বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
29 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধএকটি স্বপ্নের উপাখ্যান:বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ

একটি স্বপ্নের উপাখ্যান:বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ

মাহবুবা হক
,

শিক্ষা ও বিকাশ: একটি স্বপ্নের যাত্রা

“একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা—যারা কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হবে না, বরং সততা, ন্যায়পরায়ণতা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন পরিপূর্ণ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে”—এই মহান স্বপ্নকে ধারণ করেই ১৯৮৬ সালে বগুড়ার সবুজ প্রান্তরে যাত্রা শুরু করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।

প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই উন্নত ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত শিক্ষাদানের অঙ্গীকারে অটল থেকেছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বগুড়ার ‘মাস্টার প্ল্যান’-এর আওতায় ৪ এপিবিএন-এর প্রায় ২১০ শতাংশ জমির ওপর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। তৎকালীন অধিনায়ক জনাব ধনঞ্জয় সরকারের উদ্যোগে এবং স্থানীয় জনগণের আন্তরিক সহযোগিতায় এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ধারাবাহিক তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত গভর্নিং বডির দক্ষ পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে। ১৯৮৬ সালে বিদ্যালয় শাখা দিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও, ১৯৯৮ সালে কলেজ শাখা যুক্ত হয়।

প্রতিষ্ঠানটিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে উন্নতি সাধন করে, যুগোপযোগী শিক্ষা দানে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে নিরলস পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মোঃ দেলোয়ার হোসেন মিঞা, যিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগুড়ার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে, ২০১৪ সালে তৎকালীন ৪ এপিবিএন-এর অধিনায়ক এবং বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) জনাব আবু নাছের মোহাম্মদ খালেদ, বিপিএম-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে স্কুলটি আধুনিকতার ছোঁয়া পেতে শুরু করে। তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও প্রজ্ঞার ফলে প্রতিষ্ঠানটি আজ শুধু আঞ্চলিক পর্যায়েই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও শিক্ষাগত কৃতিত্ব ও গৌরবময় সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।

শিক্ষাঙ্গনের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা

প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল নার্সারি শ্রেণি দিয়ে। সময়ের সঙ্গে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে একটি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন এবং একটি ছয়তলা ও দুইটি পাঁচতলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন; প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও উন্নত সাউন্ড সিস্টেম। সৃজনশীল ও ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাব রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও আইসিটিতে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কমনরুম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে উন্নত পাঠাগার।

চলাচলে সুবিধার জন্য রয়েছে একটি লিফট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ৮০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য রয়েছে ১১টি পরিবহন বাস এবং জরুরি চিকিৎসাসেবায় রয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। গুণগত শিক্ষা বজায় রাখতে ও চাহিদা মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর ক্যাম্পাস-২ নির্মাণাধীন, পাশাপাশি মূল ক্যাম্পাসে একটি আধুনিক ক্যাফেটেরিয়া ও পার্কিং গ্যারেজ নির্মাণের কাজ চলছে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সাফল্য

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছে ই-এমএস (ইলেকট্রনিক এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ই-রেজাল্ট, দৈনিক উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির তথ্য, পরীক্ষার সময়সূচি, ছুটির নোটিশ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দ্রুততম সময়ে এসএমএসের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেতন পরিশোধসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমও অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।

প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহারের অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট (www.4apbnpsc.edu.bd), যেখানে নিয়মিত সব তথ্য হালনাগাদ রাখা হয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ জনগণের জন্য এটি একটি সহজতর তথ্যপ্রাপ্তির মাধ্যম। ২০২৩ সাল থেকে এই ওয়েবসাইটে ‘কাঙ্ক্ষিত প্রহর’ নামে একটি অনলাইন জার্নাল প্রকাশিত হচ্ছে, যা সাহিত্য ও সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুরো ক্যাম্পাসে উচ্চমানের সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গৌরবময় ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রম

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় ২০১১ ও ২০১২ সালে রাজশাহী বোর্ডে ৩য় এবং ২০১৩ সালে ৫ম স্থান অর্জন করে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বোর্ড পর্যায়ে ১১তম থেকে ৫ম স্থান অর্জন করে শিক্ষার্থীরা। মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে ৯ম এবং ২০১৫ সালে ১৫তম স্থান অর্জন করে। এর আগে ১৯৯৪ সালে মানবিক বিভাগ থেকে একজন শিক্ষার্থী সারা দেশে ১৩তম স্থান অর্জন করে একটি গৌরবময় মাইলফলক স্থাপন করেন।

শুধু একাডেমিক নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটি দেশব্যাপী উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বহুবার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষভাবে, ২০২৪ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় একজন শিক্ষার্থী একক নৃত্যে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এবং দলীয় নৃত্যে ‘সেরা নৃত্যশিল্পী’ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।

এছাড়া রোভার স্কাউট, গার্ল ইন রোভার, বিএনসিসি, স্কাউট, গার্ল ইন স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটগুলোও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায়, রোভার ইউনিট ২০২৫ সালের ৭ম জাতীয় কমডেকা-তে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ৫টি গোল্ড মেডেল অর্জন করে।

ক্রমাগত সাফল্যের ধারায় এটি শিগগিরই জাতীয় পর্যায়ে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে দক্ষ পরিচালনা, শিক্ষকদের নিরলস শ্রম এবং অভিভাবকদের নিঃশব্দ সহযোগিতা।

লেখক
অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত)
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ
বগুড়া

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ