রবিবার, এপ্রিল ১২, ২০২৬
32 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপরিবেশ সুরক্ষাপণ্য রিসাইকেল:নতুন দৃষ্টভঙ্গিতে গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ

পণ্য রিসাইকেল:নতুন দৃষ্টভঙ্গিতে গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ

সাবিনা ইয়াসমিন
,

আমাদের চারপাশে প্রতিদিন অসংখ্য জিনিস ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়—প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ, পুরনো জামা, ভাঙা খেলনা, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, টিন, গ্লাস, কাঠ, অ্যালুমিনিয়ামের টুকরো ইত্যাদি। সেগুলোর মধ্যে কিছু চলে যায় ময়লার স্তুপে, কিছু নদীতে, কিছু আবার গর্তে চাপা পড়ে, যা পরিবেশ দূষণের জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু এসব ব্যবহৃত উপকরণ কি আসলেই একেবারে অপ্রয়োজনীয়? নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে তা হয়ে উঠেছে ‘বর্জ্য’?

একই সঙ্গে প্রশ্ন আসে, পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশ বা রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, পণ্য রিসাইক্লিং এবং গ্রিন পুলিশিং একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। রিসাইক্লিং হলো বর্জ্য থেকে নতুন পণ্য তৈরি করার একটি প্রক্রিয়া, যা একদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার কমায়, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ হ্রাস করে। অন্যদিকে, গ্রিন পুলিশিং হলো পরিবেশবান্ধব আইন ও নিয়মকানুন তৈরি এবং তা কার্যকর করার একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টা। এই দুটি বিষয়কে সমন্বিত করেই একটি টেকসই ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

পণ্য রিসাইকেল: নতুনের সূচনা

পণ্য রিসাইকেল কেবল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি এক নতুন ধরনের সামাজিক সংস্কার। এই সংস্কারের মূল জায়গা হলো—চেতনার পরিবর্তন। ফেলে দেওয়ার আগে যদি আমরা একবার ভাবি, ‘এটা আর কীভাবে কাজে লাগানো যায়’, তাহলে তা সমাজে এক নতুন প্রবাহ তৈরি করবে। এই নতুন চিন্তাধারাই পারে গড়ে তুলতে একটি পরিবেশবান্ধব, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ। কারণ রিসাইকেল মানে শুধুই পুনঃব্যবহার নয়, বরং পরিবেশবান্ধব নতুন জীবনের সম্ভাবনা।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েক কোটি টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর অনেকটাই রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর খুব অল্পই কার্যকরভাবে পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বড় কারণ হলো জনসচেতনতার অভাব, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। অথচ এসব উপকরণ দিয়েই গড়ে উঠতে পারে ‘সার্কুলার ইকোনমি’, যেখানে পুরনো জিনিস থেকেই তৈরি হবে নতুন পণ্য। সেসঙ্গে তৈরি হবে কর্মসংস্থান ও আর্থিক সম্ভাবনা।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের শিক্ষা কিংবা পারিবারিক সংস্কৃতিতে রিসাইকেল নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। কোনো কিছু ভেঙে গেলে সেটিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ভেবে ফেলে দেওয়া হয়। একজন সচেতন মানুষ জানেন, ভাঙা প্লাস্টিকের বোতলও রূপ নিতে পারে ফুলের টবে; পুরনো কাগজে তৈরি হতে পারে বাচ্চাদের খেলনা উপকরণ কিংবা ময়লা ফেলার ঝুড়ি; আর পুরনো কাপড় দিয়ে হতে পারে দরিদ্র শিশুদের পোশাক। এভাবেই ব্যবহার্য জিনিসের নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়ার মানসিকতাই সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।

আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, রিসাইক্লিং হয়তো কেবল বড় বড় কারখানার কাজ। কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। এটি শুরু হতে পারে প্রতিটি ঘরে। আমরা যদি পুরনো বই, জামা, আসবাবপত্র, খেলনা আলাদা করে সংরক্ষণ করি এবং সেগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী রূপান্তর করে পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করি, তাহলে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা। তারা পাবে শিক্ষা, জীবন ও স্বপ্নের নতুন উপকরণ।

পুলিশের ভূমিকা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বাইরেও পুলিশ হলো সমাজে নৈতিক বার্তার বাহক। যদি প্রতিটি থানায় ‘রিসাইকেল কর্নার’ স্থাপন করা হয়, যেখানে পুরনো কাগজ, নষ্ট যন্ত্রপাতি ও ভাঙা ফার্নিচার আলাদা করে সংরক্ষণ করে সরকারি রিসাইকেল প্লান্টে পাঠানো হয়, আর পচনশীল আবর্জনা আলাদা ডাস্টবিনে ফেলে পরবর্তীতে তা থেকে জৈব সার উৎপাদন করা হয়—যেমনটি উন্নত দেশগুলোতে প্রচলিত—তাহলে পুলিশের হাত ধরে সমাজে ছড়িয়ে পড়বে সচেতনতার নতুন দিগন্ত।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আওতায় স্কুল, কলেজ, মসজিদসহ বিভিন্ন জনসমাগম এলাকায় রিসাইকেল নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো যেতে পারে। এতে শিশু, কিশোর ও অভিভাবকদের মধ্যে গড়ে উঠবে এক নতুন মূল্যবোধ—ফেলে দেওয়া মানেই শেষ নয়। পুরনো খেলনা, জামা, ব্যাগ বা বই অন্য কারো কাছে হয়ে উঠতে পারে অমূল্য উপহার। এভাবেই পুলিশের মানবিক মুখ হয়ে উঠতে পারে সমাজের পথপ্রদর্শক।

বাংলাদেশ পুলিশ এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে (যেমন বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য অপসারণ ইত্যাদি)। এই উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারিত করে প্রতিটি থানায় রিসাইকেল অ্যাকশন প্ল্যান চালু করা যেতে পারে, যেখানে নিয়মিত রিসাইকেলযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার সঠিক পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে করে গড়ে উঠবে পরিবেশগত দিক থেকে সচেতনতা ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল পুলিশ প্রশাসন।

সামাজিক দায়িত্ববোধ

রিসাইকেল ভাবনাকে শিশুদের মাঝেও ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে, কারণ আমরা জানি—আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ। তাই পাঠ্যবইয়ে রিসাইকেল-সম্পর্কিত গল্প, প্রজেক্ট এবং হাতে-কলমে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তবে এর সূচনা হওয়া উচিত ঘর থেকেই। প্রতিটি বাড়িতে একটি ‘রিসাইকেল কর্নার’ গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে পুরনো জিনিস সংরক্ষণ করে সেগুলোর সম্ভাব্য নতুন ব্যবহার নিয়ে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করবে।

এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, নাগরিক সমাজ—এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও সক্রিয় অংশগ্রহণ। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং থানার সমন্বিত উদ্যোগে একটি কার্যকর রিসাইকেল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরাতন পণ্য সংগ্রহ ও রূপান্তরের ব্যবস্থা করা গেলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আসবে নতুন প্রাণ। সমাজে গড়ে উঠতে পারে ‘রিসাইকেল চ্যাম্পিয়ন’, যারা নিজেদের আচরণ, বচন ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করবে।

সহায়ক আইনি কাঠামো

আইনি কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ এরই মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, দূষণ সৃষ্টিকারী যেকোনো কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্য নিক্ষেপ ইত্যাদি এই আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২০২১ সালে প্রণীত ‘সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস’ কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এই বিধিমালায় ব্যক্তিগত ও শিল্প পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এইসব আইন প্রয়োগে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করে। তবে নাগরিক সমাজের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রতিটি মানুষ যদি নিজের অবস্থান থেকে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা নেয়, তাহলেই গড়ে উঠবে একটি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্র।

শেষ কথা হলো, আমরা আমাদের পরিবেশকে কীভাবে গড়ে তুলব, সেই সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা কি চাই—একবার ব্যবহার করেই সবকিছু ফেলে দেওয়ার এক অনিয়ন্ত্রিত চর্চা, নাকি নতুনভাবে রূপান্তরের মাধ্যমে টেকসই এক পরিবেশ?

লেখক

অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ