সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
23 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅপরাধ বিশ্লেষণকোমলমতি শিশু ও একজন হিটু শেখ

কোমলমতি শিশু ও একজন হিটু শেখ

ফারিদা ইয়াসমিন
,

একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা

সম্প্রতি মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ছোট্ট শিশু আছিয়ার অমানবিক মৃত্যু এবং এর প্রেক্ষিতে ধর্ষণকারীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ সারা দেশে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনায় মানুষের মনে নিপীড়কের বিরুদ্ধে যেমন ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্মেছে, তেমনি পুলিশ ও সরকারি উচ্চমহলের তৎপর পদক্ষেপ ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগিয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আছিয়ার ঘটনাটি দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও এই সময়ে আরও কিছু শিশু এ ধরনের বর্বরতার শিকার হয়েছে, যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায়, শিশুদের প্রতি নিপীড়ন এখনো বন্ধ হয়নি।

সভ্যতার এই চরম শিখরে এসেও পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে আমাদের মতো সমাজে, কন্যাশিশুরা এখনও অবহেলিত। তাদের মানবসম্পদ হিসেবে না দেখে বোঝা মনে করা হয়, যা চরম বৈষম্যেরই প্রতিফলন। আছিয়ার ঘটনাটি এই নির্মম বাস্তবতারই একটি প্রমাণ। মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তৃতীয় শ্রেণির এই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয় এবং ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আছিয়ার মতো এমন অনেক শিশু ও নারী প্রতিনিয়ত ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হয়, কিন্তু সব ঘটনা জনসমক্ষে আসে না এবং সুষ্ঠু বিচারও নিশ্চিত হয় না। আমরা চাই, প্রতিটি এমন ঘটনার বিচার হোক এবং তা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হোক। এর জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সকল সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যার ঘটনাটি এক দৃষ্টান্ত হতে পারে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সার্বিক পরিবেশের উন্নতিও জরুরি। শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং মঙ্গলের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক গত ১৭ মে রায় ঘোষণা করেন। মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার ২১ দিনের মাথায় এবং মাত্র ১৪ কর্মদিবসে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়, যা নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার একটি উদাহরণ। আদালত ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(২) ধারায় (ধর্ষণের ফলে মৃত্যু) হিটু শেখকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। মামলার বাকি তিন আসামি — হিটু শেখের স্ত্রী ও দুই ছেলে — অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, শিশুটির বোনের স্বামী ও ভাশুরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারার দ্বিতীয় অংশ (ভয়ভীতি প্রদর্শন) এবং বোনের শাশুড়ির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় (অপরাধের আলামত নষ্টের অভিযোগ) অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। এই রায় প্রমাণ করে, দ্রুত বিচার সম্ভব হলে অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে এবং সমাজে এমন জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র

ধর্ষণ নারী ও শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রকাশ, যা জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ অনুসারে নারী ও শিশুর সম্ভ্রমের ওপর চরম আঘাত। ধর্ষণ নারী-শিশুর নিরাপত্তাবোধ, মানবাধিকার, আত্মপরিচয়, মর্যাদা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

মাগুরার ছোট্ট আছিয়ার মর্মান্তিক পরিণতিতে পারিবারিক অবহেলা, অজ্ঞতা ও অসচেতনতাও কিছুটা দায়ী ছিল। আছিয়ার বড় বোন অপরিপক্ক বয়সে হিটু শেখের পুত্রবধূ হয়েছিলেন এবং তিনি তার শ্বশুর হিটু শেখের চারিত্রিক ত্রুটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সম্ভবত শিশু আছিয়া নিজেও এই দুশ্চরিত্র মানুষটির লোলুপ দৃষ্টির ব্যাপারে জানত, আর এ কারণেই সে ওই বাড়িতে যেতে চায়নি। কিন্তু দারিদ্র্য ও অজ্ঞতার কারণে তার মা হয়তো ভালো থাকার আশায় তাকে বোনের কাছে পাঠিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ আছিয়ার অকাল মৃত্যু হয় এবং একজন মা তার সন্তান হারান।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯% হলো ০–১৪ বছরের শিশু, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক কন্যাশিশু। জাতীয় আদমশুমারি ২০২২-এর তথ্যানুসারে, এর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এই কন্যাশিশুদের একটি বড় অংশ জন্ম থেকেই নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এর ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সক্ষমতার দিক থেকে তারা ছেলেশিশুদের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি, কন্যাশিশুরা যৌন সহিংসতারও ব্যাপক শিকার।

এভাবে কন্যাশিশুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। সুশাসনের অভাব, দারিদ্র্য এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার অপ্রতুল সুযোগ তাদের জীবনকে আরও অনিরাপদ ও অরক্ষিত করে তুলছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১,৬২৯ জন কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭২ জন ধর্ষণের, ১২১ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের এবং ২৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে সাতজন কন্যাশিশু এবং ৯৪ জন ধর্ষণের চেষ্টা থেকে কোনোভাবে রক্ষা পেয়েছে। এছাড়া, ১২২ জন যৌন নিপীড়নের শিকার এবং ১০৪ জন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬ জন আত্মহত্যা করেছে। এই পরিসংখ্যানগুলি আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজকেও এই দায় উপলব্ধি করতে হবে এবং কন্যাশিশুদের অধিকার সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, কোমলমতি শিশুরা বেশিরভাগ সময় পরিচিত পুরুষদের দ্বারাই যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। মাগুরার আছিয়া এবং দিনাজপুরের পূজা সহ আরও অনেকের ঘটনা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই একজন শিশু যখন কোনো পুরুষকে ভয় পায়, তাকে এড়িয়ে চলে বা কোনো স্থানে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে, তখন পিতা-মাতাসহ পরিবারের সকল আপনজনের উচিত শিশুর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ শিশুর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং পছন্দের অধিকার হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশু অধিকার (বেস্ট ইন্টারেস্ট অব চাইল্ড)।

শিশুদের যা জানাতে হবে

যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কথা বলা কোনো অশ্লীলতা নয়, বরং এটি শিশুদের অধিকার। এটি লজ্জারও কোনো বিষয় নয়, কারণ অপরাধী হলো নির্যাতনকারী, নির্যাতিত শিশু নয়। তাই কোনো শিশু যখন এমন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন দ্রুততম সময়ে কাছের মানুষকে জানানো জরুরি। মনে রাখতে হবে, নির্যাতনকারীরা সাধারণত হঠাৎ করেই আক্রমণ করে না; তারা নানা আকারে ইঙ্গিত দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। তাই শিশু ও অভিভাবক উভয়েরই এসব ইঙ্গিত বোঝার জন্য সচেতন থাকা প্রয়োজন।

নির্যাতনের শিকার হলে নিজেকে অপরাধী ভাবা, মাথা নিচু করে থাকা বা “নষ্ট হয়ে গেছি”—এমন চিন্তা করা একদমই উচিত নয়। নির্যাতনের ঘটনা সবাইকে জনে-জনে বলার প্রয়োজন নেই। বরং বাবা-মা বা এমন কোনো কাছের মানুষকে বলতে হবে, যার কাছে মন হালকা করা যায়। নির্যাতনের প্রতিরোধে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। পরিবারের একজন সদস্যকে আগে থেকেই ‘সুরক্ষাকারী’ হিসেবে ঠিক করে রাখতে হবে। কেউ যদি নির্যাতনের চেষ্টা করে, তবে চিৎকার করে সবাইকে জানাতে হবে এবং দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে হবে। একই দিনে সুরক্ষাকারীকে ঘটনাটি খুলে বলা উচিত। যদি কোনো শিশুকে মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের কাছে নেওয়া হয়, তবে তাকে সব কথা খুলে বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্যাতনের শিকার হলেও জীবন থেমে যায়নি। তাই পড়াশোনা, খেলাধুলা ও ধর্মীয় কাজসহ অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।

শিশুদের নিজেদের সুরক্ষার কৌশলগুলো শেখা খুব জরুরি, যাতে তারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে পারে। যেমন: কেউ অশ্লীল কৌতুক বললে, শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে বাজে মন্তব্য করলে, ‘তুমি যৌন আবেদনময়ী (সেক্সি)’—এমন কথা বললে, শরীরের খুব কাছাকাছি এলে, অতিরিক্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে বা মিথ্যা প্রশংসা করলে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ছেলে বাজে মন্তব্য করলে রেগে না গিয়ে শান্তভাবে উত্তর দিতে হবে, কারণ সে সাধারণত রাগানোর জন্যই এমনটা করে। নোংরা ইঙ্গিত দিলে পরিষ্কার ভাষায় বলতে হবে, “আমি আপনার এই ব্যবহার পছন্দ করছি না। আপনি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবেন না।”

কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও জাতীয় উন্নয়ন: একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন এবং অধিকারের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব এবং বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা নতুন নতুন রূপে সংঘটিত হচ্ছে। ধর্ষণ এমনই এক বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতা, যার কারণে নারী-শিশুকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়।

সমাজের প্রতিটি স্তরে, শৈশব থেকে আজীবন যদি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং তাদের গঠনমূলক ভূমিকাকে উৎসাহিত করা যায়, তবে একদিকে যেমন তারা নিরাপদ থাকবে, অন্যদিকে নিজেদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নেও তারা অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কন্যাশিশুদের প্রতি প্রচলিত মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, কন্যাশিশুরা কেবল বিবাহের পাত্রী বা ভবিষ্যৎ মা নয়, বরং তারা জাতির অমূল্য সম্পদ। তাদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় বিকাশ, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং সমাজে সমান অংশগ্রহণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপরই আমাদের জাতীয় অগ্রগতি নির্ভরশীল। তাই কন্যাশিশুদের সুরক্ষা ও অধিকারের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।

লেখক
যুগ্ম পুলিশ কমিশনার
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ
ঢাকা

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ