যেখানে অশান্তি, সেখানেই ছুটে যায় শান্তিরক্ষীরা। তেমনই একদল বহুজাতিক পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিল কঙ্গোর কিনশাসায়। হঠাৎ একদিন খবর এলো—ইউএনএইচসিআর-এর একটি টিমকে অপহরণ করেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘শুশি’। তারা দাবি করেছে বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ। কিন্তু সেই মুক্তিপণ দিলে শুশি গোষ্ঠী আবারও অস্ত্র কিনে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, আর না দিলে জিম্মিদের জীবন যাবে। সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টা, আর হাতে পর্যাপ্ত বাহিনীও নেই।
এমন এক সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ পুলিশের চৌকশ অফিসারের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী পরিচালনা করে এক রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান—যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড ছিল জীবন-মৃত্যুর সমীকরণ।
ধারাবাহিক উপন্যাস “অপারেশন কিনশাসা”-এর প্রথম পর্ব দেওয়া হলো।
কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় তখন সন্ধ্যা নামছে। এটি সেই গোধূলি, যা ঘনিয়ে আসা রহস্য আর আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত বহন করে। আকাশের লালচে আভা ক্রমশ দূরীভূত হচ্ছে কালো মেঘের আড়ালে। আর তার নিচে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি হওয়া লোকালয়গুলোর প্রতিটি কোণ যেন নতুন কোনো অজানা আতঙ্কের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
বাইরে প্রকৃতির স্নিগ্ধ বাতাস বইলেও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কঙ্গো মিশনের কিনশাসার এ দপ্তরের কনফারেন্স রুমে সেই বাতাস প্রবেশ করতে পারেনি। সেখানে বাতাস ভারী; প্রতিটি নিঃশ্বাসে চাপা উত্তেজনা আর আসন্ন সংঘাতের পূর্বাভাস মিশে আছে।
মূলত যে কারণে আজকের এই শ্বাসরুদ্ধকর মিটিং, তা হলো দুপুরের দিকে আসা একটি খবর—ইউএনএইচসিআর-এর একটি ত্রাণ সরবরাহকারী দল অপহৃত হয়েছে। কাজটি করেছে এলাকার সবচেয়ে কুখ্যাত ও নৃশংস চরমপন্থী দল ‘শুশি গোষ্ঠী’। এদের প্রধান
উদ্দেশ্য সম্পদ লুণ্ঠন নয়, বরং ত্রাস সৃষ্টি করে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। শুশি গোষ্ঠী বার্তা পাঠিয়েছে—৬০ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাও, নয়তো জিম্মিদের মেরে ফেলা হবে। তাদের বেঁধে দেওয়া সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টা। জিম্মিদের রাখা হয়েছে ক্যাম্প থেকে বহু দূরে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল মারুংগুর কাছাকাছি কোনো এক প্রাচীন গুহায়।
ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা—শুধু টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরনো ঘড়ির যান্ত্রিক টিক-টিক শব্দ, যেন জিম্মিদের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর ক্ষণ গুনছে।
বাংলাদেশ পুলিশের চৌকশ অফিসার, মিশন কমান্ডার আরিফুর রহমান, টেবিলের হেড সিটে স্থির হয়ে বসে আছেন। একসময় তিনি হবিগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন; কিন্তু এখন তার কাঁধে কঙ্গোর এই জটিল ভূরাজনৈতিক গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা এবং চরমপন্থীদের হাত থেকে এই অঞ্চলের অসহায় মানুষদের রক্ষার গুরুভার।
তার সামনে বসে আছেন আন্তর্জাতিক পুলিশ কোরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা—প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের সেরা কৌশলবিদ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এই ঘরটা যেন বহু জাতি, বহু ভাষাভাষীর অভিজ্ঞতার এক সংমিশ্রণ।
আরিফ সাহেব কিনশাসায় এসেছেন গত এক বছর হলো। তিনি ভাবছেন শুরুর দিনগুলোর কথা—কেন এই কিনশাসা ধীরে ধীরে এত অস্থির হয়ে উঠল? মানুষে মানুষে কেন এত সংঘাত? এর উত্তর যতটা না অন্তর্নিহিত জাতিগত বিদ্বেষে, তার চেয়েও বেশি মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা স্বার্থান্বেষণে নিহিত।
এই অঞ্চলের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর মূল্যবান খনিজসম্পদের ভাণ্ডার—বিশেষত কোল্টান, টিন, টাংস্টেন ও হীরা। এই খনিজগুলো আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য হওয়ায় দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী বহুজাতিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রগুলো স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই গোষ্ঠীগুলো কেবল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং কম দামে খনিজ উত্তোলনের পথ সুগম করতে পুরো এলাকাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিতিশীল করে তোলে। ফলস্বরূপ এখানে ছয়টির বেশি বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পনেরো থেকে বিশটির মতো ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন পক্ষ সক্রিয়। এদের মধ্যে কে কার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, কার সঙ্গে কার কী সম্পর্ক—তা এতই জটিল যে বোঝা দুঃসাধ্য।
এই অস্থিরতার ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পুরো কিনশাসার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভঙ্গুর।
সেনা ক্যাম্প এখান থেকে বেশ দূরে, শহরাঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া রিজার্ভ ফোর্সের সহায়তা চাইলে সেই সৈন্যবলকে এনে পৌঁছাতে হয় কঙ্গোর অন্য একটি শহর কিরকিত থেকে। কেননা কিনশাসার যে অঞ্চলে সেনাবাহিনী মোতায়েন, সেখানে পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত বিপদসংকুল এবং রিজার্ভ ফোর্স নেই বললেই চলে। তাই ইচ্ছে করলেই পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের লোকালয়ের কাছাকাছি পুলিশ ক্যাম্পের সহায়তায় সেনা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কিনশাসার লোকালয়ের পুলিশ ক্যাম্পে রাজ্যের গম্ভীরতা নেমে আসে। সবার মধ্যেই চিন্তার ভাঁজ; চাপা উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে সবার চোখে-মুখে।
সবাই ভাবছে, কী করে জিম্মিদের উদ্ধার করা যাবে—এবং তা করতে হবে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই।
প্রথমে নীরবতা ভাঙলেন ব্রিটিশ পুলিশের কর্মকর্তা মিস্টার ফ্রেড। তিনি এর আগে উত্তর ইয়র্কশায়ারে জটিল আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ সিন্ডিকেটের ডিস্ট্রিক্ট পুলিশ কোঅর্ডিনেটর ছিলেন।
সামান্য কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে তিনি বলতে শুরু করলেন,
“জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী আমরা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ এড়াতে চাই। জিম্মিদের জীবন সর্বাগ্রে। আমার মনে হয়, আমাদের সময় নষ্ট না করে মুক্তিপণ দিয়েই ইমিডিয়েট এক্সট্রাকশন বা দ্রুত উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যাওয়া উচিত। ৬০ লাখ ডলার বড় অঙ্ক হলেও জিম্মিদের জীবনের তুলনায় তা কিছুই নয়।”
আরিফ সাহেব শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফ্রেডের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস্টার ফ্রেড, ৬০ লাখ ডলার দেওয়ার অর্থ হলো তাদের হাতে আগামী ছয় মাসের জন্য আধুনিক অস্ত্র তুলে দেওয়া। তারা নিষেধাজ্ঞার কারণে বাইরের উৎস থেকে অস্ত্র পাচ্ছিল না; এই টাকা দিয়ে তারা হয়তো দক্ষিণ সুদানের সীমানা দিয়ে আন্তর্জাতিক অস্ত্রচালানকারী গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনবে। এই অস্ত্রগুলো পেলে তাদের উৎপাত শুধু কিনশাসায় নয়, অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত হবে।” “আমরা যদি এখন টাকা দিই, তবে কাল থেকে মারুংগু এলাকায় অপহরণগুলো এক টাকার আদায়ের কাজে পরিণত হবে। এভাবে জিম্মি মুক্তি করলে কিনশাসার অবস্থা বরং আরও খারাপ হয়ে যাবে।”
তরুণ চীনা কর্মকর্তা মিস্টর চ্যাংপির চোখে অ্যাডভেঞ্চারের কৌতূহল স্পষ্ট ছিল। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কি আমরা সরাসরি অভিযান চালাব? কিন্তু যদি ততক্ষণে তারা জিম্মিদের মেরে ফেলে?”
তিনি যোগ করলেন, “আমাদের ক্যাম্পের ফোর্স সংখ্যা এবং ভারী অস্ত্রসজ্জিত সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া মারুংগু এলাকায় আমাদের সঠিক ইন্টেলিজেন্সও নেই, এবং অনেকেরই পাহাড়ি অঞ্চলে সরাসরি অভিযান চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।”
জার্মান পুলিশ অফিসার মিস্টর কায়জার উঠে দাঁড়ালেন। উদ্বেগপূর্ণ ভঙ্গিতে তিনি বললেন,
“আমাদের স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার কথা ভুললে চলবে না। সর্বশেষ সংঘর্ষের পরে শুশি গোষ্ঠীর কিছু কমান্ডার নিহত হলে তারা স্থানীয় বাজারে ঢুকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছিল। যদি আমরা অভিযান পরিচালনা করি এবং যদি সফলও হই, তবে প্রতিশোধ হিসেবে স্থানীয় লোকালয়ে ভয়াবহ হামলা শুরু হতে পারে এই ঝুঁকি আমরা নিতে পারি না।”
নীরবে এতক্ষণ শুনছিলেন মিস রাইসা ক্যারোলিনা। রাশিয়ান পুলিশের এই কর্মকর্তার পূর্ব ইউরোপের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ভারী কণ্ঠে বললেন,
“মিস্টার কায়জার ঠিক বলেছেন। এই দলগুলো কেবল মুক্তিপণের জন্যই জিম্মি করে না; তারা আতঙ্ক ছড়ানোর জন্যও জিম্মি করে। তাদের নৃশংসতার মাত্রা বর্ণনাতীত। আমাদের কৌশল এমন হওয়া উচিত, যাতে কোনোভাবেই তাদের সন্দেহ না হয়।”
আরিফ সাহেব টেবিলের ওপর রাখা একটি পানির গ্লাস তুলে নিলেন। ধীরে ধীরে পানি পান করে গ্লাসটি নামিয়ে রাখলেন। বললেন,
“সময় কম। তবে আমাদের কৌশল হতে হবে এমন যে, ‘সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।’ আমাদের এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা একাধিক লক্ষ্য পূরণ করবে।”
আবার সবাই নীরব। এবার নীরবতা ভাঙলেন আরিফ সাহেব নিজেই। এর মাঝে তিনি পর্তুগিজ অফিসার ফেদেরার সুকিয়ানা’কে জিজ্ঞেস করলেন, তার কোনো মতামত আছে কিনা। কারণ মিস্টার আরিফ সাহেবের নিয়ম হচ্ছে সাধারণত কোনো গুরুত্বর্পূণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে তিনি সবার মতামত শুনেন; এরপর সবশেষে নিজের মত প্রকাশ করেন।
ফেদেরার সুকিয়ানা নিচু গলায় বলতে শুরু করলেন,
“তাহলে কি স্যার আমরা সময় ক্ষেপণ করতে পারি? অর্থাৎ, আমরা তাদের কোনো একটা কাজে সংযুক্ত করে কিছুটা সময় ব্যস্ত রাখতে পারি। এর মাঝে আমরা সৈন্য সহায়তা চাইব। সৈন্য এলেই আমরা আক্রমণ করব।”
এই কথা শুনার সাথে সবার চেহারায় কিছুটা উজ্জীবন দেখা গেল। সবাই আরিফ সাহেবের দিকে সমর্থনের ইঙ্গিত করলেন। এবার আরিফ সাহেব বলতে শুরু করলেন,
“হ্যাঁ, আমরা এটাই করব। তবে, এক্ষেত্রে প্ল্যানটা ‘ট্রিপল-এ’ (অ্যাপিজ, অ্যাম্বুশ, অ্যাসল্ট) অনুসরণ করব।”
এসময় তিনি সবাইকে ট্রিপল-এ প্ল্যানটির বিস্তারিত ধারণা দিলেন। এরপর তিনি ফেদেরার সুকিয়ানার কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে বলতে থাকলেন প্রথম ধাপে আমরা সময় ক্ষেপণের জন্য শুশিদের কাছে অতিরিক্ত ১২ ঘণ্টা সময় চাইব; সেজন্য আপসের প্রস্তাব দেব।
আরিফ সাহেব বলে চললেন,
“শুশি গোষ্ঠীর বার্তাবাহককে জানিয়ে দেওয়া হবে যে আমরা আলোচনা ও টাকার প্রস্তাবে রাজি। তবু এই বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ শহর থেকে দুর্গম পাহাড়ি পথে পৌঁছে দিতে এবং শুশি কর্তৃক নির্দিষ্ট কোড অনুযায়ী টাকার বান্ডিল যাচাই করতে সর্বনিম্ন ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে এটি বাস্তবে কেবল টাকা সংগ্রহের অজুহাত নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। আমরা তাদের দেখাব যে তাদের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছি, কিন্তু পদ্ধতিগত কারণে সময় লাগছে। এতে অবশ্য ঝুঁকি আছে; যদি কৌশলটি ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত সংকটময় হবে। কিন্তু সুযোগও আছে। এই অতিরিক্ত সময়টি ইন্টেলিজেন্স ও স্পেশাল অ্যাকশন টিমের জন্য ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে কাজ করবে এবং এই সময়ে
আমরা এফএআরডিসির বিশ্বস্ত ইউনিট থেকে সীমিত সংখ্যক সেনা ও প্রয়োজনীয় লাইট এয়ার সাপোর্ট নিশ্চিত করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করব।”
তারপর আরিফ প্ল্যানের দ্বিতীয় পর্যায়ের কথা বললেন, যা ছিল আড়াল বা গোপন নজরদারি—মারিয়া টিলার জাল। শুশি গোষ্ঠী আলোচনার জন্য কিনশাসার পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত মারিয়া টিলা বেছে নিয়েছে। তারা এটিকে নিরপেক্ষ স্থান মনে করলেও, এই জায়গাটিই হবে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
টাকা পৌঁছে দেওয়ার ছদ্মবেশে আমরা সেখানে পাঁচজনের একটি হোস্টেজ-নেগোশিয়েশন অ্যান্ড অবজারভেশন টিম (এইচএনওটি) পাঠাব। দলের প্রধান হিসেবে থাকবেন মিস রাইসা ক্যারোলিনা, যিনি শুশি নেতার আচরণ ও শারীরিক ভাষা বিশ্লেষণ করবেন।
টেকনিক্যাল কভারের দায়িত্বে থাকবেন ব্রিটিশ পুলিশের ম্যাক, যিনি ‘ফায়ারফ্লাই’ নামক ক্ষুদ্র এসআইজি-ট্র্যাকার ডিভাইসটি গোপনে এমনভাবে স্থাপন করবেন, যাতে শুশিদের স্যাটেলাইট ফোন বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ট্র্যাক করে গুহার সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা যায়।
মারিয়া টিলা থেকে শুশিদের ডেরার সম্ভাব্য দূরত্ব ১০–১৫ কিলোমিটার। তাই নির্ভুল সিগন্যাল ট্র্যাকিং অনিবার্য। নেগোসিয়েশন টিমকে সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া থাকবে। শুধু ফায়ারফ্লাই সিগন্যাল চালু থাকবে।
তাদের নিরাপত্তার জন্য টিলার বিপরীত পাহাড়ে দুটি স্নাইপার দল অবস্থান নেবে। তাদের কাজ হবে শুধুই নিরাপত্তা দেওয়া; গুলি চালানো যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রাইসা বা ম্যাকের জীবন সরাসরি বিপন্ন হচ্ছে।
অবশেষে রয়েছে প্ল্যানের চূড়ান্ত পর্যায়—আঘাত বা স্পেশাল টাস্ক, ‘অন্ধকারের বজ্রপাত’। দ্বিতীয় ধাপ সফল হলে মারিয়া টিলা থেকে সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেশাল অ্যাকশন টিম (এসএটি) আঘাত হানবে। এই টিমে থাকবেন মিস্টার চ্যাংপি, ব্রিটিশ পুলিশের স্পেশাল টিমের দুইজন অভিজ্ঞ অফিসার ও বাংলাদেশের কিছু চৌকশ পুলিশ কর্মকর্তা। ততক্ষণে শহর থেকেও সেনা সহায়তা আসবে।
টিমটির জন্য বিশেষভাবে নাইট ভিশন গিয়ার ও সাইলেন্সারযুক্ত অস্ত্র প্রস্তুত রাখতে হবে। আক্রমণ হবে নিঃশব্দে, গভীর অন্ধকারে এবং এমনভাবে সাজানো হবে যেন মনে হয় এটি শুশিদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দলের কাজ। এজন্য স্পেশাল টিমের পোশাক ও সরঞ্জাম থেকে জাতিসংঘের সব প্রতীক ও চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে, যেন জাতিসংঘের ওপর প্রতিশোধের ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক জটিলতা এড়ানো যায়।
সবশেষে আরিফ সাহেব সবাইকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন। সবাই টেবিল থেকে উঠে গেলেন। এর আগে অনেক অভিযান পরিচালনা করলেও, এই দুঃসাহসিক ও বিপজ্জনক অভিযানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আরিফ সাহেবের মনে এক চাপা উত্তেজনা। তিনি ক্যাম্প থেকে বের হয়ে অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকালেন। টিলাগুলো এখন আবছা অন্ধকারে ঢাকা। মারুংগুর গুহাটা এখন কেবল একটা আস্তানা নয়, এটি পুরো কিনশাসার ভাগ্য নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু।
এই নির্মল প্রকৃতির নিচে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতা কত গভীর, সে কথা ভেবে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তবে মারিয়া টিলা থেকে শুরু হতে যাওয়া এই লুকোচুরি খেলায় আরিফুর রহমানের আছে আরও কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
তিনি ভাবছেন, যদি তাদের পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে জিম্মিদের মৃত্যু নিশ্চিত। এর পাশাপাশি শুশিরা পুরো লোকালয়ে নির্বিচারে হামলা করবে। সেজন্য তিনি ভিতরে ভিতরে আঁকছেন বিকল্প প্ল্যান-বি। হয়তো প্ল্যান-বিই হবে আরিফ সাহেবের প্রথম চাল। সবাইকে শুধু এতটুকুই ওয়াকিটকিতে সিগন্যাল দিলেন, যার মানে ছিল— প্ল্যান পরিবর্তন হতে পারে। প্ল্যান বি কী হবে, তা কেবল তিনিই জানেন।
চলবে…
লেখক
হেড অব স্ট্র্যাটেজি ও ইমপ্লিমেন্টেশন,
ইন্টেলিস সল্যুশন লিমিটেড
