এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরতদের জন্য একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার হলো আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুগ আচরণ লাভ। বিশেষ করে আইনের বাইরে গিয়ে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে করে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।
জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে। এতে বলা হয়েছে, আইনের বাইরে গিয়ে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।
গ্রেপ্তার ও আটকের সময় কোনো ব্যক্তির মানবাধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেই নিশ্চয়তা রয়েছে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদের ধারা-১ এ বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। এছাড়া ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ এবং ওই আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
একই অনুচ্ছেদের ধারা-২ এ বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাজির করতে হবে। গ্রেপ্তারের স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতীত তাকে অতিরিক্ত সময় প্রহরায় আটক রাখা যাবে না।
বিচার ও দণ্ডের ক্ষেত্রে কারও মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়, সেই নিশ্চয়তা রয়েছে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে। এর ধারা-১ এ বলা হয়েছে, যে সময় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেই সময়ে বলবৎ ছিল এমন আইন ভঙ্গের অপরাধ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না এবং অপরাধ সংঘটনকালে সেই আইনবলে যে দণ্ড দেওয়া যেত, তাকে তার বেশি অথবা সেটি থেকে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাবে না।
এই অনুচ্ছেদেরই ধারা-২ এ বলা হয়েছে, এক অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাবে না। ধারা-৩ এ বলা হয়েছে, ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হবেন। এছাড়া একই অনুচ্ছেদের ৪ ও ৫ ধারায় কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য না করার এবং যন্ত্রণাদায়ক, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে করে অপরাধীর মানবাধিকার রক্ষিত হয়।
অনুচ্ছেদ ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৯ ও ৪৩ এ ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশন, চুক্তি ও প্রটোকল বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনে নানা পরিবর্তন বা সংশোধন আনতে হয়। আইসিসিপিআর বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করেছে। এছাড়া সিডও সনদ বাস্তবায়নে বেশ কিছু আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন। পাশাপাশি অ্যাসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে দণ্ডবিধিতে সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনী এসেছে যৌতুক প্রতিরোধ আইনেও।
কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার বাস্তবায়নে কার্যকর করা হয়েছে টর্চার অ্যান্ড কাস্টোডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট, ২০১৩। এছাড়া শিশু অধিকার রক্ষায় গৃহীত হয়েছে শিশু আইন ২০১৩। কনভেনশনটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো ২০০৪ সালে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে সংস্কার আনা। এই সংশোধনীতে অপরাধী হিসেবে শিশুদের গণ্য করার বয়স সাত থেকে বাড়িয়ে নয় বছর করা হয়েছে।
পুলিশের দায় ও দায়িত্ব
বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, তথ্য অধিকার আইনসহ অন্যান্য আইন মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্যে চালু আছে। তবে আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করাই শেষ কথা নয়। আইনের বাস্তব প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি জরুরি।
মানবাধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইন সফলভাবে প্রয়োগের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রক্রিয়ার গতি ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তদন্তকে করেছে আরও নির্ভরযোগ্য। তবে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ভিকটিম ও তার পরিবারকে হতাশ করে।
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। থানায় নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক চালু হওয়ার পর থেকে নির্যাতিত নারীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশিং বাংলাদেশে আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই মডেলে পুলিশ স্থানীয় নেতা, শিক্ষক ও যুবকদের সঙ্গে সমন্বয়ে অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করে। ময়মনসিংহের এক ইউনিয়নে এই মডেলের মাধ্যমে শিশু পাচার রোধে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে।
চ্যালেঞ্জসমূহ
পুলিশের কাজে চ্যালেঞ্জও অবশ্য কম নয়। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পদের অপ্রতুলতা তাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। আবার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কিছু ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং পুলিশ-জনতা সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি করে।
মানবাধিকার সমুন্নত রেখে সমাজে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। পুলিশ একাডেমির পাঠ্যক্রমে মানবাধিকার, নারী ও শিশুর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য বাধ্যতামূলক রিফ্রেশার কোর্স চালু করা যেতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা প্রশিক্ষণ দেবেন। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডস পুলিশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন, বিশেষ করে নারী নির্যাতন মোকাবিলার ক্ষেত্রে।
দেশের ৬৪টি জেলাভিত্তিক ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা আরেকটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। এই কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসা, আইনি পরামর্শ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলে ভিকটিমরা পুনর্বাসনে সহায়তা পাবেন। বর্তমানে দেশে আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে একজন নির্যাতিত নারী শুধু মামলা করাই নয়, বিনামূল্যে কাউন্সেলিং ও চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছেন। এই মডেলটি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। ফেসবুক, টিকটক বা হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিদিন নারী নির্যাতন, সাইবার বুলিং ও ভুয়া সংবাদের মতো অপরাধ বাড়ছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা অ্যানালিটিকসের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
পুলিশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। স্কুল-কলেজে মানবাধিকার ক্লাব গঠন করে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে তরুণরা পুলিশকে ভয় না পেয়ে বন্ধু হিসেবে দেখতে শিখবে। পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদ, মন্দির ও গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা সভার মাধ্যমে পুলিশ-নাগরিক সুসম্পর্ক জোরদার করা সম্ভব।
পুলিশ সংস্কার কমিশন যা বলছে
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (ইউডিএইচআর) מেনে চলতে বাধ্য। এর অনুচ্ছেদ ৫ এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির সম্মুখীন করা যাবে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক অন্যান্য কনভেনশন ও প্রটোকলে অনুস্বাক্ষরকারী হিসেবেও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ বাংলাদেশ।
দেশের অপরাধ বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা ব্যাপক। কারণ, এই সংস্থার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষার কাজ করে রাষ্ট্র। এ কাজে কখনো কখনো শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয় সত্য, তবে তা হতে হবে আইনসিদ্ধ সীমার মধ্যে। এছাড়া পুলিশের এমনভাবে কাজ করা উচিত, যেখানে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারসহ আইনের শাসন সুরক্ষিত থাকবে। এই লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা ও ইতিবাচক ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধির বিকল্প নেই, যা হবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনা এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যাপারে কোনো পুলিশ সদস্য যেন শৈথিল্য না দেখান, তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে সরাসরি সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি যদি কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা বা তাদের প্ররোচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রধান নিজেই যেন তদন্তের নির্দেশ প্রদান করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সেই সংস্থার প্রধান কার্যালয়েও একটি মানবাধিকার সেল রাখার প্রস্তাব করেছে কমিশন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠিত হয়—জনতার পুলিশ হয়ে ওঠার অভিপ্রায়ে পুলিশের নতুন পথচলার জন্য।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবাধিকার নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুলিশ সদস্যদের সার্বিক কাজের পরিবেশ উন্নতির প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রে পুলিশ সংস্থা পুনর্গঠন, নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা সংস্কার, জনবল নিয়োগ, পুলিশি সেবা সহজীকরণ, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ সমন্বয়করণ ও আইন সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আর দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবগুলোয় ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি ও ভাবমূর্তি থেকে পুলিশ বাহিনীকে বের করে আনতে যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের মাধ্যমে একটি দক্ষ ও জবাবদিহিযোগ্য পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
শেষ কথা
পুলিশের আন্তরিকতাই হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। মানবাধিকার রক্ষায় তাদের ভূমিকা তখনই সফল হবে যখন প্রতিটি পুলিশ সদস্য নিজের দায়িত্বকে সমাজসেবা হিসেবে দেখবেন। এর জন্য প্রণোদনা হিসেবে মানবাধিকার পুরস্কার চালু করা যেতে পারে, যা মাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে সেরা কর্মীদের দেওয়া হবে। এ ধরনের স্বীকৃতি তাদের মনোবল বাড়াবে এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।
মনে রাখতে হবে, মানবাধিকার রক্ষার এই লড়াই পুলিশের একার নয়। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সরকারের অর্থায়ন ও সুশীল সমাজের সমর্থন এক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলেই পুলিশ হয়ে উঠবে মানবাধিকার রক্ষার বাতিঘর।
লেখক ও বিশ্লেষক
সিনিয়র এডিটর
ইন্টেলিস সলিউশন
