সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
29 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅতিথির চোখেনাগরিক-পুলিশ সম্পর্ক:আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের আলোয় হোক উদ্ভাসিত 

নাগরিক-পুলিশ সম্পর্ক:আস্থা ও পারস্পরিক সম্মানের আলোয় হোক উদ্ভাসিত 

আবদুল লতিফ মাসুম
,

সামাজিক শান্তির পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী হলেও, ‘পুলিশ’ শব্দটি যে জনসাধারণকে খুব একটা প্রশান্তির অনুভূতি দেয় না—এই সমস্যা আজকের নয়। গত কয়েকশ বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের মনে পুলিশের প্রতি একটি ভীতিজাগানো ভাবমূর্তি রয়েছে। এটি হয়তো শাসক-ঘেঁষা ভূমিকার কারণে গড়ে উঠেছে। ঔপনিবেশিক আমলে পুলিশ ছিল শাসকতান্ত্রিক শৃঙ্খলার রক্ষক। জনগণ ও পুলিশের মধ্যে ছিল ব্যাপক দূরত্ব। সাধারণ মানুষ পুলিশকে অনর্গল ভিন্ন কিছু মনে করত।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ ছিল জনবিচ্ছিন্ন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের এত বছর পরে এসেও সেই ভাবমূর্তির যে খুব একটা পরিবর্তন এসেছে, তা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যাচ্ছে কি? সাতচল্লিশের দেশভাগের পর আমরা—অর্থাৎ পূর্ব বাংলার মানুষরা—আরেকটি ঔপনিবেশিক শাসনধারার মধ্যে পড়লাম। পশ্চিমের দূরের মসনদ থেকে

আরেকটি সার্বভৌম ভূখণ্ড পার হয়ে পূর্বের এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটা অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসনেরই নামান্তর ছিল। সেই আমলেও পুলিশ ঠিক জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি; বরং ক্ষমতাধারীদের পাহারাদার হিসেবে থেকেছে।

এরপর পঞ্চাশের দশকে পূর্ব বাংলা হলো পূর্ব পাকিস্তান, আর একাত্তরের শেষভাগে পূর্ব পাকিস্তান হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘ কালাবর্তেও মানুষের মন থেকে পুলিশবিষয়ক নেতিবাচক ও ভীতিকর ধারণা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এখনো আমরা জানি, প্রায়শই কেবল পুলিশের মন্দ দিকই দেখি, ভালো দিকটি দেখি না।

তবে জনসাধারণের মন থেকে এই ভীতি দূর করে অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আর সেই কাজটি করতে হবে পুলিশ বাহিনীকেই। তাদের কার্যক্রম এমন হতে হবে যে, জনসাধারণের মনে প্রশ্ন ওঠে—“আমাদের নিরাপত্তায় রাতদিন সজাগ থাকে কারা?”

আমাদের সম্পদ পাহারা দেয় কারা? আমাদের ঝগড়া-বিবাদ, অশান্তি, অরাজকতা ঠেকায় কারা? রাতের ঘুম হারাম করে, দিনের প্রখর রোদে ঘাম ঝরিয়ে, ঈদ-পার্বণে পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে থেকে আমাদের জনসংখ্যার আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করে কারা? আর এসব প্রশ্নেরই উত্তর হতে হবে একটাই—পুলিশ বাহিনী।

অবশ্য এখানে একটা কিন্তু রয়েছে। আইনগতভাবে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন—এগুলো তাদের কর্তব্য। নীতিগতভাবে এসব কথা বলা হলেও তারা কি কখনো স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম? প্রকৃতপক্ষে পুলিশ বাহিনী হলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বৈধ শক্তি প্রয়োগের একক জিম্মাদার। অনেক ক্ষেত্রেই এই রাষ্ট্রই একমাত্র সমার্থক শব্দ হয়ে ওঠে সরকার। অর্থাৎ, কেবল সরকারই তাদের পরিচালনা করে। এই সরকার আবার দলীয় সরকার। গণতান্ত্রিক সমাজে বৈধতা ও প্রতিনিধিত্বের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সুতরাং আমরা যে পুলিশকে সামনে থেকে দেখি, তার পেছনে থাকে অন্য শক্তি। যেন কর্তার ইচ্ছাই তাদের কীর্তন। তো সেই সরকারের ইচ্ছা যদি ভালো হয়, তবে জনগণ ভালো থাকে। আর ইচ্ছা যদি খারাপ হয়, জনসাধারণের দুর্ভোগের সীমা থাকে না।

সভ্যতার কোন পর্যায়ে ও কীভাবে পুলিশের উত্থান, সেই বিষয়টি রীতিমতো কৌতূহলোদ্দীপক। প্রাচীনকালে রাজা, রাজকীয় ও রাজধানীতে উজির, নাজির ও কোতোয়ালের প্রভাব ছিল। মুঘল আমলে কোতোয়ালরা সৈন্য, সামন্ত, মনসবদার, পাহারাদার দ্বারা রাজধানীর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করত। তবে মূল শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীই কার্যকর ছিল। প্রাচীন রোমান সভ্যতায় পুলিশি ব্যবস্থার প্রথম প্রবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রাথমিকভাবে তারা পাহারা দিত সাধার, ও তার সভাসদদের। যাজক ও অভিজাতরাও এই সেবা পেতেন। সেটা অনেকটা এখনকার গার্ড রেজিমেন্টের মতো। সাধারণভাবে বলা যায়, সেই সময়ের পুলিশ ছিল আমাদের এখনকার গেটকিপার বা দারোয়ানদের মতো।

কিন্তু ফৌজদারি আইন কার্যকর ও শৃঙ্খলা বিধানের বাহিনী হিসাবে পুলিশের আত্মপ্রকাশ লন্ডনে ১৮২৯ সালে। ১৮৬০ সালের মধ্যে পুরো ব্রিটিশের আইন-শৃঙ্খলা নীতি পুলিশের হাতে ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের এই ধারণাটি ব্রিটিশ প্রশাসনের সর্বত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ক্ষমতা সবসময়ই মানুষকে শক্তি প্রয়োগের নেতিবাচক দিকে নিয়ে যায়। পুলিশ বাহিনীর ক্ষমতা উন্নয়ন তাদের সুনামের অনুন্নয়ন ঘটিয়েছে। তখন থেকেই চিন্তা করা হয় যে, কীভাবে তাদের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাদের ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও তখন থেকে আলোচিত হয়ে আসছে। সরকারের সাথে তাদের সম্পর্কের ধরন নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার এই যে, সেই অতীতে উত্থাপিত প্রশ্নসমূহ এখনো দেশে দেশে আলোড়ন তুলে যাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদয় হলেও সেই পুরনো কাঠামো ও ক্ষমতার বিন্যাসে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধুমাত্র পুলিশের নাম ও লোগো পাল্টেছে মাত্র। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পেছন থেকে জনকল্যাণমূলক শাসনের পরিবর্তে শক্তির শাসন পরিচালনা করেছে।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের মতোই পুলিশের কাজ ছিল জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামকে দমন করা। এই কাজ করতে গিয়ে লাঠি, পিস্তল, টিয়ার গ্যাস তারা ব্যবহার করেছে। মন্দের মধ্যে ভালো যে, তারা লাঠি চালানোর ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-কানুন ও বাধ্যবাধকতা মেনে চলত। রাজনৈতিক বন্দিদের রাজবন্দির মর্যাদা দিত। কিছুটা সম্মান ও সমীহও প্রদর্শন করত।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশে যতই দিন গেছে, পুরনো নিয়ম-রীতি ও ভদ্রতা-সভ্যতার চর্চা বিলীন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে পুলিশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে—তার দায় পুলিশের নয়, বরং রাজনৈতিক সরকারের।

রাষ্ট্রীয় আদর্শের নিরিখে সব ধরনের প্রথা ও প্রতিষ্ঠান আবর্তিত-বিবর্তিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ব্রিটেনের মতো রাষ্ট্রে পুলিশ একটি স্বতন্ত্র, সংবিধানগত ও পৃথক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা। এসব দেশে পুলিশি দুর্নীতি প্রায় নেই বললেই চলে। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, জনগণের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, তারা পুলিশের ওপর শতভাগ নির্ভর করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা বেতন, ভাতা ও পদোন্নতির মতো বিষয়গুলোর ওপর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। তৃতীয়ত, আমাদের দেশের মতো অহরহ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত।

বিশ্বের কোনো কোনো দেশে পুলিশদের দাপট দেখা যায় বটে, তবে তা নেতিবাচক নয়, বরং ইতিবাচক অর্থে। তারা জনগণের সেবা, নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। এসব দেশে যেকোনো মানুষ বিপদে পড়লেই পুলিশকে খবর দেয়। আশার কথা যে, এখন আমাদের পুলিশও জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন করলে তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অনেক নেতিবাচক কাজের মধ্যে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। সংবাদপত্রে পুলিশের নেতিবাচক খবরের পাশাপাশি এ খবরও আসে যে, অসহায় মানুষকে তারা উদ্ধার করছে, বিপদে-আপদে সাহায্য করছে। পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে শিশুকে লালন করছে। এমন ভালো খবরও থাকে অনেক।

আমাদের হাতে আলাদিনের চেরাগ নেই। আমরা পুলিশের ভাব, চরিত্র ও ব্যবহার একদিনে পরিবর্তন করতে পারব না। বর্তমান সরকারের উচিত পুলিশের নৈতিক, জাগতিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথরেখা তৈরি করা, যেন একটি আদর্শ পুলিশ বাহিনী গড়ে উঠতে পারে।

ড. আব্দুল লতিফ মাসুম জাহা পীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক। তিনি এর আগে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ, গবেষণা প্রবন্ধ ও সম্পাদকীয়সমূহ পাঠকসমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত।

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ