বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
29 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার: সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের একটি...

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার: সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের একটি সমন্বিত প্রয়াস

প্রতিদিন আমাদের সমাজে অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। পাচার, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো শুধু মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং একটি জাতির সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোকেও ভেঙে দেয়। এই সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন যে, পরবর্তী জীবনে তাদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেউ কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, আবার কেউ হয়তো চিরতরে হারিয়ে যান জীবনের প্রবাহ থেকে।

এই নির্মম বাস্তবতাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশ পুলিশ একটি যুগান্তকারী ও মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে—ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার (ভিএসসি) স্থাপন, যা নারী ও শিশু ভিকটিমদের জন্য সহমর্মিতা ও সহায়তার এক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। এই সেন্টার ভিকটিমদের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসনসহ বহুমাত্রিক সেবা প্রদান করে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বে পরিচালিত এসব সেন্টার নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় এক যুগোপযোগী, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই উদ্যোগের পেছনের প্রেক্ষাপটটিও অনবদ্য। ২০০৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও থানায় দেশের প্রথম ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের আওতায় দশটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) অংশগ্রহণে গঠিত একটি সমন্বিত প্রয়াস। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ১ নভেম্বর রাঙ্গামাটিতে দ্বিতীয় সেন্টার চালু হয়। বর্তমানে দেশে মোট আটটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং আশা করা যায়—ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। বিভিন্ন এনজিও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত এই সেবার মাধ্যমে ভিকটিমরা আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পাক—যা তাদের নতুনভাবে জীবন শুরু করতে সহায়তা করে—এই অভিপ্রায়েই মূলত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পথচলা শুরু।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার স্থাপনের পেছনে একাধিক লক্ষ্য বিদ্যমান। প্রথমত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা দূর করে নারী ও শিশুদের অপরাধের শিকার হওয়ার পর তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা নির্ভয়ে সত্য তুলে ধরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সময়োপযোগী সেবা প্রদান করে তাদের সুরক্ষা ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে সেবার মান উন্নয়ন ও সর্বোচ্চ সহায়তা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, সহিংসতার শিকারদের পুনরায় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এবং সবশেষে, সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

একজন নির্যাতিত নারীর পক্ষে তার দুঃখ-কষ্ট বা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করা সহজ নয়। অধিকাংশ সময় তিনি সমাজের চোখে লজ্জিত, ভীত ও সংকুচিত হয়ে পড়েন। কিন্তু যখন তার সামনে থাকেন একজন নারী পুলিশ সদস্য, নারী আইনজীবী, নারী কাউন্সেলর কিংবা চিকিৎসক—তখন তার মনে একধরনের নির্ভরতা জন্মায়। সাহস পান মনের গোপন ক্ষতগুলোর কথা খুলে বলার। এই বাস্তবতাই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতাকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন করে।

এই সেন্টারগুলো এমন একটি আশ্রয়স্থল, যেখানে নারী ও শিশুরা পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, যৌতুকজনিত সহিংসতা কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের মতো অপরাধের পর আশ্রয় পেতে পারেন। বাংলাদেশ পুলিশ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এসব সেন্টার শুধু সহানুভূতির নিদর্শন নয়, বরং নির্যাতিতদের পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনের পথে একটি বাস্তবসম্মত ও মানবিক সহায়তাকেন্দ্র।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পরিচালন কাঠামো অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ওবহুমাত্রিক। এটি একটি যৌথ উদ্যোগ যেখানে বাংলাদেশ পুলিশ,সংশ্লিষ্ট থানা এবং বিশেষায়িত এনজিওগুলো সম্মিলিতভাবে কাজকরে। যদিও প্রশাসনিকভাবে এটি পুলিশের অধীনস্থ, তবু প্রতিদিনেরকার্যক্রমে এনজিওর সক্রিয় অংশগ্রহণ একে করে তোলে আরো দক্ষ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। প্রতিটি সেন্টারে নারী পুলিশ সদস্য নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করেন; পাশাপাশি থাকেন চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা—যারা ভিকটিমদের সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করেন। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে ভিকটিম গ্রহণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও সহানুভূতির সঙ্গে পরিচালিত হয়। কোনো নির্যাতিত নারী বা শিশুকে থানা, এনজিও অথবা সরাসরি সেন্টারে নিয়ে এলে প্রথমেই একজন প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য তার অভিযোগ গ্রহণ করেন। এরপর ভিকটিমের প্রয়োজনে চিকিৎসা, আশ্রয় এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গেই আইনজীবীকে যুক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিমের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করে একটি সামগ্রিক সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে নারী আইনজীবীদের মাধ্যমে মামলা গ্রহণ, পরামর্শও আদালত প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা হয়। চিকিৎসা সেবার আওতায় জরুরিচিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে ফরেনসিকপরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে। কাউন্সেলিংয়ের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা ভিকটিমদের মানসিক ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করেন।পাশাপাশি নিরাপদ ও গোপন আশ্রয়স্থলে থাকা, এবং স্বনির্ভর প্রকল্প বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ—এসবই একসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরি করে। এইভাবেই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু একটি সেবাকেন্দ্র নয়, বরং সহানুভূতি ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিটি গল্পের পেছনে রয়েছে সাহস, সহায়তা এবং নতুন করে পথচলার এক দৃঢ় প্রত্যয়—যার সূচনা হয় এই সেন্টারগুলোর অদম্য মানবিক প্রচেষ্টায়।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে পুলিশ ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যকার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ওপর। এই অংশীদারিত্বে দুটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কার্যকর সহযোগিতা—যেখানে এনজিওগুলো নিয়মিতভাবে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে এবং তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরকে সমর্থন করে। মনোসামাজিক সেবা, আশ্রয়দান এবং পুনর্বাসনের মতো মানবিক ক্ষেত্রে এনজিওর ভূমিকা থাকে অগ্রগণ্য। দ্বিতীয়ত, সংবেদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এনজিও কর্মীরা নারী ও

শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেন, যেন তারা আরো মানবিক, নারীবান্ধব এবং ভিকটিম-কেন্দ্রিক আচরণে অভ্যস্ত হতে পারেন। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই ভিকটিমদের সহায়তার প্রক্রিয়াকে করে তোলে আরও পেশাদার, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার গোপনীয়তা রক্ষায় অনুসরণ করে এক কঠোর নীতিমালা। এখানে প্রতিটি ভিকটিমের নিরাপত্তা এবং মানসিক স্থিতি সুরক্ষার জন্য ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা হয়। গণমাধ্যমে রিপোর্ট করার সময় ভিকটিমের নাম, ছবি বা ঠিকানা প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয়। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন শব্দ ও উপস্থাপন বেছে নেওয়া হয়, যা ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ। পুলিশ ও এনজিও প্রতিনিধি নিয়মিত মিডিয়াকে ব্রিফ করে থাকেন, যাতে ভিকটিমের সম্মতি ছাড়া কোনো ছবি, ভিডিও বা বিবৃতি প্রচার না হয়। এই সংবেদনশীলতা ভিকটিমদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রতিটি কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, যা নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তি তৈরি করে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সর্বাধিক প্রয়োগযোগ্য, যার আওতায় ধর্ষণ, নিপীড়ন,নির্যাতন ও পাচারের অধিকাংশ মামলা নেওয়া হয়। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ গৃহে নির্যাতিত নারীদের সহায়তা দেয়। শিশু আইন, ২০১৩ শিশু ভিকটিমদের জন্য আলাদা বিচার পদ্ধতি নির্ধারণ করে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ পাচার হওয়া নারী ও শিশুকে শনাক্ত, উদ্ধার ও পুনর্বাসনে সহায়তা করে। এছাড়াও, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এইসব আইনের পাশাপাশি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের নীতিমালাও সেন্টারের কার্যক্রমকে আইনি ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্ব প্রদান করে।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রতিষ্ঠার পর থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার মানুষের জীবনে এসেছে এক নতুন আশার আলো। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে বিশ্বাসের জায়গায়—যেখানে ভিকটিমরা এখন পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী ও সাহসী। বিচারপ্রক্রিয়া হয়েছে গতিময়, বিশেষত ধর্ষণ, গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক তদন্ত ও আইনি সহায়তা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটেছে ট্রমা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে, যা বহু নারী ও শিশুকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। সমন্বিত সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি চিকিৎসক, আইনজীবী ও সমাজকর্মীরা একসঙ্গে কাজ করে ভিকটিম-কেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করছেন।মিডিয়া, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজে সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

 ২০১১ সাল থেকে উইমেন সাপোর্ট আ্যন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনে ভিকটিমদের সেবা প্রদানের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত এই ডিভিশনে মোট ৩৯৮টি মামলা স্থানান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ১৯১টি, অপহরণের ৯৩টি,শ্লীলতাহানির ৩৪টি এবং যৌতুকের ৮০টি । তন্মধ্যে প্রায় ২৮৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। উক্ত ইউনিট অত্যন্ত সংবেদনশীলতা, দ্রুততা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনবল ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বিশেষকরে গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ কর্মী না থাকায় অনেক ভিকটিম ঠিক সময়ে সেবা পাচ্ছেন না। অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বেসরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে অনেক সময় ব্যাহত করছে। এছাড়া, গোপনীয়তা রক্ষায় কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ বা মিডিয়ার অসতর্ক আচরণ ভিকটিমদের ঝুঁকিতে ফেলেছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতাও নির্যাতিতদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে ক্ষীণ করে তোলে। তারও ওপরে, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে অপমানমূলক হয়, যা তাদের পুনর্বাসনের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

 এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি থানায় ভিকটিম সাপোর্ট ডেস্ক চালু করা হলে প্রাথমিক সহায়তা সহজে ও দ্রুত প্রদান করা সম্ভব হবে। পুলিশ ও এনজিও কর্মীদের যৌথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে সমন্বয় আরও কার্যকর হয় এবং ভিকটিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রতিষ্ঠিত হয়। মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এর বিস্তার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি ভিকটিমের সুস্থ জীবনে ফিরতে বড় সহায়ক। মিডিয়াকে দায়িত্বশীল রিপোর্টিং ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে। সেন্টারগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ভিকটিমকে স্বনির্ভর ও সমাজে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলবে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে চললে, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার শুধু একটি সহায়তা কেন্দ্র নয়, বরং সহানুভূতি, পেশাদারিত্ব ও আইনি সুরক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাসম্পন্ন ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনের পথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক

উপ-পুলিশ কমিশনার
উইমেন সাপোর্ট আ্যন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ